নজিরবিহীন মার্কিন মামলা, মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ৩২ বছরের পুরোনো নির্যাতন আইনে

ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে এবার ব্যবহার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ বছরের পুরোনো এবং খুব কম ব্যবহৃত একটি আইন। বিদেশে নির্যাতনের অপরাধকে শাস্তিযোগ্য করতে ১৯৯৪ সালে প্রণীত ওই আইনে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে মার্কিন প্রসিকিউশন।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মার্কিন ইতিহাসে এ আইনে এখন পর্যন্ত মাদুরোসহ মাত্র আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে অন্য কোনো দেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে তার দেশে নির্যাতনের অভিযোগে এ আইনের ব্যবহার এই প্রথম।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ১৯৯৪ সালের আইনটি এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যায়, যিনি হেফাজতে থাকা কোনো ব্যক্তির ওপর গুরুতর শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণা চাপানোর উদ্দেশ্যে নির্যাতন করেন বা এতে ষড়যন্ত্র করেন। আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য।
মাদুরো ও ফ্লোরেস গত সপ্তাহে তাদের বিরুদ্ধে আনা সংশোধিত অভিযোগে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মাদক পাচারের অভিযোগ ছিল। নতুন অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর নির্যাতন চালানোর ষড়যন্ত্র করেছিলেন তারা।
মাদুরো ও ফ্লোরেসকে গত জানুয়ারিতে কারাকাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পরিচালিত নজিরবিহীন মার্কিন সামরিক অভিযানে আটক করা হয়। পরে তাদের নিউইয়র্কে কারাবন্দি করা হয়। আগামী ২০২৭ সালের জুনে তাদের বিচার শুরু হওয়ার কথা।
মাদুরো ও সিলিয়ার বিরুদ্ধে ৩২ বছরের পুরনো আইন ব্যবহারকে মামলার গতিপথে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এত দিন মাদুরোর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল মাদক পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার। নতুন অভিযোগের ফলে তার শাসনামলে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও বিচারের কেন্দ্রে চলে আসবে।
আইন বিশেষজ্ঞ মিশেল পারাদিসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে তার দেশে নির্যাতনের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগে এই প্রথম মামলা করা হলো। তিনি এটিকে ‘নজিরবিহীন’ মামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর আর্টি ম্যাককনেল বলেন, নির্যাতনের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় সরকারের মামলা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে আরও শক্তিশালী’ হয়েছে। মাদুরো কীভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ব্যবহার করেছেন, এর মাধ্যমে প্রসিকিউশন তার একটি বিস্তৃত চিত্র আদালতে তুলে ধরতে পারবে।
১৯৯৪ সালের আইনে প্রতিটি নির্যাতনের অভিযোগে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। নির্যাতনের কারণে কোনো ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে। এ আইনে এ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ৬০ থেকে ৯৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হয়েছে। তবে মাদুরো ও ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্যাতন নয়, নির্যাতনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড সাজা প্রযোজ্য হবে না।
মামলার নথিতে কয়েকটি নির্যাতনের ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৮ সালের একটি ঘটনায় প্রসিকিউটরদের দাবি, ভেনেজুয়েলার সামরিক কর্মকর্তারা এক বন্দিকে কাস্তে দিয়ে আঘাত করেন এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার শরীরে রাসায়নিক পদার্থ ছিটিয়ে দেন। ওই ব্যক্তিকে মাদুরোবিরোধী এক রাজনৈতিক নেতার অবস্থান জানাতে চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
মামলায় তিনজন কথিত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি মার্কিন নাগরিক। তাদের সাক্ষ্য বিচারকদের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
১৯৯৪ সালের আইনটি এত দিন মূলত বিদেশে নির্যাতনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। এ আইনে অভিযুক্ত আটজনের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
তবে এবার আইনটির ব্যবহার আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে তার নিজ দেশের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগে ৩২ বছর আগে তৈরি সেই পুরোনো আইনকে আবার সামনে আনছে যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরোর বিচার তাই শুধু তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার নয়, বিদেশে সংঘটিত নির্যাতনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনের কতটা দূর পর্যন্ত প্রয়োগ করা যায়, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

















-10b8d5-256x144.webp)