কারাগারে মাদুরো, ট্রাম্পের পাশে হাসিমুখে রদ্রিগেজ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
নজিরবিহীন মার্কিন অভিযানে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় নিকোলাস মাদুরোকে (বাঁয়ে)। ডানের ছবিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাসিমুখে মাদুরোর একসময়কার ডেপুটি ও ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা ডেলসি রদ্রিগেজ। ছবি: কোলাজ
নজিরবিহীন মার্কিন অভিযানে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় নিকোলাস মাদুরোকে (বাঁয়ে)। ডানের ছবিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাসিমুখে মাদুরোর একসময়কার ডেপুটি ও ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা ডেলসি রদ্রিগেজ। ছবি: কোলাজ

মাত্র কয়েক মাস আগেও একই রাজনৈতিক শিবিরে ছিলেন তারা। একজন ছিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট, অন্যজন তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট। এখন নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দি, আর তার উত্তরসূরি ডেলসি রদ্রিগেজকে দেখা গেল নিউইয়র্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলতে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার রাতে ম্যানহাটনের একটি বিলাসবহুল হোটেলে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। বৈঠকের পর দুজনের হাসিমুখের ছবি প্রকাশ করেছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের দপ্তর।

রদ্রিগেজ এ বৈঠককে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। অথচ যে নিউইয়র্কে দাঁড়িয়ে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করলেন, তার মাত্র কয়েক মাইল দূরের একটি কারাগারে বন্দি তারই সাবেক নেতা ও রাজনৈতিক মিত্র মাদুরো।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক নজিরবিহীন অভিযানে মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকেই কারাবন্দি মাদুরো, আর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন রদ্রিগেজ।

রদ্রিগেজ মঙ্গলবারের বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবির সঙ্গে একটি বিবৃতিও দিয়েছেন। তবে ১৩৩ শব্দের সে বিবৃতিতে মাদুরোর কোনো উল্লেখ করেননি তিনি। বরং তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার এবং জ্বালানি, খনি, নিরাপত্তাসহ কৌশলগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মাদুরোর কারাগার থেকে কয়েক মাইল দূরে বৈঠক

বৈঠকের স্থানটি ছিল লোটে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেল, যা ট্রাম্প টাওয়ার থেকে কয়েক ব্লক দূরে। আর মাদুরো যেখানে বন্দি রয়েছেন, সেই ব্রুকলিনের কারাগারটি সেখান থেকে মাত্র সাত মাইল দূরে।

বৈঠকের আগের দিন এক মার্কিন সাংবাদিক রদ্রিগেজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, নিউইয়র্কে থাকার সময় তিনি মাদুরোর সঙ্গে দেখা করতে যাবেন কি না। রদ্রিগেজ কোনো জবাব দেননি। পরদিনই ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে ট্রাম্প ও রদ্রিগেজ ছাড়াও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার উপস্থিত ছিলেন। রুবিও পরে বলেন, বৈঠকটি সংক্ষিপ্ত হলেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আলোচনায় ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক রূপান্তর উঠে আসে। বুধবার রুবিও আরও জানান, দুই নেতা ভেনেজুয়েলার বিপুল বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন নিয়েও আলোচনা করেছেন।

তেলেই বদলে গেল সম্পর্কের হিসাব

মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটকের পর রদ্রিগেজের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ। মাদুরোকে আটক করার পর রদ্রিগেজকে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, তিনি মার্কিন নীতি অনুসরণ না করলে তাকেও ‘বড় মূল্য’ দিতে হবে। এরপর রদ্রিগেজ সরকারের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার তেল রাজস্বের ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের তেল চুক্তিতে যাওয়ার মতো একাধিক ছাড় দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সঙ্গে হওয়া ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের তেল চুক্তিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে অভিহিত করেন। এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রদ্রিগেজের নিউইয়র্ক সফরে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাত, ঋণ পুনর্গঠন ও খনি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক আলোচনা চলছিল।

একই দিনে ট্রাম্পের ভাষণ, সামনে বসে রদ্রিগেজ

কেবল ট্রাম্প-রদ্রিগেজ বৈঠকেই শেষ নয়, ওই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বসে ট্রাম্পের বক্তব্যও শুনেছেন রদ্রিগেজ। ভাষণে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানকে ‘বিশাল সামরিক অভিযান’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং মাদুরোকে ‘অপরাধী’ ও ‘অবৈধ স্বৈরশাসক’ হিসেবে আখ্যা দেন।

ভাষণে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘বিজয়ীরাই লুটের ভাগ পায়’। এরপর দেশটির সঙ্গে সাম্প্রতিক তেল চুক্তির প্রসঙ্গ তোলেন। সেই বক্তব্যের সময় রদ্রিগেজের অস্বস্তির ছবি নজরে আসে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর সেই ট্রাম্পের সঙ্গেই হাসিমুখে ছবি তোলেন তিনি।

ছবিতে রদ্রিগেজের বাঁ হাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল। এ নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষক তার অস্বস্তির ইঙ্গিত দেখলেও এ ধরনের শারীরিক ভঙ্গির নির্দিষ্ট অর্থ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না বলেই অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

রদ্রিগেজের জন্য ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’র বার্তা

রদ্রিগেজের জন্য বৈঠকটির রাজনৈতিক গুরুত্ব ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার হিসাবেও রয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রকাশ্য বৈঠক ও যৌথ ছবি তার অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।

উত্তর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ অরল্যান্ডো পেরেজের মতে, রদ্রিগেজের জন্য এই ছবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য, ওয়াশিংটন রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত— ছবিটি সেই বার্তাই দিচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের জন্যও এটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কারণ এতে তিনি ভেনেজুয়েলার ওপর নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠার ছবি দেখাতে পারছেন।

অন্যদিকে রদ্রিগেজের সমালোচকেরা বৈঠকটিকে তার আগের মার্কিনবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দেখছেন। মাদুরো সরকারের সময় রদ্রিগেজ নিজেই মার্কিন আধিপত্যের তীব্র সমালোচনা করতেন।

মাচাদো ফিরতে পারলেন না, রদ্রিগেজ পেলেন ট্রাম্পের সমর্থন

এদিকে রদ্রিগেজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলায় ফেরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি তিনবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি।

ট্রাম্প এরই মধ্যে রদ্রিগেজের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন এবং তার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিপরীতে মাচাদোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আগের মতো সক্রিয় নেই।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা জাতিসংঘে ভেনেজুয়েলার জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার অধিকার থাকার কথা বলেছেন এবং দেশটিতে নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন। রদ্রিগেজের সঙ্গে নিউইয়র্কে তার কোনো বৈঠক হয়নি।

ফলে নিউইয়র্কের ওই এক ছবিতে ভেনেজুয়েলার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশই ধরা পড়েছে— যে সরকারের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন একসময় সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করেছিল, সেই দেশের নতুন নেতৃত্ব এখন একই ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল, ঋণ ও নিরাপত্তা নিয়ে সমঝোতা করছে। আর মাত্র কয়েক মাইল দূরে সেই পুরোনো সরকারের প্রধান মাদুরো কারাগারে বন্দি।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement