সিইসির পদত্যাগ দাবিতে মিছিল: আটকের পর রাহুল-প্রিয়াঙ্কাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সদর দপ্তর পর্যন্ত মিছিল করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ওই মিছিলে অংশ নেন বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। পরে নীতি আয়োগের কার্যালয়ের কাছে মিছিলটি আটকে দেয় পুলিশ। সেখান থেকে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাসহ বেশ কয়েকজন বিরোধী এমপিকে আটক করে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা নেওয়া হয়। সংসদের মকর দ্বার থেকে মিছিলটি শুরু হয়। এতে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি), সমাজবাদী পার্টি (এসপি), শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি, শিবসেনা (ইউবিটি), বাম দলগুলো এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) নেতারা ও এমপিরা অংশ নেন।
জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) এবং ইন্ডিয়া জোট— দুই জোট থেকেই দূরত্ব বজায় রাখা বিজু জনতা দলের (বিজেডি) একজন রাজ্যসভা এমপিও বিক্ষোভে যোগ দেন। এ ছাড়া কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে মিছিলে ছিলেন টিএমসির অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েন, এসপি সভাপতি অখিলেশ যাদব, এনসিপির সুপ্রিয়া সুলে এবং শিবসেনার (ইউবিটি) সঞ্জয় রাউত ও অরবিন্দ সাওয়ান্ত।
’sSupriyaSuleandCongress’PriyankaGandhiVadraduringINDIAbloc’s-23806e.jpg)
নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীরা ‘ভোট চোর, গদ্দি ছাড়’ স্লোগান দেন। রাহুল গান্ধী ব্যারিকেডের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ান। পরে এমপিরা রাস্তায় বসে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর তাদের আটক করা হয়।
চলতি মাসের শুরুতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে এই বিক্ষোভের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ওই বৈঠকে বিরোধী নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সংক্রান্ত আদেশ বাতিল এবং ব্যালট পেপারে নির্বাচন আয়োজনের দাবি নিয়ে আলোচনা করেন।
বিক্ষোভে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জ্ঞানেশ কুমারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার একজন চোর, অবশ্যই... কিন্তু তাকে ভোট চুরির কৌশল যে শিখিয়েছে, সেই সবচেয়ে বড় চোর। আমরা এসব চোরের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।’ এ সময় তিনি ক্ষমতাসীন বিজেপি ও এর নেতাদের নাম উল্লেখ না করেই তাদের সমালোচনা করেন। খাড়গে আরও বলেন, ‘আজ দেশের মানুষ বুঝতে পারছেন, তাদের ভোট চুরি করা হচ্ছে এবং তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’
কংগ্রেসের রাজ্যসভা সদস্য রণজিৎ রঞ্জন বলেন, তাদের তিনটি প্রধান দাবি রয়েছে। এগুলো হলো— জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ, এসআইআর বাতিল এবং ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।
রণজিৎ রঞ্জন বলেন, ‘এমনকি সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিও তীব্র মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ফর্ম ৬-এ করা পরিবর্তন সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়নি। এটি ১৩ কোটি ভোটারের বিষয়, এটি সংবিধানের বিষয় এবং মানুষের ভোট দেওয়ার মৌলিক অধিকারের বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত পুরো বিরোধী দল এবং দেশের মানুষ রাস্তায় থাকবে। আমরা এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাব।’
তবে নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের এসব অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের দাবি, এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে। বিজেপিও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
শিবসেনার (ইউবিটি) এমপি অরবিন্দ সাওয়ান্ত রণজিৎ রঞ্জনের দাবিগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। এর পাশাপাশি তিনি বলেন, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সবাইকে আবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
টিএমসির অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর কার্যক্রমের সঙ্গে মঙ্গলবারের বিক্ষোভের যোগসূত্র তুলে ধরেন। লোকসভার এই এমপি বলেন, ‘আজ বাংলায় যেভাবে এসআইআর পরিচালনা করা হয়েছে এবং সারা দেশে যেভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটিই প্রমাণিত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিজেপি এত আত্মবিশ্বাসী কেন? কারণ দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে কি না, গ্যাস, পেট্রল, কেরোসিন বা সবজির দাম বাড়ছে কি না—এসব নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। তারা এসব নিয়ে চিন্তিত নয়, কারণ তারা জানে জ্ঞানেশ কুমার সেখানে বসে আছেন এবং ভোট চুরি করে তারা আবারও জিতবে।’
উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব বলেন, সমাজবাদী পার্টির নেতা-কর্মীরা আন্দোলন ও পরিশ্রমকে ভয় পান না। তিনি বলেন, ‘বিজেপি ভয় পেয়ে গেছে বলেই এখানে পুলিশের ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে... তারা উপনির্বাচনেও ভোট লুট করেছে। পিডিএ—পিছিয়ে পড়া শ্রেণি, দলিত ও সংখ্যালঘুরা— বিজেপিকে পরাজিত করবে।’
এর আগে কংগ্রেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে লক্ষ্য করে একের পর এক পোস্ট দেয়। এক পোস্টে দলটি লেখে, ‘জ্ঞানেশ, হয়ে গেছে ভাই। এবার পদত্যাগ করার সময়।’
কংগ্রেস সূত্রের বরাতে দ্য প্রিন্টের খবরে বলা হয়, আম আদমি পার্টি (এএপি) এবং দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (ডিএমকে)-কেও কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে এএপি আগেই জানিয়েছিল, তারা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন এই মিছিলে অংশ নেবে না এবং আলাদাভাবে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করবে। অবশ্য এএপি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষার অভিযোগ তুলেছে।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আরও কয়েকটি কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে বিরোধীরা। কংগ্রেস ১০ থেকে ২০ অক্টোবর ব্লক ও জেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ করবে। দলটির ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ কর্মসূচি ২৫ অক্টোবর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে চলবে।
এ ছাড়া উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা ও রাজস্থান থেকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ছয়টি যাত্রা ২৬ নভেম্বর দিল্লিতে এসে মিলিত হবে। ওই দিন বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইন্ডিয়া জোট ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে একটি সমাবেশ করবে।
এদিকে রাজনৈতিক দল না হলেও অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছে।





















