গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত: ভারত

বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ভারত। তবে এ আলোচনা এখনো কারিগরি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নয়াদিল্লির বলছে, গঙ্গাসহ দুই দেশের অভিন্ন নদীগুলোর বিষয়ে আলোচনার জন্য বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশনই (জেআরসি) মূল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দেশটির অবস্থান তুলে ধরেন। এ খবর দিয়েছে ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআই।
জয়সওয়াল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন অন্য নদীগুলোর ক্ষেত্রেও আমাদের একটি যৌথ নদী কমিশন রয়েছে। নদী-সংক্রান্ত সব বিষয় এই কমিশনের অংশ হিসেবে আলোচনা হবে। গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ে বৈঠকও অব্যাহত রয়েছে।’
ভারতের এ বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন ১৯৯৬ সালে সই হওয়া ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটির মেয়াদ রয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিবণ্টনের জন্য এই চুক্তি কার্যকর থাকে।
গঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারেজ। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেওয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ বিরোধ তৈরি হয়। ১৯৭৭ সালে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হলেও সেটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিরোধ ফের তীব্র হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ৩০ বছর মেয়াদে দুই দেশের মধ্যে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি সই হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ ৫০ শতাংশ করে পানি পাবে। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি ভারত পাবে। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি বাংলাদেশ পাবে।
১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট তিনটি ১০ দিনের পর্যায়ে দুই দেশকে পালাক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি দেওয়ার নিশ্চয়তাও রয়েছে। চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এটি ৩০ বছর কার্যকর থাকবে এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নবায়ন করা যাবে।
তবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ, কৃষি ও পরিবেশগত চাহিদা এবং নদীর দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহের পরিবর্তন নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভারতের সরকারি সংস্থা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের চুক্তি যে জলপ্রবাহের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই নদী ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
১০১ চুক্তি পর্যালোচনা, সামনে গঙ্গাও
গঙ্গা চুক্তি নিয়ে ভারতের বক্তব্য এসেছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার ঘোষণার পর। গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, এসব চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তা আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চুক্তিগুলো বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
এর আগে ভারতও জানিয়েছিল, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে তারা বিষয়টি জেনেছে, তবে এ নিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা পায়নি। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভারত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে ওই সময় জানিয়েছিলেন জয়সওয়াল।
গঙ্গা চুক্তির বিষয়টি তাই শুধু একটি পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বৃহত্তর সমীকরণের সঙ্গেও যুক্ত। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও গঙ্গাই এখন পর্যন্ত একমাত্র নদী, যার পানিবণ্টন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনই অভিন্ন নদীগুলোর পানি ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের আলোচনার প্রধান কাঠামো।















-9f40e8-256x144.webp)




