কূটনীতি নাকি রাজনীতি— ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কার হাতে?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৩৫
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কে নির্ধারণ করছেন— এই প্রশ্নটি আজ নতুন করে সামনে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি বেশ স্পষ্টই মনে হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. এস জয়শঙ্কারই নরেন্দ্র মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান মুখ। অভিজ্ঞ ও চৌকস এই কূটনীতিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দৃঢ় বক্তব্য ও স্পষ্ট অবস্থানের জন্য পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে— সাউথ ব্লকে আদৌ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কে?

সর্বশেষ উদাহরণ বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন। গত ৩১ ডিসেম্বর ড. জয়শঙ্কার ঢাকা সফরে এসে প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে শোকবার্তা পৌঁছে দেন। এই সাক্ষাৎকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন।

কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে চুক্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ফ্র্যাঞ্চাইজিটি তাৎক্ষণিকভাবে সেই নির্দেশ মেনে নেয়। এর জেরে বাংলাদেশ সরকার ও ক্রিকেট বোর্ড ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় এবং প্রতিবাদস্বরূপ আগামী মাসে ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ না খেলার ঘোষণাও আসে।

প্রশ্ন উঠেছে— এই ৪৮ ঘণ্টায় কী এমন বদলে গেল? ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে ছিল বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ ঘিরে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর চাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো প্রচারণা। উত্তরপ্রদেশের বিজেপি বিধায়ক সংগীত সোম কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে বিতর্কে ঘি ঢালেন। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের ‘ফ্রিঞ্জ’ রাজনীতিই এখন মূলধারায় পরিণত হয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে একটি পরিণত সরকার এ ধরনের চাপ উপেক্ষা করত। কিন্তু বর্তমান ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৃষ্ট আবেগ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ অনেক ক্ষেত্রে সংবেদনশীল পররাষ্ট্রনীতিকেও প্রভাবিত করছে। এতে করে কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রিকেট কেবল খেলা নয়— উপমহাদেশে এটি ভারতের ‘সফট পাওয়ার’-এর অন্যতম বড় হাতিয়ার। বিসিসিআইয়ের প্রভাব বিশ্ব ক্রিকেটে সুপ্রতিষ্ঠিত। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে জয় শাহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সভাপতি হওয়ায় এই প্রভাব আরও বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে একজন ক্রিকেটারকে ঘিরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, কূটনীতিতেও নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন থেকেই যায়— ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কি পেশাদার কূটনীতিকদের হাতে, নাকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক হিসাবই এখানে মুখ্য? কূটনৈতিক মহলের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় সূক্ষ্ম ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। অথচ আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশবিরোধী আবেগ উসকে দেওয়াকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালদ্বীপ, তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও এমন আবেগনির্ভর ও হঠাৎ সিদ্ধান্তের নজির রয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বয়কটের ডাক দেওয়া হলেও পরে আবার স্বাভাবিক যোগাযোগে ফেরা— এই দ্বৈত নীতির উদাহরণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পররাষ্ট্রনীতি যদি কৌশল ও বাস্তবতার বদলে আবেগ ও রাজনৈতিক ফায়দার ওপর নির্ভর করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

উল্লেখ্য, কয়েক দিন আগে এক শপিং মলে ছাড়ে বিক্রি হওয়া সোয়েটার কিনতে তরুণদের ভিড় দেখা যায়। পোশাকগুলোর ট্যাগে লেখা ছিল— ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। প্রশ্ন উঠছে— একজন ক্রিকেটারকে নিশানা করা যত সহজ, বাণিজ্যিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে এড়িয়ে চলা কি ততটাই সহজ?

ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অবলম্বনে

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement