মাঝ আকাশে ৩০০ ফুট পতন: ভারতীয় সেই পাইলটের শরীরে গাঁজা শনাক্ত

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ১৬
ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২৩৭৯ ফ্লাইটে হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনির পরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২৩৭৯ ফ্লাইটে হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনির পরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

মাঝ আকাশে হঠাৎ ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায় ভারতের এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান। এতে ২০ যাত্রী ও চার ক্রু আহত হন। পরে তদন্তে বিমানের ক্যাপ্টেনের গাঁজা সেবনের তথ্য পাওয়া যায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির জানিয়েছে, এ ঘটনার পর দুই পাইলটকেই সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

উড়োজাহাজে কোনো গুরুতর ঘটনার পর স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিউর অনুযায়ী, উভয় পাইলটকেই পোস্ট-ফ্লাইট ড্রাগ স্ক্রিনিং টেস্ট করাতে হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফার্স্ট অফিসারের পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও ক্যাপ্টেন দুটি পরীক্ষাতেই অকৃতকার্য হন। বিশেষ করে দ্বিতীয় পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি গাঁজা সেবন করেছিলেন। তবে তিনি কখন বা কোথায় গাঁজা সেবন করেছিলেন, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

১৩৭ জন যাত্রী ও আটজন ক্রু নিয়ে এআই-২৩৭৯ ফ্লাইটটি গত ৪ আগস্ট ফুকেট থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়। মাঝ আকাশে হঠাৎ বিমানটি প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ ‘ফ্লাইট সেফটি’ প্রতিবেদনের তথ্যের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, এয়ারবাস এ৩২০-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা ফার্স্ট অফিসার বিমানটির গতি দ্রুত বাড়াতে এবং স্টল বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিচে পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতে বিমানের সামনের দিকটি (নোজ) খাড়া করে নিচের দিকে নামাতে বাধ্য হন।

এতে উড়োজাহাজে তীব্র নেতিবাচক ‘জি-ফোর্স’ তৈরি হয়। বিমানটির নাক এত দ্রুত নিচের দিকে নেমে যায় যে, কয়েক মুহূর্তের জন্য এটি স্বাভাবিক মহাকর্ষীয় গতির চেয়েও দ্রুত নিচে নামতে থাকে। সিটবেল্ট বাঁধা না থাকায় যাত্রী ও ক্রুদের অনেকেই আসন থেকে উঠে শূন্যে ভাসতে শুরু করেন।

সেই সময় সিটে না থাকা ক্যাপ্টেন পরে ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, নিজেও শূন্যে ছিটকে পড়ার পাশাপাশি ফার্স্ট অফিসার এবং ককপিটের বিভিন্ন খোলা জিনিসপত্রকে বাতাসে ভাসতে দেখেন। পরে ইঞ্জিনের ওয়ার্নিং ডিসপ্লেতে একটি হলুদ সতর্কতা বার্তা দেখা যায়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, ঘটনার সময় বিমানটি তার সহনশীলতার সর্বনিম্ন সীমা (-1g structural limit) অতিক্রম করেছিল।

ক্যাপ্টেনের বর্ণনা অনুযায়ী, ককপিটে নিজেও ছিটকে পড়ার মধ্যে তিনি মাঝআকাশে থাকা ফার্স্ট অফিসারকে স্থির রাখার চেষ্টা করেন। এরপর তির্যকভাবে নিজের আসনের দিকে এগিয়ে গিয়ে সিটবেল্টের সংকেত চালু করেন। আসনে বসে সিটবেল্ট বাঁধার পর তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ কন্ট্রোলস’ এবং উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেন।

তখনও বিমানটি নিচের দিকে নামছিল। গতি ও উচ্চতা কমে যাওয়া ঠেকাতে পাইলট থ্রটল সর্বোচ্চ ধারাবাহিক থ্রাস্টে নিয়ে যান। সর্বোচ্চ প্রায় ৩০০ ফুট উচ্চতা হারানোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। উড়োজাহাজটি স্থিতিশীল হওয়ার পর দুই পাইলট একে অপরের খোঁজ নেন এবং ককপিটের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। বিষয়টি কলকাতা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পাইলটরা এ৩২০ উড়োজাহাজটি নয়াদিল্লিতে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন।

এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ ‘ফ্লাইট সেফটি’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসিএএমে ‘ডোর আর্ম ফরওয়ার্ড ইমার্জেন্সি’ সতর্কবার্তা দেখা দেয়। পরে আরও দুবার একই সতর্কতা ভেসে ওঠে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রুরা চেকলিস্ট পরীক্ষা করেন, সিস্টেম প্রেসার পেজগুলো ক্রস-চেক করেন এবং সব প্যারামিটার স্বাভাবিক দেখতে পান। ফলে তারা সতর্কতাগুলোকে সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটি বা মিথ্যা (স্পুরিয়াস) সতর্কতা হিসেবে ধরে নেন।

এ ছাড়া ‘ট্রানজিয়েন্ট হাইড্রোলিক কশন’ সতর্কবার্তাটিও উড়োজাহাজের নির্ধারিত রিসেট পদ্ধতির মাধ্যমে সমাধান করা হয়। ক্রু সদস্যরা জানান, সব পদক্ষেপ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) এবং ককপিটের স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।

তবে প্রকৌশলীদের রেকর্ডে আরও গুরুতর পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একই মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি প্রথমে গ্রিন হাইড্রোলিক সিস্টেমে, এরপর একই সঙ্গে ব্লু ও ইয়েলো সিস্টেমে এবং সবশেষে তিনটি সিস্টেমেই নিম্নচাপের সংকেত দেয়। তবে তিনটি সিস্টেমে একই সময়ে চাপ কমেছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। হাইড্রোলিক সিস্টেম মূলত বিমানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, ল্যান্ডিং গিয়ার, ব্রেকসহ বিভিন্ন ভারী যান্ত্রিক অংশ পরিচালনায় চাপযুক্ত তরল ব্যবহার করে।

এর পাশাপাশি অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বাম ও ডান এলিভেটরে ত্রুটির সংকেত দেখা দেয়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, উড়োজাহাজটির পিচ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সত্যিই ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এ কারণেই হঠাৎ বিমানের সামনের দিকটি ওপরে উঠে যাওয়ার পেছনে এই ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পিচ নিয়ন্ত্রণ বলতে পাইলটের বিমানের নাক ওপরে বা নিচে তোলার সক্ষমতাকে বোঝায়। এর ওপরই নির্ভর করে উড়োজাহাজটি ওপরে উঠবে, নিচে নামবে নাকি সমতলে উড়বে।

তদন্তকারীরা পরে নিশ্চিত করেছেন, তিনটি হাইড্রোলিক সিস্টেমেই ত্রুটির সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। এটি গুরুতর এবং সম্ভবত নজিরবিহীন একটি সমন্বয়। কারণ, এ৩২০-এর তিনটি স্বাধীন হাইড্রোলিক সিস্টেম এমনভাবে নকশা করা যে, একটি সিস্টেমে সমস্যা হলে অন্যগুলো তা সামাল দিতে পারে। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর রক্ষণাবেক্ষণকারী দল উড়োজাহাজটির প্রকৌশলগত পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ করে।

কেবিন ক্রুদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি জানার পর ক্যাপ্টেন নিজেই ককপিট থেকে বেরিয়ে কেবিন পরিদর্শন করেন। তাকে জানানো হয়, বেশ কয়েকজন যাত্রী ও দুই কেবিন ক্রু গুরুতর আহত হয়েছেন এবং কেবিনের কিছু সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসাকর্মী ও অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থা করতে বলা হয়।

পাশাপাশি আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য রানওয়ের বহির্গমনপথের সবচেয়ে কাছের পার্কিং বে বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। উড়োজাহাজটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদে দিল্লিতে অবতরণ করে। তবে পরে যে পার্কিং বে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটি রানওয়ে থেকে পাইলটদের অনুরোধ করা জায়গার তুলনায় আরও দূরে ছিল।

ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তর (ডিজিসিএ) ঘটনাটিকে ‘সিরিয়াস ইনসিডেন্ট’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) অ্যানেক্স ১৩-এর কাঠামোর আওতায় এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) ঘটনাটি তদন্ত করছে। তদন্তে উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস এবং ফ্রান্সের বিইএ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

এক বিবৃতিতে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে।

মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এএআইবি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সব প্রযুক্তিগত, পরিচালনাগত, চিকিৎসা ও মানবিক বিষয়সংক্রান্ত তথ্য পদ্ধতিগতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করছে। এর মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজ ও এর বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা, রেকর্ড করা ফ্লাইটের তথ্য, সংশ্লিষ্ট পরিচালনাগত ও রক্ষণাবেক্ষণ নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সব প্রাসঙ্গিক তথ্য ও প্রমাণ সামগ্রিকভাবে পরীক্ষা করা হবে।’

এদিকে এয়ার ইন্ডিয়ার বিদায়ী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাম্পবেল উইলসন মঙ্গলবার ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

অন্যদিকে মন্ত্রী রাম মোহন নাইডু জানান, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এয়ার ইন্ডিয়ার কাছ থেকেও ঘটনাটি সম্পর্কে সরাসরি হালনাগাদ তথ্য নিতে চেয়েছি এবং তারা বিষয়টি কীভাবে দেখছে, সেটিও জানতে চেয়েছি। আমি বারবার বলেছি, বিমান চলাচলে নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, এয়ারলাইন বা অন্য কারও পক্ষ থেকেই কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। মন্ত্রণালয়ও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।’

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement