শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি, শেষ হলো দুই দশকের মহাআখ্যান

কখনো কখনো একটি ম্যাচের শেষ বাঁশি শুধু ৯০ মিনিটের সমাপ্তি ঘোষণা করে না, একটি যুগেরও সমাপ্তি টেনে দেয়। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি তেমনি যেন একটি যুগের অবসান ঘটাল। আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয় হয়েছে বেনিনের বিপক্ষে, কিন্তু রাতটির আসল ফলাফল কোনো স্কোরলাইন দিয়ে মাপা যাবে না। কারণ এই রাতে আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি।
এই জার্সি গায়েই ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু, দুই দশকের বেশি সময় পর সেই জার্সিই গায়ে শেষবারের মতো মাঠ ছাড়লেন ৩৯ বছরের মেসি। জাতীয় দলের হয়ে আর কখনো তাকে দেখা যাবে না— এই বাস্তবতাটাই যেন ৮৫ হাজার দর্শকের ভরা মনুমেন্টালকে একসঙ্গে আনন্দ আর বিষাদের শহরে পরিণত করেছিল।
বিদায়ের দিনটাও যেন মেসিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ আবেগের চিত্রনাট্য।
স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর আগেই চোখের পানি সামলাতে পারেননি মেসি। ইজেইজা থেকে মনুমেন্টালের পথে আর্জেন্টিনা দলের বাস ঘিরে ছিল সমর্থকদের ঢল। কেউ পতাকা হাতে, কেউ মেসির নাম লেখা জার্সি পরে, কেউ শুধু শেষবারের মতো তাকে দেখার অপেক্ষায়। বাসের ভেতর থেকেও মেসিকে দেখা যায় চোখ মুছতে।
তারপর স্টেডিয়ামে ঢোকার মুহূর্ত। মাঠে মেলে ধরা হলো বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি— পেছনে ১০ নম্বর, নামের জায়গায় শুধু একটি শব্দ— ‘Gracias’, স্প্যানিশ যে শব্দটির অর্থ ধন্যবাদ। যেন একটি দেশের পক্ষ থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় ফুটবলারকে বলা শেষ কথাটি।
জাতীয় সংগীতের সময় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি মেসি। তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোর পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ঝরেছে তার। কেঁদেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনিও। মেসির বিদায় যে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়, সেটি তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়।
ম্যাচ শুরুর ১০ মিনিট পর থেমে যায় খেলা। ১০ নম্বরের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রেফারি খেলা থামান। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে মেসির নাম ধরে চিৎকার করতে থাকেন। আতশবাজি, করতালি, স্লোগান— কয়েক মিনিটের জন্য ফুটবল যেন থেমে গিয়ে শুধু মেসিকে দেখেছে। বেনিনের খেলোয়াড়রাও এগিয়ে এসে তাকে শুভেচ্ছা জানান।
তারপর অবশ্য বল গড়িয়েছে। কিন্তু সেটিও ছিল মেসির গল্পের মতোই— শেষটাও এলো তার পায়ের ছোঁয়ায়।
প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মেসির কর্নার থেকে গোল করেন তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী নিকোলাস ওটামেন্ডি। বিদায়ী ম্যাচে বিদায় নেওয়া আরেক আর্জেন্টাইন তারকার সঙ্গে মেসির সেই গোল উদযাপনও ছিল আলাদা আবেগের। এরপর এলো আরও প্রতীকী এক মুহূর্ত।
ম্যাচের ৬১ মিনিটে মেসির পাস থেকে নিকো পাজের গোল। ২২ বছর বয়সী পাজের বাঁ পায়ের সেই শট ছিল যেন মেসিরই কোনো পুরোনো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি— বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জায়গা তৈরি করা, তারপর নিখুঁতভাবে জালে পাঠানো। আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ ১০ নম্বর হিসেবে যার নাম এরই মধ্যে উচ্চারিত হচ্ছে, সেই তরুণের পায়ে গোল এনে দিলেন বিদায়ী ১০ নম্বর নিজেই।
ফুটবলে প্রতীক খুঁজতে হয় না, কখনো কখনো প্রতীক নিজেই সামনে এসে দাঁড়ায়। মেসির শেষ ম্যাচে তার অ্যাসিস্টে নিকো পাজের গোল— আর্জেন্টিনার এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দায়িত্ব হস্তান্তরের দৃশ্য হিসেবে এর চেয়ে সুন্দর সমাপ্তি আর কী হতে পারত!
আর তারপর এলো শেষ গোলটি। সেটিও মেসির পা থেকেই।
ম্যাচের ৭১ মিনিটে বেনিনের ডি-বক্সে ফাউল। পেনাল্টি। মেসি বল হাতে নিলেন। যে পেনাল্টি একসময় তার জন্য যন্ত্রণার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, শেষ ম্যাচে সেই জায়গা থেকেই এলো বিদায়ের শেষ গোল। গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠিয়ে বল জালে পাঠালেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১২৬-এ। শেষ ম্যাচেও তিনি গোল করলেন, আর তিনটি গোলের প্রতিটিতেই সরাসরি অবদান রাখলেন— প্রথম দুটিতে অ্যাসিস্ট, শেষটিতে গোল।
এরপর আর কিছু পাওয়ার ছিল না।
মেসি আগেই বলে দিয়েছিলেন, তিনি ‘শান্তিতে’ বিদায় নিচ্ছেন। কারণ তিনি সবকিছু দিয়ে গেছেন। সত্যিই তো, আর্জেন্টিনার হয়ে তার গল্পটি শুধু গোল আর ট্রফির গল্প নয়। এটি ছিল প্রত্যাখ্যান, সমালোচনা, হার, কান্না, অবসর ঘোষণা, ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত পরম আরাধ্য হয়ে ওঠার গল্প।
একসময় আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একাংশের কাছে মেসি ছিলেন প্রশ্নের নাম। কেন ক্লাবের মেসি জাতীয় দলের মেসি নন? কেন তিনি দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো হতে পারেন না? কেন এত প্রতিভা নিয়েও দেশের হয়ে শিরোপা এনে দিতে পারছেন না?
ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনা বছরের পর বছর নতুন ‘ম্যারাডোনা’ খুঁজেছে। একজন নয়, বহু প্রজন্মের ফুটবলারের ওপর সেই তুলনার বোঝা চাপানো হয়েছে। কিন্তু মেসি সেই অপেক্ষাটাই বদলে দিয়েছেন।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জিতে তিনি আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক শিরোপা-খরা শেষ করেন। এক বছর পর কাতারে বিশ্বকাপ জিতে শেষ করেন ৩৬ বছরের অপেক্ষা। এরপর ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা। সঙ্গে ফাইনালিসিমা।
যে ছেলে একসময় ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হওয়ার ভারে হাঁটতেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠলেন এমন এক মানদণ্ড, যার সঙ্গে পরের প্রজন্মের তুলনা হবে।
এখন আর্জেন্টিনায় আর কেউ নতুন ম্যারাডোনা খোঁজে না। তারা খোঁজে নতুন মেসি।
আর সেই নতুন মেসিকে খোঁজার প্রথম সারিতে থাকা নিকো পাজই যেন মঙ্গলবার রাতে সেই দায়িত্বের প্রতীকী স্বীকৃতি পেলেন— মেসির শেষ ম্যাচে, মেসির পাস থেকে, মেসির সামনে দাঁড়িয়ে।
দুই দশকের বেশি সময় আগে যে গল্প শুরু হয়েছিল, তার শেষ দৃশ্য তাই শুধু একজন কিংবদন্তির বিদায় নয়। এটি এক মহাআখ্যানের শেষ অধ্যায় এবং একই সঙ্গে নতুন একটি গল্পের প্রথম পৃষ্ঠা।
মনুমেন্টালের ৮৫ হাজার মানুষ সেদিন শুধু একজন ফুটবলারকে বিদায় জানায়নি। তারা বিদায় জানিয়েছে নিজেদের জীবনের একটি সময়কে, যে সময়ে মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার জার্সির ১০ নম্বর, অধিনায়ক, স্বপ্ন, হতাশা, আনন্দ, কান্না এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তির নাম।
শেষ বাঁশি বাজার পর মেসি আর আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে ফিরবেন না। কিন্তু ১০ নম্বরটি থেকে যাবে।
স্মৃতিতে, গানে, পতাকায়— আর সবচেয়ে বেশি, সেই তরুণদের পায়ে যারা এখন থেকে স্বপ্ন দেখবে, একদিন তারা ‘নতুন মেসি’ হবে।











-837ed9-256x144.webp)



