'ধারণার চেয়েও দ্রুত' সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে ইরান, শুরু ড্রোন উৎপাদন

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের তেহরানে এক সমাবেশে প্রদর্শিত চালকবিহীন ইরানি ড্রোন শাহেদ-১৩৬। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতায় যে ক্ষতি হয়েছিল, তা 'ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুতগতিতে' পুনর্গঠন করছে তেহরান। গত এপ্রিলের শুরুতে ঘোষিত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালেই ইরান তার ড্রোন উৎপাদন নতুন করে শুরু করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক অনুমানের চেয়েও অনেক দ্রুত ইরানের সামরিক বাহিনী নিজেদের শক্তি ফিরে পাচ্ছে। যুদ্ধ চলাকালীন ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, লঞ্চার (ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান) এবং গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদন কারখানাগুলো তারা দ্রুত প্রতিস্থাপন করছে। একই সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সামরিক বাহিনী কতটা দুর্বল হয়েছে, তা নিয়েও এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, অস্ত্রের বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরির সময়সীমা ভিন্ন হলেও, মার্কিন গোয়েন্দাদের অনুমান বলছে— ইরান আগামী মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই তাদের ড্রোন হামলার পূর্ণ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, 'ইরানিরা নিজেদের সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার (আইসি) অনুমান করা সময়সীমার চেয়েও দ্রুতগতিতে কাজ করছে।'

সিএনএন বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ও মার্কিন মিত্রদের জন্য ইরানি ড্রোন বড় উদ্বেগের কারণ। যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি নিজেদের তৈরি ড্রোনের ব্যবহার আরও বাড়াতে পারে। এর মাধ্যমে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে হামলা চালানো তেহরানের জন্য সহজ হবে, কারণ দেশগুলো এই দুই অস্ত্রেরই আওতার মধ্যে রয়েছে।

এদিকে, ইরান সমঝোতায় রাজি না হলে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করার হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। গত মঙ্গলবারও তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, তিনি নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করার একেবারে দ্বারপ্রান্তে (এক ঘণ্টা দূরে) ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের এই দ্রুত সামরিক উত্থান যুদ্ধের মাঠে নতুন মোড় এনে দিতে পারে।

রাশিয়া-চীনের সহায়তা ও অক্ষত সামরিক শক্তি

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের এত দ্রুত সামরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে রাশিয়া ও চীনের সমর্থন, তেমনই আরেকটি সত্য হলো— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানের যতটা ক্ষতি করতে চেয়েছিল, বাস্তবে ততটা করতে পারেনি। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের মধ্যেও চীন ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করে গেছে। অবশ্য বর্তমানে মার্কিন অবরোধের কারণে তা কিছুটা সীমিত হয়ে পড়েছে।

গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, চীন ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপাদান দিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। অবশ্য চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে 'ভিত্তিহীন' বলে দাবি করেছেন।

মার্কিন গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভয়াবহ হামলার পরও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন সক্ষমতা এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো বেশ কার্যকর রয়েছে। ফলে তাদের এই সক্ষমতা পুনর্গঠন প্রক্রিয়া একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না।

এ বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একজন মুখপাত্র মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছেন, তারা গোয়েন্দা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আলোচনা করেন না। তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, 'আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী যেকোনো সময় ও স্থানে অভিযান চালানোর মতো সব সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।'

সেন্টকম প্রধানের দাবির সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের অমিল

গত এপ্রিল মাসে সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মার্কিন হামলায় ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার টিকে গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে এখন দুই-তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, চলমান যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরান মাটির নিচে বা ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া লঞ্চারগুলো উদ্ধার করতে পেরেছে। গোয়েন্দাদের এই তালিকায় এমন অনেক লঞ্চারও রয়েছে যেগুলো মাটির নিচে অক্ষত থাকলেও এই মুহূর্তে ব্যবহারের অনুপযোগী।

এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হমলার পরেও ইরানের ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ এখনো পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে বলে দুটি সূত্র সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য নিয়োজিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশই অক্ষত আছে। কারণ মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের যুদ্ধজাহাজগুলোকে নিশানা করা হলেও, উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটিতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কারণেই ইরান এখনো হরমুজ প্রণালিতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও নৌ চলাচল ব্যবস্থার ওপর বড় হুমকি বজায় রাখতে পেরেছে।

সামগ্রিকভাবে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক শক্তিকে কিছুটা দুর্বল করলেও ধ্বংস করতে পারেনি। বরং ইরানিরা দ্রুত নিজেদের সামলে নিয়ে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

তবে এই গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কমান্ডারদের বক্তব্যের বড় অমিল পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির (এইচএএসসি) শুনানিতে সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, 'অপারেশন এপিক ফিউরি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ভিত্তির ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে, যা তারা আগামী কয়েক বছরেও পুনর্গঠন করতে পারবে না।'

কিন্তু কুপারের এই দাবি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে সেন্টকম কমান্ডারের এই বিবৃতির কোনো মিল নেই। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সূত্র জানায়, মার্কিন হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে তাদের বড়জোর কয়েক মাস লাগবে, কয়েক বছর নয়। উপরন্তু, ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের একটি বড় অংশ এখনো পুরোপুরি অক্ষত থাকায় নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্র তৈরির গতি আরও অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কিউবার রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র

মিয়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে বক্তব্য দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চে ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে বিমান ধ্বংস এবং আরমান্দো আলেহান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কস্তা, মারিও মানুয়েল দে লা পেনিয়া ও পাবলো মোরালেসের মৃত্যুর ঘটনায় পৃথক চারটি হত্যার অভিযোগও আ

৯ ঘণ্টা আগে

শর্ত না মানলে ইরানে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় আসতে রাজি হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ সময়, শক্তি এবং সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে। এই চুক্তিটি অত্যন্ত দ্রুত, এমনকি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেও সম্পন্ন হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

১১ ঘণ্টা আগে

চেকপোস্ট, কূটনৈতিক চুক্তি ও ফি— হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার ইরানের

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে নৌ রুটে পরিবাহিত হতো, সেই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান কীভাবে এই কৌশলগত চোকপয়েন্টের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে, তা উন্মোচন করতে রয়টার্স ২০ জন সংশ্

১২ ঘণ্টা আগে

‘অনুপ্রবেশকারী’ বাংলাদেশিদের বের করে দেবে পশ্চিমবঙ্গ, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী

এরপরই অনুপ্রবেশ নিয়ে মুখ খোলেন শুভেন্দু অধিকারী। বলেন, বিএসএফের সঙ্গে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করে আমরা রাজ্য ও দেশকে সুরক্ষিত করব। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ১৪ মে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল। আমাদের আগের সরকার একদিকে শরণার্থীদের সি

১ দিন আগে