প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আবারও গণভোট, সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ চায় সরকার

জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের পর প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে ফের গণভোট আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে অংশ নিতে সরকার আহ্বান জানিয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বিরোধী দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আলোচনায় অংশ নিলে তাদের প্রস্তাব ও মতামতও সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠক শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি সরকারের এ অবস্থান তুলে ধরেন। বৈঠকে কমিটির সদস্যরা ছাড়াও জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয়ে মতামত, প্রস্তাব ও পরামর্শ দেন।
সংবিধান সংশোধনের সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এরপর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আগামী বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনেই বিলটি উত্থাপন করা হতে পারে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রথমে সংসদে বিল উত্থাপন হবে। বিলের ওপর আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব ও বিরোধিতার বিষয়গুলো নিষ্পত্তির পর সংসদীয় বিধি অনুযায়ী সংশোধনী পাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরপর যেসব সাংবিধানিক বিধানের সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সাংবিধানিক গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ গণভোট এবং সাংবিধানিক গণভোট এক বিষয় নয়। সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিধানে পরিবর্তন আনা হলে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এ ধরনের গণভোটের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগে সংসদে সংশোধনী পাস হবে। এরপর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের জন্য গণভোটের বিধান রয়েছে, সেগুলোতে গণভোট হবে। জনগণ পক্ষে ভোট দিলে এরপর রাষ্ট্রপতি সই করবেন।
বৈঠকের পর দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান সংশোধনের পর আবারও গণভোট আয়োজনের কথা জানিয়েছে বিশেষ কমিটি। কমিটির প্রধান সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংবিধানেও বলা আছে, মৌলিক পরিবর্তন করতে হলে গণভোটে যেতে হয়। এবার যেহেতু মৌলিক পরিবর্তন হবে, তাই আবারও গণভোট দিতে হবে। এটি হবে সাংবিধানিক গণভোট।
আগের দুটি বৈঠকের মতো সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির এ বৈঠকেও বিরোধী দলগুলোর কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর এই বিরোধ পুরনো।
সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও আরেক বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দাবি, জুলাই সনদের গণভোটে যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে তার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নেন।
তবে বিএনপি শুরু থেকেই বলে আসছে, সংবিধান সংস্কারের জন্য গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে তারা এই পরিষদের সদস্য হতে চায় না। বিএনপি থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
সরকারের যাত্রা শুরুর পাঁচ মাসের মাথায় গত জুলাইয়ে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের এই কমিটিতে রাখা হয় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ সদস্য নূরুল ইসলাম ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে। বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে রাখা হয় জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা ও মাহমুদুল হককে।
এ ছাড়া গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলিউল্লাহকে সদস্য রেখে বিরোধী দলকে পাঁচজনের নাম দিতে বলা কমিটিতে। বিরোধী দল সে প্রস্তাবে এখন পর্যন্ত রাজি হয়নি। বরং ওই কমিটি গঠনের দিন তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
রোববারের বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা বারবারই বিরোধী দলকে আহ্বান জানিয়েছি, এখনো আহ্বান জানাই— তারা যখনই এই কমিটিতে যোগদান করবেন, আমরা স্বাগত জানাব। তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।’
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত এই কমিটির সভাপতি আরও বলেন, আলোচনায় অংশ নিলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয়ও ধারণ করা ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে। সরকার সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে বিভক্তি না রেখে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজটি সম্পন্ন করতে চায়।
কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের মধ্যে ঐক্য থাকুক, কোনো বিভক্তি না থাকুক। জুলাই জাতীয় সনদ সম্পূর্ণরূপে যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করব। এর বাইরেও কিছু বিষয় আছে, যেগুলো ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আসেনি বা পরিহার করা হয়েছে, সেগুলোও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে চাই।’
ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত ও জনসেন্টিমেন্ট থেকে সংবিধানে ধারণযোগ্য বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে। আর যেসব বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেগুলো আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই করা হবে।
সাংবাদিকদের মতামত প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আজকের সভায় অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের অধিকাংশই বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকে লিখিত আকারেও তাদের প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এসব লিখিত প্রস্তাব কমিটি গ্রহণ করে আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করবে।
বিরোধী দলের এই কমিটিতে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি বলেন, আমরা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারব না। আমরা বারবার আহ্বান জানাতে পারি এবং আশা করতে পারি তারা এখানে অংশগ্রহণ করবে। আমরা চাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজটি করি এবং সংবিধান সংশোধনের আলোচনা করি। শুধু কমিটির পক্ষ থেকে নয়, সাংবাদিকদের মাধ্যমেও বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাই।
















-0c1a24-256x144.webp)



