সিইসির পদত্যাগের দাবিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মিছিল, আটক প্রিয়াঙ্কা-অখিলেশ-অভিষেক

ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সদর দপ্তর অভিমুখে মিছিল করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। মিছিলটি নীতি আয়োগের কার্যালয়ের সামনে আটকে দেয় পুলিশ। সেখান থেকে কংগ্রেস নেতা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা, সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমস ও দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ভারতের সংসদ ভবন থেকে এ মিছিল শুরু করে বিরোধী দলীয় জোট। নীতি আয়োগ ও আকাশবাণী ভবনের মধ্যবর্তী সড়ক দিয়ে ‘নির্বাচন সদনে’র দিকে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা কর্মীরা মিছিলটি আটকে দেন। এ সময় সামনে এগোতে না পেরে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা রাস্তায় বসে প্রতিবাদ শুরু করেন।
মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাদের হাতে জ্ঞানেশ কুমারের আরএসএসের পোশাক পরা ছবি সম্বলিত কাটআউট দেখা যায়। তারা ‘বিজেপি হ্যায়, সিইসি হ্যায়’, ‘ভোট চোর, গদ্দি ছাড়’ এবং ‘ডেমোক্রেসি নট ফর সেল’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
পুলিশের বাধার পর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়। আটকের আগে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী লেখেন, ‘জ্ঞানেশ, হয়ে গেছে ভাই। এবার পদত্যাগ করার সময়।’
মিছিলে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েন, কংগ্রেস নেতা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা, এসপি প্রধান অখিলেশ যাদব এবং সিপিআই (এম) নেতা জন ব্রিটাসসহ বিরোধী দলের নেতারা অংশ নেন।
মিছিল শুরুর আগে সংসদ ভবনের মকর দ্বারে জড়ো হন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। পরে তারা নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে রওনা হন। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের আশপাশে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড বসানোর পাশাপাশি আগে থেকেই নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়।
মিছিলের আগে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও জানান তারা। ভোটার হিসেবে নাম নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের পর তাদের এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে বলে জানান বিরোধী নেতারা।
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইমরান মাসুদ অভিযোগ করেন, জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করেছেন। পিটিআই ভিডিওকে তিনি বলেন, ‘দেশ জুড়ে জ্ঞানেশ কুমার যে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান ছিল, যাকে পুরো দেশ বিশ্বাস করত। পুরো দেশ এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ব করত। এর নিরপেক্ষতা নিয়ে কখনো প্রশ্ন ওঠেনি। একজন ব্যক্তি সেই আস্থা ভেঙে দিয়েছেন।’
ইমরান আরও বলেন, ‘একটি পুরো চক্র একসঙ্গে কাজ করছে। আমরা জ্ঞানেশ কুমারকে প্রশ্ন করব এবং বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা এর জবাব দিতে শুরু করবেন।’

সিপিআইয়ের সংসদ সদস্য পি সন্তোষ কুমার বলেন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সময় ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি সোমবার সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের পর আরও জোরালো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘২৬ সেপ্টেম্বর কমিশনের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ফর্ম ৬-সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেছে। কিন্তু এখন প্রমাণিত হয়েছে, এটি পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর একটি বক্তব্য।’
সিপিআইয়ের এই নেতা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ‘চিটিং ইলেকশন কমিশনার’ বা ‘প্রতারণাকারী নির্বাচন কমিশনার’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সাল থেকেই বিরোধী দলগুলো এই বিধানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে এবং এখন তারা আন্দোলন আরও জোরালো করবে।
মিছিলের আগে নিরাপত্তা মোতায়েন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিবসেনা (ইউবিটি) সংসদ সদস্য সঞ্জয় রাউত। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করতে চেয়েছিলেন। সঞ্জয় রাউত বলেন, ‘আমরা সংসদ সদস্য। আমরা সংসদের সদস্য। আমরা এই দেশের নাগরিকও। আমাদের থামাতে এত বিপুলসংখ্যক বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন কেন? আমরা হেঁটে যাব। আমরা নিরস্ত্র।’
রাউত দাবি করেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর (সিআইএসএফ) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। মন্ত্রীদের বাসভবনের বাইরেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফর্ম ৬ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের সমালোচনা করেন রাউত। তার দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকার ‘নৈতিক অধিকার’ নেই জ্ঞানেশ কুমারের।
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ফর্ম ৬-এর কোনো পরিবর্তিত সংস্করণ তারা অনুমোদন করেনি। ফর্মটিতে কোনো পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে কে সেই পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের নথিপত্র খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে আদালত। জ্ঞানেশ কুমারের কথিত একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা একটি আবেদনের শুনানির সময় আদালত এসব পর্যবেক্ষণ দেয়।
এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন বলেছিল, এসআইআরের জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্রটি সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে। তবে এসআইআর কার্যক্রমের সময়ের বাইরে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালায় নির্ধারিত ফর্ম ব্যবহার করা হবে বলেও জানিয়েছিল কমিশন।
এদিকে, মিছিল শুরুর আগে আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ দাবি করেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করতে পারেন বলে তিনি তথ্য পেয়েছেন। তবে সিইসির সম্ভাব্য পদত্যাগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রমে কথিত অনিয়মের অভিযোগ এবং তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে মতপার্থক্যের খবরের মধ্যেই এই প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলো। তবে নির্বাচন কমিশন নিজেদের মধ্যে বিভাজনের কথা নাকচ করেছে। কমিশনের দাবি, এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে।




















