জনসমুদ্রে আবেগঘন বিদায়, মেসি বললেন— সবাইকে ভালোবাসি

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে জার্সি ছিল তার পরিচয়, যে ১০ নম্বরকে ঘিরে আর্জেন্টিনার কোটি মানুষের স্বপ্ন-আবেগ, সেটি শেষবারের মতো গায়ে তুললেন লিওনেল মেসি। মনুমেন্টালের ৮৫ হাজার দর্শকের জনসমুদ্রে চোখের পানি, করতালি আর ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে শেষ হলো আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির মহাআখ্যান।
বিদায়ী ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু রাতের সবচেয়ে বড় ঘটনা জয় নয়— জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ। সেখানেও আবেগী মেসি। স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন— সবাইকে ভালোবাসি। সবাইকে মিস করবেন আজীবন।
বিদায়ী বক্তৃতায় মেসি বলেন, আমি যেতে চাই না। এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। শুধু আপনাদের একটা কথা বলতে চাই, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আপনাদের ভীষণ মিস করব।
একজন আর্জেন্টাইন হওয়ার জন্য তিনি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিদায়ের আগে থেকেই আবেগে ভাসছিল বুয়েনস এইরেস। আর্জেন্টিনা দলের বাস যখন সমর্থকদের ভিড় ঠেলে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছিল, জানালা দিয়ে তাকিয়ে চোখ মুছতে দেখা যায় মেসিকে। মাঠে প্রবেশের সময় তার সঙ্গে ছিল তিন সন্তান। গ্যালারিতে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচিত্তিনি। মাঠে মেলে ধরা হয় বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি—১০ নম্বরের ওপরে লেখা ‘Gracias’, অর্থাৎ ধন্যবাদ।
জাতীয় সংগীতের সময়ও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেসি। ফকল্যান্ডস যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক সেনাসদস্য ফাবিও সান্তানা তার পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় সেই আবেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মেসির শেষ ম্যাচটি যে শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, তা তখনই স্পষ্ট।
খেলা শুরুর ১০ মিনিট পর থামানো হয় ম্যাচ। মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানায় পুরো স্টেডিয়াম। হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মেসির নাম। যে মানুষটি একসময় আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা জিততে না পারার জন্য সমালোচিত হয়েছেন, সেই মানুষটিই বিদায়ের রাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন একটি জাতির ভালোবাসার কেন্দ্রে।

এরপর ম্যাচটি নিজের মতো করে লিখেছেন মেসি।
প্রথম গোলটি আসে তার অ্যাসিস্টে নিকোলাস ওটামেন্ডির পা থেকে। দ্বিতীয় গোলটিও তার পাস থেকে— এবার গোল করেন নিকো পাজ। ২২ বছর বয়সী পাজকে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ তারকাদের একজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেসির পাস থেকে তার গোলটি তাই শুধু ম্যাচের দ্বিতীয় গোল নয়, যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রতীকীভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের মুহূর্ত।
পাজের গোলের ধরনেও ছিল মেসির ছায়া— বল পায়ে জায়গা তৈরি করে বাঁ পায়ের শটে জালে পাঠানো। বিদায়ী ১০ নম্বর যখন নিজের শেষ ম্যাচে সম্ভাব্য উত্তরসূরির পায়ে গোল এনে দেন, দৃশ্যটি তাই আলাদা অর্থ পায়। মেসির যুগ শেষ হচ্ছে, কিন্তু আর্জেন্টিনার গল্প থামছে না।
শেষে নিজের বিদায়ী ম্যাচে গোলও করলেন মেসি। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে বল জালে পাঠিয়ে জাতীয় দলের হয়ে ১২৬তম গোল পূর্ণ করেন তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮তম ম্যাচে তার শেষ উপস্থিতিও শেষ হলো তার স্বভাবসিদ্ধ ছাপ রেখে— দুই অ্যাসিস্ট, এক গোল।
শেষ বাঁশির পর অবশ্য আরেকটি অধ্যায় বাকি ছিল। আকাশে ড্রোন শো। রাতের আকাশে ভেসে উঠল মেসির ছবি, সঙ্গে তার ফুটবলজীবনের জন্য কৃতজ্ঞতা। মাঠের মানুষ তখন আর ম্যাচ দেখছিল না, তারা বিদায় জানাচ্ছিল নিজেদের জীবনের একটি সময়কে, নিজেদের সময়ের সবচেয়ে বড় তারকাকে।
বিদায়ী ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় মেসিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করে। অতীতে পড়ালেখা আরও চালিয়ে যেতে না পারার জন্য আক্ষেপের কথা বলা মেসি এই সম্মান পেয়ে গর্ব প্রকাশ করেন।
হালকা রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘আমি এখন নিজেকে সম্মানসূচক ডাক্তার বলতে পারব!’
এই বিদায় এসেছে এমন এক ক্যারিয়ারের শেষে, যার শুরুটা ছিল প্রশ্ন আর তুলনায় ভরা। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মেসির আবির্ভাব। দীর্ঘ সময় তাকে শুনতে হয়েছে— ম্যারাডোনার মতো কি হতে পারবেন? জাতীয় দলকে কি শিরোপা এনে দিতে পারবেন?
শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর মেসিই দিয়েছেন।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক শিরোপা-খরা কাটান তিনি। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জিতে শেষ করেন ৩৬ বছরের অপেক্ষা। এরপর ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে শুরু করা মেসিই শেষ পর্যন্ত নিজস্ব একটি যুগ তৈরি করেছেন।
এখন আর্জেন্টিনায় আর নতুন ম্যারাডোনা খোঁজা হয় না। খোঁজা হয় নতুন মেসি।
আর সেই নতুন মেসিদের একজনের পায়ে নিজের শেষ ম্যাচে গোল তুলে দিয়ে গেলেন মেসি নিজেই।
বিদায়ের আগে মেসি বলেছিলেন, তিনি সবটুকু দিয়ে দিয়েছেন। এখন তরুণদের সুযোগ পাওয়ার সময়। সত্যিই, তার দেওয়ার আর কিছু বাকি নেই। একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা, অসংখ্য গোল, রেকর্ড আর ট্রফির বাইরে তিনি আর্জেন্টিনাকে দিয়ে গেছেন আরও বড় কিছু—একটি প্রজন্মের ফুটবল-পরিচয়।
ম্যাচ শেষে যখন মেসি শেষবারের মতো মনুমেন্তালের দর্শকদের দিকে তাকালেন, তখন তার সামনে ছিল একটি পূর্ণ হয়ে যাওয়া গল্প। আর গ্যালারিতে ছিল অশ্রুসিক্ত হাজার হাজার মুখ।
জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাকে। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবলে মেসির গল্প শেষ হওয়ার নয়।
শেষে রয়ে গেল ভালোবাসাটাই।
যে ভালোবাসার জবাবে মেসিও বিদায়ের রাতে বলে গেলেন— সবাইকে ভালোবাসি।
বছরের পর বছর ধরে মেসির সঙ্গে হেসেছেন কোটি আর্জেন্টাইন, কান্নায় ভেসেছেন মেসির অশ্রুধারায়। কিন্তু ফুটবল মাঠে মেসির পায়ে বল মানেই যেন ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রদর্শনী, যা আনন্দে ভাসিয়েছে আর্জেন্টিনাসহ গোটা বিশ্বকে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বাইরে মেসির ছবিসহ সমর্থকদের বিশাল আর্জেন্টাইন পতাকাতেও মিলল তারই প্রমাণ, যেখানে লেখা ছিল— ‘আমার জীবনের আনন্দ।’













-837ed9-256x144.webp)
-3a49ad-256x144.webp)


