সারা জীবন এখানে থাকতে চাইতাম— বিদায়বেলায় অশ্রুসিক্ত মেসি

ক্রীড় ডেস্ক
জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাস মেসির। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাস মেসির। ছবি: সংগৃহীত

একসময় মনে হয়েছিল, এই রাত যেন কোনোদিন না আসে। কিন্তু ফুটবলে বিদায়েরও একটা বাঁশি থাকে। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টালে সেই বাঁশিই বেজে উঠল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামলেন লিওনেল মেসি। শেষ ম্যাচ, শেষ গোল, শেষবারের মতো গ্যালারির লাখো কণ্ঠে তার নাম। আর বিদায়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বারবার আবেগে থমকে গেলেন ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি।

‘সারা জীবন এখানে থাকতে চাইতাম’— বিদায়ী বক্তব্যে মেসির এই একটি বাক্যই যেন পুরো রাতের অনুভূতিটাকে ধারণ করল।

‘আমার হাতে এখন শুধু এই জার্সির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ আছে। ২০ বছর ধরে, এমনকি সবচেয়ে কঠিন সময়েও আমি লড়াই থামাইনি। এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, সবকিছু দিয়েছি এবং এখানে থাকতে চেয়েছি,’— বলছিলেন মেসি।

কথা বলতে বলতে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। কারণ এটি আর দশটা ম্যাচের মতো ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়া ছিল না, ছিল আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে দুই দশকের সম্পর্কের শেষ অধ্যায়।

মেসির কণ্ঠে তাই আবেগের ঢল, ’আর এখানে না আসা, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে আর না থাকা— এটা খুব কষ্ট দেবে। যদি আমার ওপর নির্ভর করত, আমি সারা জীবন এখানে থাকতে চাইতাম। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর কিছু নেই।’

এই কথার পরই মেসি স্বীকার করলেন, তিনি সেদিন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছেন। কারণ শেষের এই মুহূর্তটি দীর্ঘায়িত করতে চাইছিলেন তিনি, ’আজ আমি সম্ভবত অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে বেশি কথা বলছি। কারণ আমি চাই না এই মুহূর্তটা শেষ হয়ে যাক।’

মনুমেন্টালে তখন হাজারও দর্শকের চোখে পানি। মাঠে নামার আগেই আবেগ সামলাতে পারেননি মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সি পরা বাস যখন সমর্থকদের জনসমুদ্র পেরিয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকছিল, জানালার পাশে বসে চোখ মুছতে দেখা যায় তাকে। মাঠে নামেন তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। গ্যালারিতে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচিত্তিনি। মাঠে রাখা হয়েছিল বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি, ১০ নম্বরের ওপর লেখা— ‘Gracias’, স্প্যানিশ যে শব্দটির অর্থ ধন্যবাদ।

স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের সামনে রাজার মতোই বিদায় নিলেন সময়ের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত
স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের সামনে রাজার মতোই বিদায় নিলেন সময়ের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংগীতের সময়ও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। পাশে ছিলেন ফকল্যান্ড যুদ্ধের সাবেক সেনাসদস্য ফাবিও সান্তানা। আর ম্যাচের ১০ মিনিটে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে মেসিকে অভিবাদন জানায়।

তারপরও মাঠে ছিলেন মেসি, যেভাবে দুই দশক ধরে ছিলেন। আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে তিন গোলেই অবদান তার। ম্যাচের শেষ গোলটি করেছেন পেনাল্টি থেকে, বাকি দুটিতে ছিল তার অবদান। দ্বিতীয় গোলটি করেন নিকো পাজ—মেসির পাস থেকেই। যেন এক প্রজন্মের কাছ থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার প্রতীকী মুহূর্ত।

বিদায়ী বক্তব্যে মেসি ফিরে যান তার দীর্ঘ পথচলার দিকেও। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই যাত্রা শুধু ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের গল্প নয়। বহু সতীর্থ তার সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়েছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, আবার ফিরে এসেছেন। তাদের তিনি বলেছেন ‘যোদ্ধা’, যারা মাঠে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন।

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনায় তার প্রত্যাবর্তনের রাতটিকে মেসি জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। আর বিদায়ের এই রাত? তার ভাষায়, সেটি জীবনের সবচেয়ে বিষণ্ন রাতগুলোর একটি।

কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় বাবা হোর্হের কথা, ‘এই মুহূর্তে আমার মাথায় প্রথম যে মানুষটির কথা আসছে, সে আমার বাবা।’

তারপরও বিদায়ের মধ্যে ছিল তৃপ্তি। যে স্বপ্ন নিয়ে ছোটবেলায় ফুটবল শুরু করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটি পূরণ হয়েছে। আর্জেন্টিনাকে ২০২১ কোপা আমেরিকা জিতিয়ে ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক শিরোপার খরা কাটিয়েছেন। এক বছর পর কাতারে বিশ্বকাপ জিতে শেষ করেছেন ৩৬ বছরের অপেক্ষা। এরপর ২০২৪ কোপা আমেরিকাও উঠেছে তার হাতে।

একসময় আর্জেন্টিনাকে ‘নতুন ম্যারাডোনা’ খুঁজতে হতো। মেসির বিদায়ের পর প্রশ্নটা বদলে গেছে— এখন তাদের খুঁজতে হবে ‘নতুন মেসি’। নিকো পাজদের সামনে সেই কঠিন দায়িত্বই রেখে গেলেন তিনি।

বিদায়ী ম্যাচেও গোল পেয়েছেন মেসি। সবাইকে জানালেন অভিবাদন। ছবি: সংগৃহীত
বিদায়ী ম্যাচেও গোল পেয়েছেন মেসি। সবাইকে জানালেন অভিবাদন। ছবি: সংগৃহীত

শেষ দিকে মেসি আবার সমর্থকদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি তোমাদের সবাইকে খুব মিস করব। তবে সবসময় তোমাদের পাশে থাকব। এই ছেলেদের এবং যারা তাদের পর আসবে, তাদের সমর্থন করব।’

তারপর আরও একটি বাক্য, যা হয়তো আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে তার শেষ জাতীয় দলের বার্তা হয়ে থাকবে, ‘আমি কৃতজ্ঞ, গর্বিত এবং শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি। আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত।’

মনুমেন্টালে তখন সব ফুটবলীয় পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে। পেলে-ম্যারাডোনার পর যার গায়ে ১০ নম্বর জার্সি পেয়েছে নতুন উচ্চতা, সেই মানুষটিই যে বিদায় নিয়েছেন। রেখে গেছেন বাঁ পায়ের জাদুকরী সব মুহূর্তের অসংখ্য স্মৃতি। বিদায়বেলায় বলে গেলেন, ফুটবল মাঠে ফুল ফোটানোর সেইসব মুহূর্তে দর্শকদের উল্লাস আর হর্ষধ্বনির স্মৃতি নিয়েই কাটিয়ে দেবেন বাকি জীবন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement