ট্রাম্পের ‘প্রত্যাখ্যানে’র পরও আলোচনায় উন্মুক্ত, আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় তেহরান

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ০৮
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিক আলোচনা। প্রতীকী ছবি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিক আলোচনা। প্রতীকী ছবি

ইরানের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করলেও কূটনীতির দরজা এখনো পুরোপুরি বন্ধ করেনি তেহরান। বরং ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত জবাবের অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরানের কাছে পৌঁছানোর পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে ইরান।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের শর্ত স্পষ্ট। এসব শর্ত পূরণ হলেই কেবল প্রণালিটি খুলে দেওয়ার দিকে এগোবে তেহরান। তার ভাষায়, বর্তমান অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ একমাত্র আলোচনার মাধ্যমে সমাধান।

দ্য গার্ডিয়ান ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শনিবারই হোয়াইট হাউজের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরান যে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, সেটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না বলেও জানান তিনি। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণেই তেহরান এখন সমঝোতায় যেতে চাইছে।

তবে ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য অবস্থানের পরও ইরান বলছে, মধ্যস্থতাকারীরা এখনো ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যান তেহরানের কাছে পৌঁছে দেয়নি। ফলে ট্রাম্পের প্রকাশ্য মন্তব্যকে চূড়ান্ত মার্কিন অবস্থান হিসেবে দেখছে না তেহরান।

৭ দিনের রোডম্যাপ

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দফা পরোক্ষ আলোচনা হয়। কাতারসহ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা এসব আলোচনায় ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন আরাগচি। মার্কিন পক্ষ থেকে আলোচনায় ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।

এ আলোচনার পর ইরান সাত দিনের একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করা।

আরাগচির দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শর্ত মেনে নিলে প্রথম চার থেকে পাঁচ দিনে প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার কথা ছিল।

এর বিনিময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দাবি করেছে। এর মধ্যে ছিল ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা স্থগিত করা, বিদেশে আটকে থাকা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড় এবং পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন ও ইয়েমেনকেও রাখার কথা বলা হয়েছে।

ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পরই হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।

ওয়াশিংটন-তেহরানের মূল বিরোধ কোথায়

প্রস্তাবটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের পার্থক্য এখনো বড়। তেহরান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাইছে হরমুজ প্রণালি, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং যুদ্ধবিরতির বিষয়গুলো। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় ধরনের ছাড়কে আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা ইরানকে এমনও বলেছেন যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে নয়, ফলে প্রণালি খোলার বিষয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শর্ত দিতে পারে না— এমন অবস্থানও আলোচনায় উঠে এসেছে।

তারপরও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা পুরোপুরি থেমে যায়নি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ভাবে চলছে। এমনকি পারমাণবিক ইস্যুও এসব আলোচনার অংশ বলে জানিয়েছেন তিনি।

পেজেশকিয়ানের বার্তা: আলোচনার পথই সমাধান

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও শনিবার জানিয়েছেন, যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথ আলোচনার মধ্য দিয়েই তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকটের কথা তুলে ধরেছেন।

পেজেশকিয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে আলোচনার পর ইরানের ওপর হামলা ও নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে তেহরানের ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা কমেছে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হলেও বর্তমানে সেই আলোচনার ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে ইরানের প্রশ্ন রয়েছে।

হরমুজ বন্ধের জন্য ইরানকে দায়ী করার মার্কিন বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছেন পেজেশকিয়ান। তার বক্তব্য, ইরানের ওপর পথ বন্ধ করে দেওয়ার পর হরমুজে চলাচলের সংকট তৈরি হয়েছে এবং সেটিকে তিনি পরিস্থিতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তবে যুদ্ধ শেষ হলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

সামনে কী?

এখন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি প্রশ্ন— যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কী জবাব দেয় এবং ইরান সেই জবাব পাওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেয়।

ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানের পরও আরাগচি যে আনুষ্ঠানিক মার্কিন জবাবের অপেক্ষার কথা বলেছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে তেহরান অন্তত কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ এখনই বন্ধ করতে চাইছে না। একই সঙ্গে ইরান পরিষ্কার করে দিয়েছে, হরমুজ পুনরায় খোলার বিষয়টি কোনো নিঃশর্ত পদক্ষেপ হবে না; বরং মার্কিন সামরিক চাপ, নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির মতো বিষয়গুলোতে সমঝোতা প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রকাশ্য অবস্থান এবং তার প্রশাসনের আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যুতে জোর দেওয়ার কারণে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এখনো যথেষ্ট। ফলে নিউইয়র্কে কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার পর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো চূড়ান্ত সমঝোতায় রূপ নেয়নি।

তার ওপর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় সময়ের চাপও রয়েছে। এর আগে আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ ইঙ্গিত দিয়েছেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বড় ধরনের সমঝোতা করা কঠিন হতে পারে। তবে আরাগচি বলেছেন, নির্বাচনের আগেই চুক্তিতে পৌঁছানো গেলে সেটিই ভালো হবে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘না’ বলার পরও তেহরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং এখন ইরান অপেক্ষা করছে ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আসা আনুষ্ঠানিক জবাবের জন্য। সেই জবাবই নির্ধারণ করতে পারে— সাত দিনের রোডম্যাপ নতুন করে আলোচনার ভিত্তি হবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থাই আরও গভীর হবে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement