সিইসির পদত্যাগ দাবিতে রাহুলের নেতৃত্বে দিনভর বিক্ষোভ, ৯ ঘণ্টা পর আটক

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
প্রায় ৯ ঘণ্টা অবরোধের পর রাহুল গান্ধীকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
প্রায় ৯ ঘণ্টা অবরোধের পর রাহুল গান্ধীকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে মঙ্গলবার দিনভর বিক্ষোভ করেছেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের নেতারা। সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) দপ্তরের দিকে মিছিল, পুলিশের ব্যারিকেড টপকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, আকস্মিকভাবে আকাশবাণী ভবনে ঢুকে পড়া এবং সেখানে প্রায় ৯ ঘণ্টা অবস্থানের পর শেষ পর্যন্ত লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী এমপিদের আটক করে দিল্লি পুলিশ।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকাল ১১টার দিকে সংসদের মকর দ্বার থেকে মিছিল শুরু করেন রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া জোটের নেতারা। তাদের হাতে ছিল জ্ঞানেশ কুমারের ছবি ও বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। ‘ভোট চোর, গদি ছাড়ো’ স্লোগান দিতে দিতে তারা নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর নির্বচন সদনের দিকে এগোতে থাকেন। পুলিশ আগে থেকেই মধ্য দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করেছিল এবং একাধিক জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়।

নিতি আয়োগের কাছে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে মিছিল। একপর্যায়ে রাহুল গান্ধী ভারী লোহার ব্যারিকেডের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা নাড়েন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে বিরোধী নেতাদের উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস নেতা কে সি বেনুগোপালসহ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন ও মহুয়া মৈত্র এবং সিপিএমের জন ব্রিটাসও বিক্ষোভে অংশ নেন।

এরপর পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নেয়। পুলিশ যখন একের পর এক বিরোধী এমপিকে বাসে তুলছিল, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আকাশবাণী ভবনের দিকে চলে যান। প্রথমে ভবনের প্রবেশপথে তাদের বাধা দেওয়া হলেও পরে তারা সেখানে ঢুকে পড়েন। কংগ্রেসের আরও কয়েকজন নেতা তাদের সঙ্গে যোগ দেন। সেখানে মাটিতে চাটাই পেতে শুরু হয় অবস্থান কর্মসূচি।

প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে চলে এই অবস্থান। রাহুল বেশির ভাগ সময় বসে ছিলেন। প্রিয়াঙ্কা পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে কংগ্রেস ও ইন্ডিয়া জোটের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের জন্য পানি, কোমল পানীয়, চিপস, ভুজিয়া, চকোলেট ও খাবারও আসে।

বিকেল গড়ানোর পরও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক না হওয়ায় অবস্থান অব্যাহত রাখেন তারা। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যায় দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভস্থল খালি করে রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, কে সি বেনুগোপাল, পবন খেরা, ডেরেক ও’ব্রায়েন, মহুয়া মৈত্রসহ কয়েকজনকে আটক করে। পুলিশের হিসাবে, দিনভর প্রায় ২৬০ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ১০ জন সংসদ সদস্য

কেন এই বিক্ষোভ

পুরো আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)। এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা পুনরায় যাচাই ও সংশোধন করা হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে বৈধ ভোটারদের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়ছে এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় বিজেপির সুবিধা তৈরি হচ্ছে। ইন্ডিয়া জোটের দাবি— এসআইআর বাতিল করতে হবে, বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বহাল করতে হবে এবং জ্ঞানেশ কুমারকে সিইসি পদ থেকে সরতে হবে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ জুড়ে এসআইআরের খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। এসব বাদ পড়া ভোটারকে পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

বিতর্কটি এখন আদালতেও গড়িয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, নির্বাচন কমিশন ও জ্ঞানেশ কুমারের কাছে জবাব চেয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, এসআইআরের উদ্দেশ্য মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ দিয়ে ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করা। কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।

বৈঠক চাওয়া নিয়েও পালটাপালটি দাবি

মঙ্গলবারের বিক্ষোভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে বিরোধ। বিরোধীরা বলেছে, তারা কমিশনের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দিতে চেয়েছিল।

তবে কমিশন রাতে জানায়, বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আবেদন করেনি। পরে তারা জানতে পারে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে প্রায় ২৪০ এমপির একটি প্রতিনিধি দল দেখা করতে চায়। কমিশন এটিকে ‘অস্বাভাবিক’ প্রস্তাব বলে জানায় এবং নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী কমিশনের দপ্তরেই বৈঠক করার কথা তুলে ধরে।

এদিকে বিজেপি রাহুলের আন্দোলনকে ‘নাটক’ ও রাজনৈতিক হতাশা থেকে তৈরি বিশৃঙ্খলা বলে আক্রমণ করেছে। দলটির নেতাদের দাবি, বিরোধীরা নির্বাচনে পরাজয়ের দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপাচ্ছে।

মঙ্গলবারের ঘটনার পরও অবশ্য আন্দোলন থামার ইঙ্গিত নেই। এসআইআর ও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি চলার কথা রয়েছে, ফলে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা ও ভোটার তালিকা নিয়ে সরকার-বিরোধী সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement