গঙ্গার পানি বণ্টন: নবায়নের বদলে ‘নতুন বা সংশোধিত’ চুক্তি চায় ঢাকা

আগামী ডিসেম্বরে ভারতের সঙ্গে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন বা সংশোধিত চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ। শুধু পুরোনো চুক্তি নবায়নের বদলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিধানসহ নতুন চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকার ইস্কাটনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি। সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন মন্ত্রী।
ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এ্যানি বলেন, যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে বৈঠক চলছে। এসব বৈঠকের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করছেন। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলেও জানান তিনি।
এ্যানি বলেন, ‘গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সবাই বেশ উদগ্রীব। ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই চুক্তির মেয়াদ শেষ, ৩০ বছরের যে চুক্তি ছিল। ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় প্রথম ৫ বছরের জন্য চুক্তি করেছিলেন, সেই চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল।’
‘কিন্তু ১৯৯৬ সালে সেই গ্যারান্টি ক্লজটা বাদ রেখেই বাকিটা নবায়ন করা হয়, বা নতুন চুক্তি করা হয় সেই সময়—৩০ বছরের জন্য। এই মুহূর্তে, ১২ ডিসেম্বরের আগেই আমাদের নতুন চুক্তি করতে হবে। সেই অনুযায়ী আমি মনে করছি, বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় পক্ষই নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।
এটি পুরনো চুক্তি নবায়ন নাকি নতুন চুক্তি হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, সেমিনারেও নতুন করে চুক্তি করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি সেখানে গ্যারান্টি ক্লজ রাখার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যে সেমিনারে ছিলাম, সেই সেমিনারে সবাই এই আলোচনার ওপরই জোর দিয়েছেন। এবং সবাই একমত যে নতুনভাবে চুক্তি করে যেন আরও অনেক দিন চুক্তির মেয়াদ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি এবং সেখানে যেন এই গ্যারান্টি ক্লজটা অন্তর্ভূক্ত থাকে, সেদিকে আমাদের নজর রয়েছে।’
‘এবং আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের স্বার্থ রেখেই, দেশের স্বার্থ রেখেই যেন আমরা চুক্তিকে অগ্রাধিকার দিই, সেদিকে আমরা খুব বেশি সক্রিয় রয়েছি,’ বলেন পানিসম্পদমন্ত্রী।
জেআরসির মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের তারিখ নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে কি না প্রশ্নে এ্যানি বলেন, দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ে কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জেআরসির কারিগরি টিম ইতোমধ্যে কাজ করেছেন এবং প্রতি মুহূর্তে তারা এই কাজগুলো করছেন। আমরা আশা করছি, তাদের সেই কারিগরি টিম কাজ শেষ করেই বাকি যে কাজটা সম্পন্ন করা দরকার জেআরসির মন্ত্রী পর্যায়ে, সেটা সম্পন্ন হবে।’
গ্যারান্টি ক্লজ কী?
পানিসম্পদমন্ত্রী যে গ্যারান্টি ক্লজের কথা বলেছেন, সেমিনারে সেটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পানি কূটনীতি বিশ্লেষক মালিক ফিদা খান। সেন্টার ফর সায়েন্স, টেকনোলজি, পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান বলেন, ১৯৭৭ ও ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে দুই ধরনের গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। তার মতে, ১৯৭৭ সালের বিধানটি বাংলাদেশের জন্য বেশি জোরালো ছিল।
১৯৯৭ সালের গ্যারান্টি ক্লজের কথা তুলে ধরে মালিক ফিদা এ খান বলেন, ‘নির্ধারিত ১০ দিনের বিরতিতে গঙ্গার পানি যদি তফসিলে থাকা নির্ধারিত পরিমাণের কম প্রবাহিত হয়, বাংলাদেশ তার নির্ধারিত পরিমাণের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ পানি পাওয়া নিশ্চিত করছে এই ধারা। সুতরাং তফসিলে যদি লেখা থাকে— বাংলাদেশ ১০০ কিউসেক পানি পাবে, তাহলে এটা কোনো ৮০ শতাংশের নিচে যাবে না।’
১৯৯৬ সালের চুক্তিতেও এক ধরনের গ্যারান্টি ক্লজ ছিল উল্লেখ করে ফিদা এ খান বলেন, ‘এই গ্যারান্টি ক্লজে কৃষির চাহিদা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সময় সেখানে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময় ধরা হয় এবং তিনটি পর্যায়ক্রমিক— ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাওয়ার নিশ্চিয়তা দেওয়া হয়েছে প্রত্যেক দেশকে। তার মানে হচ্ছে, প্রতি ১০ দিন করে ছয়টি সময়সীমা রয়েছে। তিনটি সময়সীমায় ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাবে এবং ভারতও একইভাবে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। এটাও একটা গ্যারান্টি ক্লজ।’
মালিক ফিদা খানের মতে, দুই চুক্তিতেই ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহের ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে পানি বণ্টনের হিসাব করা হয়েছিল। তবে শুধু একটি পয়েন্টের প্রবাহের ওপর নির্ভর না করে পুরো নদী অববাহিকা বিবেচনায় নিয়ে পানি বণ্টনের বিষয়টি দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এই পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘গঙ্গার পুরো অববাহিকায় পানির সম্পূর্ণ পরিমাণ নিয়ে আমরা কখনও চিন্তা করিনি। আমরা কেবল ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ বিবেচনায় নিয়েছি এবং সে অনুযায়ী নিজেদের অংশ ভাগ করে নিয়েছি। সুতরাং আমাদেরকে আলোচনা করতে হবে। আমি বলছি না যে, এখনই সবকিছু পরিবর্তন করে ফেলতে পারব, তবে আমাদেরকে ভারত বা অন্যদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে।’
















-2e39ee.jpg)



