পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশ যেভাবে ‘বড়’ ভূমিকা রেখেছে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ১৮: ৩০
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকরা কলকাতায় দলটির আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে উল্লাসে মেতেছেন। ছবি: রয়টার্স
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকরা কলকাতায় দলটির আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে উল্লাসে মেতেছেন। ছবি: রয়টার্স

পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের টানা তিন মেয়াদের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে। ২০১১ সালে বামপন্থি সরকার পতনের পর এবার মমতার দুর্গের পতন ঘটিয়ে ইতিহাস গড়েছে বিজেপি। এই বড় জয়ের কারণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা।

ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্টে’র কন্ট্রিবিউটিং এডিটর দ্বীপ হালদারের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশ ‘বড়’ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি মনে করছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হিন্দুদের ওপর কথিত ‘নির্যাতন’, বাংলাদেশে শিকড় থাকা মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট ব্যবহার, এবং ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ কারণে রাজ্যের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য পরিবর্তনের আশঙ্কা— এসব বিষয় সম্মিলিতভাবে বিজেপির এই জয়ে প্রভাব ফেলেছে।

গতকাল সোমবার দ্য প্রিন্ট-এর মতামত বিভাগে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দ্বীপ হালদার লেখেন, “বিজেপির ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ ইস্যুকেন্দ্রিক বয়ানের বিপরীতে, স্বতন্ত্র বামঘেঁষা এই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনি আলোচনায় যে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণকে দূরে রাখা হয়েছিল, এবারের নির্বাচনে তা আর কাজ করেনি।”

কলকাতার রাস্তায় বিজেপি সমর্থকদের জয় উদযাপনের দৃশ্য। ছবি: এএফপি
কলকাতার রাস্তায় বিজেপি সমর্থকদের জয় উদযাপনের দৃশ্য। ছবি: এএফপি

দ্বীপ হালদার লেখেন লেখেন, “মূলত একটি লাল (বামপন্থি রাজ্যকে গেরুয়া রঙে রূপান্তর করতে দরকার ছিল শক্তিশালী এক বয়ান— যা ব্যালটের মাধ্যমে এক ধরনের ‘রঙিন বিপ্লব’ ঘটিয়েছে।” তার মতে, পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে বামফ্রন্ট পরাজিত হলেও, রাজ্যটি অনেকাংশে বামপন্থি ভাবধারার মধ্যেই অবস্থান করছিল।

তিনি লেখেন, তৃণমূল কংগ্রেসের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বিশাল জাল এবং বৃহৎ শিল্পের বিরোধিতার দীর্ঘ ইতিহাস— বিশেষ করে ২০০৬-২০০৮ সালের সিঙ্গুর আন্দোলনে টাটা শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ক্ষমতায় থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যর্থতা— রাজ্যে দলটিকে সাধারণভাবে ‘বামের চেয়েও বেশি বাম’ হিসেবে পরিচিত করেছে।

এই কারণেই ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বহু পর্যবেক্ষকের কাছে এত বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, অন্যান্য কারণের পাশাপাশি বিজেপির এই জয়ের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ।

হাসিনার পতন, হিন্দুত্ববাদের উত্থান

দ্বীপ হালদার লিখেছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের সামনে হিন্দু সন্ন্যাসী ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু পোশাকশ্রমিককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহ আগুনে পোড়ানোর প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ হয়। দিপু হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসে এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ায়।

উপ-হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ চলাকালে উত্তেজিত জনতা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। সেখানে গণমাধ্যমের কাছে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে এবং নারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেছে। সে সময় এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে বিক্ষোভকারীদের কাউকে কাউকে চিৎকার করে বলতে শোনা গেছে, ‘এই পুলিশ রাজ্যের পুলিশ নয়, এরা বাংলাদেশি পুলিশ। এই পুলিশ সন্ন্যাসীদের লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে এবং নারীদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছে’।

বিজেপির যুব সংগঠন ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার রাজ্য সহ-সভাপতি অরুণ শাহ দ্য প্রিন্টকে বলেন, ‘শুধু হিন্দু হওয়ার কারণে দিপু চন্দ্র দাস হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কলকাতার কেন্দ্রে গেরুয়া পোশাক পরা সন্ন্যাসীদের পিটিয়ে দমন করা হয়েছে— এটা কল্পনাতীত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কার পক্ষে ছিলেন? না বাংলাদেশি হিন্দুদের, না পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার খবরে এক সমর্থক তার ছবি সম্বলিত নির্বাচনি বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলছেন। ছবি: এপি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার খবরে এক সমর্থক তার ছবি সম্বলিত নির্বাচনি বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলছেন। ছবি: এপি

বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী দ্রুত একটি পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ‘নির্যাতন’ বন্ধের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি হিন্দু বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে তৃণমূল সরকারকে কঠোর সমালোচনা করেন।

দ্বীপ হালদার লেখেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুভেন্দু অধিকারী তার আগের বক্তব্য আরও জোরালো করেন, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ অবৈধ অভিবাসী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এবার মুখ্যমন্ত্রীকে কেউ বাঁচাতে পারবে না… ভুয়া ভোট কমে যাবে এবং যারা ভুয়া ভোট দিত, তাদের নির্মূল করা হবে।’

দ্বীপ হালদার মনে করেন, মূলত তখন থেকেই বিজেপির বয়ানে জোর দেওয়া হয় যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুরা ‘ঝুঁকিতে’ পড়েছে। অপরদিকে মুসলিমরা অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে ‘সুবিধা করে দিচ্ছে’। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় বিভাজন এড়িয়ে চলা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলিম ইস্যু স্পষ্টভাবে সামনে চলে আসে।

মতুয়া ফ্যাক্টর

১৯শ শতকে পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত মতবাদভিত্তিক হিন্দু সামাজিক আন্দোলনের অংশ মতুয়া সম্প্রদায়কে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করে আসছিল এবং তারা পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন দ্বীপ হালদার।

তিনি বলেন, ‘মতুয়া সম্প্রদায় বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী তফসিলি জাতিগোষ্ঠী। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় (এসআইআর) উচ্চহারে নাম বাদ পড়ায় ধারণা করা হয়েছিল মতুয়া ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।’

যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ব্রিটিশ একাডেমি ইন্টারন্যাশনাল ফেলো অয়ন গুহ বলেন, ‘মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হলেও, তারা এবারও বিজেপিকেই বেছে নিয়েছে। এর পেছনে বাংলাদেশ পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রেখেছে।’

তার মতে, “হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের খবর মাতুয়াদের মধ্যে ‘হিন্দু শরণার্থী’ হিসেবে ভোট দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করেছে।” এই প্রবণতাকে ‘স্মৃতির রাজনীতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন অয়ন গুহ। তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশে মতুয়া-নমশূদ্রদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়নের স্মৃতিকে সামনে এনে তাদের সংগঠিত করার কৌশলই এখানে কাজ করেছে।’

এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া প্রধান এলাকাগুলোতে নিজের মাঠ পর্যায়ের পরিচিতদের কাছ থেকে অবাক করা তথ্য পেয়েছেন বলেও দাবি করেন অয়ন গুহ। বলেন, ‘মতুয়া সম্প্রদায়ের যাদের নিজেদের বা পরিবারের সদস্যদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তারাও বিজেপির পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন— এই আশায় যে দলটি তাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে।’

সামগ্রিকভাবে, বহুত্ববাদী সমাজ হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি অতীতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মোড় এনে দিয়েছে এবং বিজেপির জন্য ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করেছে বলে মনে করেন দ্য প্রিন্টের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর দ্বীপ হালদার।

রাজনীতি/আইআর

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশ যেভাবে ‘বড়’ ভূমিকা রেখেছে