এবার ইউক্রেনের ডিজিটাল অবকাঠামোয় রুশ হামলা, ব্যাহত ইন্টারনেট

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে এবার দেশটির ডিজিটাল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। চলতি সপ্তাহে রাজধানী কিয়েভের বেশ কয়েকটি ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব হামলার মাধ্যমে ইউক্রেনের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ও বৃহস্পতিবারের হামলার পর কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১ লাখ পরিবারের ইন্টারনেট সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এর আগে রাশিয়া ইউক্রেনের ডেটা সেন্টারগুলোতে হামলা চালালেও এত বড় পরিসরে হামলা এবারই প্রথম। গতকাল শুক্রবারও কিয়েভের কেন্দ্রীয় এলাকায় একটি ড্রোন হামলায় দেশটির অন্যতম বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ডেটাগ্রুপের কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন।
-ed9ce5.jpg)
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘রাশিয়া ইউক্রেনের বড় বড় ডেটা সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।’
এর আগে বৃহস্পতিবার পোল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশটির মধ্যাঞ্চলে ইউক্রেনকে সেবা দেওয়া একটি স্টারলিংক স্যাটেলাইট স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনের ইন্টারনেট অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলার অংশ হিসেবেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে ‘নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এর সঙ্গে মস্কোর যোগসূত্র থাকার কথা বলেছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পুরো দেশকে যোগাযোগের আওতায় রাখা ইউক্রেন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলেও মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা চালু রাখতে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উপায় খুঁজছে কর্তৃপক্ষ।
ইউক্রেনের ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক তুলনামূলকভাবে বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় কোনো একটি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে পুরো শহর বা বড় কোনো অঞ্চলের ইন্টারনেট সেবা দীর্ঘ সময় বন্ধ করে দেওয়া কঠিন।
তবে শীত ঘনিয়ে আসায় সরকারি কর্মকর্তা ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, রাশিয়া বারবার হামলা চালাতে থাকলে ইউক্রেনের ব্যাংক, অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা ও সরকারি সেবা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্কগুলোও ব্যাহত হতে পারে।
জনপ্রিয় ব্লগার ও সাবেক সরকারি উপদেষ্টা সেরহি স্তেরনেঙ্কো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘কিয়েভের বাসিন্দাদের ধীরে ধীরে শীতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার জন্য স্টারলিংক টার্মিনাল বা অন্য কোনো ব্যবস্থা সংগ্রহ করা যেতে পারে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘রাশিয়ানদের লক্ষ্য শুধু রাজধানীর জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো নয়; সব ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট অপারেটরকে ধ্বংস করাও তাদের লক্ষ্য।’
ইউক্রেনের অর্থনীতির ওপর রাশিয়ার হামলা জোরদারের মধ্যেই এসব আক্রমণ চালানো হলো। ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করে গুদাম, পেট্রল স্টেশন, বন্দর ও অন্যান্য বাণিজ্যিক অবকাঠামোতে হামলা চালানো হচ্ছে।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের কারণে এমনিতেই চাপে থাকা ইউক্রেনের অর্থনীতির ওপর এসব হামলা আরও চাপ তৈরি করছে। শুক্রবারের হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কিয়েভের বাইরে ফাস্টফুড চেইন ম্যাকডোনাল্ডসের ব্যবহৃত একটি গুদামও ছিল।
দেশটির ভারী শিল্পও রুশ হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলায় বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও ইস্পাত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প খাতের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি মাসে এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো ইউক্রেনে এক টনও ইস্পাত উৎপাদন হয়নি।
ইউক্রেন রাশিয়ার নতুন ধরনের দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোনের বাড়তে থাকা ঢেউ মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব ড্রোনের মধ্যে গেরান-৫-ও রয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও ইউক্রেনে আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।
শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন। এর ফলে ইউক্রেন নিজ দেশেই গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ পেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
এর আগে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান একাধিকবার বদলেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে।




















