ইরানের ইউরেনিয়াম দেশেই থাকবে— সাফ জানালেন মোজতবা খামেনি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২১ মে ২০২৬, ১৮: ৪২
তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি সংবলিত একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করল ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, দেশের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কোনো অবস্থাতেই বিদেশে পাঠানো হবে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির তরফ থেকে এমন অনমনীয় নির্দেশনা এসেছে বলে দেশটির শীর্ষস্থানীয় দুটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

আজ বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই অনড় অবস্থানের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের আলোচনা আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে নিশ্চিত করেছিলেন যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইরানের এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ইসরায়েলের দাবি, যেকোনো শান্তি চুক্তিতে এই শর্তটি অবশ্যই থাকতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ করে আসছে। তারা ইরানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করছে, যা বেসামরিক ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন— ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, দেশটির প্রক্সি মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধ করা এবং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস না করা পর্যন্ত তারা এই যুদ্ধ সমাপ্তির কথা ভাববেন না।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, 'সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা এবং ইরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যকার সামগ্রিক ঐক্যমত্য হলো— সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের এই মজুত কোনো অবস্থাতেই দেশের বাইরে যাবে না।'

ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা, এই পারমাণবিক উপাদান দেশের বাইরে পাঠানো হলে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ হামলার মুখে দেশকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। উল্লেখ্য, ইরানের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

তবে এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউজ বা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

গভীর সংশয়ে ইরানি নীতিনির্ধারকরা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে ইরান। একই সঙ্গে লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যেও তীব্র লড়াই শুরু হয়। বর্তমানে গত এপ্রিলের শুরুতে ঘোষিত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে।

তবে শান্তি আলোচনায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। একদিকে ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ, অন্যদিকে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের শক্ত নিয়ন্ত্রণ— সব মিলিয়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান এই আলোচনা বেশ জটিল রূপ নিয়েছে।

ইরানের শীর্ষ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে যে এই যুদ্ধবিরতি আসলে ওয়াশিংটনের একটি কৌশলগত চাল বা প্রতারণা। তারা মনে করছেন, নতুন করে বিমান হামলা শুরু করার আগে একটি ভুয়া নিরাপত্তা আবহ তৈরি করতেই এই সাময়িক বিরতি দেওয়া হয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত বুধবার বলেন, 'শত্রুদের দৃশ্যমান ও গোপন নানা তৎপরতা প্রমাণ করে যে আমেরিকানরা নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।' একই দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি শান্তি চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে তেহরানের ওপর আরও হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। তবে 'প্রত্যাশিত সাড়া' পাওয়ার জন্য ওয়াশিংটন আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

সূত্রগুলো জানায়, দুই পক্ষ কিছু বিষয়ে দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারলেও, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর মতভেদ রয়েই গেছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়ামের মজুত এবং পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের অধিকারের বিষয়ে ইরানের স্বীকৃতির দাবির মুখে আলোচনা আটকে আছে।

অনমনীয় তেহরান, তবে রয়েছে বিকল্প

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, তেহরানের প্রধান অগ্রাধিকার হলো এই যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা চালানো হবে না— এমন একটি নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা পাওয়া। তারা বলছেন, এই নিশ্চয়তা পাওয়ার পরেই কেবল ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসতে প্রস্তুত হবে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, বেসামরিক ব্যবহারের চেয়ে অনেক উচ্চ মাত্রার (৬০ শতাংশ) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অর্ধেক মজুত বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল ইরান। কিন্তু ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বারবার হামলার হুমকির পর তেহরান সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের ওপর আবার হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেবেন কি না, কিংবা ইসরায়েলকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার সবুজ সংকেত দেবেন কি না— তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ফের হামলা হলে এই যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

অবশ্য ইরানের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই সংকট সমাধানের জন্য কিছু 'বাস্তবায়নযোগ্য ফর্মুলা' এখনো খোলা রয়েছে। সূত্রটি জানায়, 'আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে এই ইউরেনিয়ামের মজুতকে লঘু বা তরল করার মতো সমাধানও ভাবা যেতে পারে।'

আইএইএ'র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তখন ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০.৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। তবে সেই হামলায় ঠিক কতটুকু মজুত অক্ষত রয়েছে, তা এখনো অস্পষ্ট।

চলতি বছরের মার্চ মাসে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানান, অবশিষ্ট মজুতের বেশিরভাগই ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনার একটি টানেল কমপ্লেক্সে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেখানে ২০০ কেজির কিছু বেশি ইউরেনিয়াম আছে বলে তাদের ধারণা। এ ছাড়া নাতাঞ্জের বিশাল পারমাণবিক কমপ্লেক্সেও কিছু মজুত থাকতে পারে বলে মনে করে সংস্থাটি।

ইরানের দাবি, চিকিৎসাক্ষেত্রে এবং তেহরানের একটি গবেষণা চুল্লি চালানোর জন্য এই উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন, যা চালাতে তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণে (প্রায় ২০ শতাংশ) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয়।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কিউবার রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র

মিয়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে বক্তব্য দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চে ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে বিমান ধ্বংস এবং আরমান্দো আলেহান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কস্তা, মারিও মানুয়েল দে লা পেনিয়া ও পাবলো মোরালেসের মৃত্যুর ঘটনায় পৃথক চারটি হত্যার অভিযোগও আ

৯ ঘণ্টা আগে

শর্ত না মানলে ইরানে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় আসতে রাজি হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ সময়, শক্তি এবং সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে। এই চুক্তিটি অত্যন্ত দ্রুত, এমনকি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেও সম্পন্ন হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

১১ ঘণ্টা আগে

চেকপোস্ট, কূটনৈতিক চুক্তি ও ফি— হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার ইরানের

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে নৌ রুটে পরিবাহিত হতো, সেই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান কীভাবে এই কৌশলগত চোকপয়েন্টের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে, তা উন্মোচন করতে রয়টার্স ২০ জন সংশ্

১২ ঘণ্টা আগে

‘অনুপ্রবেশকারী’ বাংলাদেশিদের বের করে দেবে পশ্চিমবঙ্গ, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী

এরপরই অনুপ্রবেশ নিয়ে মুখ খোলেন শুভেন্দু অধিকারী। বলেন, বিএসএফের সঙ্গে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করে আমরা রাজ্য ও দেশকে সুরক্ষিত করব। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ১৪ মে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল। আমাদের আগের সরকার একদিকে শরণার্থীদের সি

১ দিন আগে