
স ম গোলাম কিবরিয়া

৭ মার্চের ঠিক আগের দিন আজ। এ দিন ঘিরে সারা দেশে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা বিরাজ করছে। উৎকণ্ঠা পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসনেও। সেনাবাহিনীর মধ্যেও ইয়াহিয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বাঙালি সৈন্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করবে না বলে পাকিস্তানি জেনারেলরা মনে করছে। এ কারণে সব পরিকল্পনা থেকেই জেনারেলরা বাঙালি অফিসার-সৈনিকদের দূরে রাখছে।
উদ্বেগের উত্তাপের আঁচ পড়েছে বিশ্ব রাজনীতিতেও। আশেপাশের মুক্তিকামী অসংখ্য জনতা ঢাকায় আসতে শুরু করে।
১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদে ঢাকায় ২ ও ৩ মার্চ দুই দিনের সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেন। তিনি ঘোষণা দেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আন্দোলনের পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
২ ও ৩ মার্চের হরতাল বেড়ে লাগাতার পাঁচ দিন ধরে চলছে। এর মধ্যে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করেছে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এসব কর্মসূচিতে বঙ্গবন্ধু সমর্থন জানিয়েছেন।
স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই। এই ইশতেহারে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে এর সীমানা ও জাতীয় সংগীত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের শত্রু, তাদের খতম করাতে হবে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিবাহিনী গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয় স্বাধীনতার ইশতেহারে।
ওদিকে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা থেকে বাঙালিদের দূরে রাখতে নানা ষড়যন্ত্র করছে। গোপনে পাকিস্তান থেকে সামরিক বাহিনীকে ঢাকায় নিয়ে আসছে। ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর ষড়যন্ত্র রুখে দিতে বাঙালি রাজপথ দখল করে নিয়েছে।
লাগাতার হরতালে স্বতঃস্ফূর্ত জনতা স্লোগান তুলেছে— বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার দেশ আমার দেশ/ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তুমি কে আমি কে/ বাঙালি বাঙালি। জয়বাংলা জয়বাংলা স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে সারা বাংলা।
জনতার আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী, সরকারের পেটোয়া বাহিনী আর বিহারীরা আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে হত্যা করছে। প্রতিদিনই রাজপথে শহীদের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। ইয়াহিয়া বাঙালিদের যতই হত্যা করছে, জনতার বিক্ষোভ মিছিল ততই দীর্ঘ হচ্ছে। তাই ৭ মার্চের জনসভাকে কেন্দ্র করে চারদিকে টান টান উত্তেজনাও বাড়ছে।
পূর্ব বাংলার এ পরিস্থিতি শুধু পাকিস্তানের রাজনীতি আর ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে মার্কিনিদের অবস্থান কী হবে, সে বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তায় রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন। ঊনসত্তরের পর থেকেই পূর্ব বাংলার রাজনীতির প্রতি তাদের বিশেষ মনোযোগ। সত্তরের নির্বাচন ঘিরে পূর্ব বাংলার বেসামরিক প্রশাসন শেখ মুজিবের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে মার্কিন গোপন দলিলে উঠে এসেছে।
শেখ মুজিব ফেব্রুয়ারিতেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। যদি তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তাহলে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা জানতে ঢাকার কনসাল জেনারেলের কাছে জানতে চান। স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু মার্কিন প্রশাসনের কাছে ১০০ মিলিয়ন ডলারে সাহায্যও চান। এসব তথ্যও উঠে এসেছে আবুক্ত হওয়া মার্কিন গোপন দলিলে।
শেখ মুজিব ৭ মার্চের ভাষণে কী বলতে যাচ্ছেন, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওয়াশিংটনের। ভাষণে কী বলতে পারেন আর সে কারণে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াতে পারে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে ৬ মার্চ নিক্সন প্রশাসনের সিনিয়র রিভিউ গ্রুপের বৈঠক বসে ওয়াশিংটনে। কিসিঞ্জারের সভাপতিত্বে সকাল ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত বৈঠক চলে।
হোয়াইট হাউজের পারিষদবর্গ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন— মার্কিন প্রেসিডেন্টর বিশেষ সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার, স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যালেক্স জনসন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডেভল ব্রেট, সিআইএর রিচার্ড হেলমস, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের ভাইস অ্যাডমিরাল জন ওয়েনেল, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কর্নেল রিচার্ড কেনেডি।
বৈঠকে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি, পূর্ব বাংলায় তাদের অবস্থান সংখ্যা ও ইয়াহিয়া বল প্রয়োগ করলে বাঙালিরা নিরব আত্মসমর্পণ করবে নাকি বিদ্রোহ করবে— এসব বিষয়েও বিশ্লেষণ করা হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে সমর্থনের ভূমিকায় নামবে না। পরিস্থিতি দেখে সমর্থন দেওয়া হবে।
তবে এর আগেই ব্রিটিশদের সঙ্গে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মার্কিন স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় এ ভাষণ শুনতে পারবে এবং তারপর বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
এদিকে এ দিনও হরতাল-অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল পুরো দেশ। ঢাকায় পঞ্চম দিনের মতো হরতাল পালনকালে সর্বস্তরের জনতা রাস্তায় নেমে আসে। শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শেষে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা থাকে। যেসব বেসরকারি অফিসে বেতন দেওয়া হয়নি, তাদের সুবিধার জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়।
এ দিনও ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীতে সামরিক বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। খুলনায় অনেক লোক হতাহত হয়। সকাল ১১টার দিকে সেন্ট্রাল জেলের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদি পালিয়ে যান। এ সময় পুলিশের গুলিতে সাতজন কয়েদি নিহত ও ৩০ জন আহত হন। জেল থেকে বের হয়ে তারা রাস্তায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়।
দুপুরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকেন। সেনাবাহিনী তার নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা মনে করিয়ে দেন এই ভাষণে। ১০ মার্চ ঢাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠক না হওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়।
ভাষণে ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রয়েছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছি, ততদিন পর্যন্ত আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করব।’
এ ভাষণের পরই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটি এক যুক্ত জরুরি বৈঠক বসে। রুদ্ধদ্বার এ বৈঠক কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। বৈঠকে প্রেসিডেন্টের ভাষণ ও দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের পরপরই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অনেক এলাকায় জনতা প্রতিবাদ জানায়। রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্টের ভাষণকে স্বাগত জানান। ভাষণ-পরবর্তী এক সাংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো জানান, তার দল ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনের আগেই আলোচনার মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের মোটামুটি একটি কাঠামো স্থির করতে চায়।
লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল নূর খান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তারের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে। প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণে পরিস্থিতি অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর দোষারোপ করায় নূর খান দুঃখ প্রকাশ করেন।
পেশোয়ারে পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রধান খান আবদুল কাইয়ুম খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানান। পিডিপি প্রধান নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ দৌলতানাও ইয়াহিয়া খানের ঘোষণাকে স্বাগত জানান।
এ দিন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করেন।
ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতারা এক বিবৃতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাংলাদেশের সব বেতার কেন্দ্র থেকে সরাসরি সম্প্রচারের দাবি জানান। ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে তখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় গোটা দেশ।

তথ্যসূত্র

৭ মার্চের ঠিক আগের দিন আজ। এ দিন ঘিরে সারা দেশে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা বিরাজ করছে। উৎকণ্ঠা পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসনেও। সেনাবাহিনীর মধ্যেও ইয়াহিয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বাঙালি সৈন্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করবে না বলে পাকিস্তানি জেনারেলরা মনে করছে। এ কারণে সব পরিকল্পনা থেকেই জেনারেলরা বাঙালি অফিসার-সৈনিকদের দূরে রাখছে।
উদ্বেগের উত্তাপের আঁচ পড়েছে বিশ্ব রাজনীতিতেও। আশেপাশের মুক্তিকামী অসংখ্য জনতা ঢাকায় আসতে শুরু করে।
১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদে ঢাকায় ২ ও ৩ মার্চ দুই দিনের সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেন। তিনি ঘোষণা দেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আন্দোলনের পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
২ ও ৩ মার্চের হরতাল বেড়ে লাগাতার পাঁচ দিন ধরে চলছে। এর মধ্যে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করেছে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এসব কর্মসূচিতে বঙ্গবন্ধু সমর্থন জানিয়েছেন।
স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই। এই ইশতেহারে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে এর সীমানা ও জাতীয় সংগীত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের শত্রু, তাদের খতম করাতে হবে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিবাহিনী গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয় স্বাধীনতার ইশতেহারে।
ওদিকে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা থেকে বাঙালিদের দূরে রাখতে নানা ষড়যন্ত্র করছে। গোপনে পাকিস্তান থেকে সামরিক বাহিনীকে ঢাকায় নিয়ে আসছে। ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর ষড়যন্ত্র রুখে দিতে বাঙালি রাজপথ দখল করে নিয়েছে।
লাগাতার হরতালে স্বতঃস্ফূর্ত জনতা স্লোগান তুলেছে— বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার দেশ আমার দেশ/ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তুমি কে আমি কে/ বাঙালি বাঙালি। জয়বাংলা জয়বাংলা স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে সারা বাংলা।
জনতার আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী, সরকারের পেটোয়া বাহিনী আর বিহারীরা আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে হত্যা করছে। প্রতিদিনই রাজপথে শহীদের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। ইয়াহিয়া বাঙালিদের যতই হত্যা করছে, জনতার বিক্ষোভ মিছিল ততই দীর্ঘ হচ্ছে। তাই ৭ মার্চের জনসভাকে কেন্দ্র করে চারদিকে টান টান উত্তেজনাও বাড়ছে।
পূর্ব বাংলার এ পরিস্থিতি শুধু পাকিস্তানের রাজনীতি আর ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে মার্কিনিদের অবস্থান কী হবে, সে বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তায় রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন। ঊনসত্তরের পর থেকেই পূর্ব বাংলার রাজনীতির প্রতি তাদের বিশেষ মনোযোগ। সত্তরের নির্বাচন ঘিরে পূর্ব বাংলার বেসামরিক প্রশাসন শেখ মুজিবের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে মার্কিন গোপন দলিলে উঠে এসেছে।
শেখ মুজিব ফেব্রুয়ারিতেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। যদি তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তাহলে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা জানতে ঢাকার কনসাল জেনারেলের কাছে জানতে চান। স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু মার্কিন প্রশাসনের কাছে ১০০ মিলিয়ন ডলারে সাহায্যও চান। এসব তথ্যও উঠে এসেছে আবুক্ত হওয়া মার্কিন গোপন দলিলে।
শেখ মুজিব ৭ মার্চের ভাষণে কী বলতে যাচ্ছেন, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওয়াশিংটনের। ভাষণে কী বলতে পারেন আর সে কারণে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াতে পারে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে ৬ মার্চ নিক্সন প্রশাসনের সিনিয়র রিভিউ গ্রুপের বৈঠক বসে ওয়াশিংটনে। কিসিঞ্জারের সভাপতিত্বে সকাল ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত বৈঠক চলে।
হোয়াইট হাউজের পারিষদবর্গ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন— মার্কিন প্রেসিডেন্টর বিশেষ সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার, স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যালেক্স জনসন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডেভল ব্রেট, সিআইএর রিচার্ড হেলমস, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের ভাইস অ্যাডমিরাল জন ওয়েনেল, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কর্নেল রিচার্ড কেনেডি।
বৈঠকে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি, পূর্ব বাংলায় তাদের অবস্থান সংখ্যা ও ইয়াহিয়া বল প্রয়োগ করলে বাঙালিরা নিরব আত্মসমর্পণ করবে নাকি বিদ্রোহ করবে— এসব বিষয়েও বিশ্লেষণ করা হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে সমর্থনের ভূমিকায় নামবে না। পরিস্থিতি দেখে সমর্থন দেওয়া হবে।
তবে এর আগেই ব্রিটিশদের সঙ্গে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মার্কিন স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় এ ভাষণ শুনতে পারবে এবং তারপর বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
এদিকে এ দিনও হরতাল-অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল পুরো দেশ। ঢাকায় পঞ্চম দিনের মতো হরতাল পালনকালে সর্বস্তরের জনতা রাস্তায় নেমে আসে। শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শেষে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা থাকে। যেসব বেসরকারি অফিসে বেতন দেওয়া হয়নি, তাদের সুবিধার জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়।
এ দিনও ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীতে সামরিক বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। খুলনায় অনেক লোক হতাহত হয়। সকাল ১১টার দিকে সেন্ট্রাল জেলের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদি পালিয়ে যান। এ সময় পুলিশের গুলিতে সাতজন কয়েদি নিহত ও ৩০ জন আহত হন। জেল থেকে বের হয়ে তারা রাস্তায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়।
দুপুরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকেন। সেনাবাহিনী তার নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা মনে করিয়ে দেন এই ভাষণে। ১০ মার্চ ঢাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠক না হওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়।
ভাষণে ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রয়েছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছি, ততদিন পর্যন্ত আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করব।’
এ ভাষণের পরই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটি এক যুক্ত জরুরি বৈঠক বসে। রুদ্ধদ্বার এ বৈঠক কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। বৈঠকে প্রেসিডেন্টের ভাষণ ও দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের পরপরই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অনেক এলাকায় জনতা প্রতিবাদ জানায়। রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্টের ভাষণকে স্বাগত জানান। ভাষণ-পরবর্তী এক সাংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো জানান, তার দল ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনের আগেই আলোচনার মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের মোটামুটি একটি কাঠামো স্থির করতে চায়।
লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল নূর খান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তারের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে। প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণে পরিস্থিতি অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর দোষারোপ করায় নূর খান দুঃখ প্রকাশ করেন।
পেশোয়ারে পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রধান খান আবদুল কাইয়ুম খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানান। পিডিপি প্রধান নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ দৌলতানাও ইয়াহিয়া খানের ঘোষণাকে স্বাগত জানান।
এ দিন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করেন।
ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতারা এক বিবৃতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাংলাদেশের সব বেতার কেন্দ্র থেকে সরাসরি সম্প্রচারের দাবি জানান। ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে তখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় গোটা দেশ।

তথ্যসূত্র

সেরা চলচ্চিত্রসহ চারটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে ‘সাঁতাও’, সেরা অভিনেতাসহ সাতটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে ‘সুড়ঙ্গ’। সেরা কাহিনীকার, গীতিকার, সুরকারসহ পাঁচ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে ‘প্রিয়তমা’।
৩০ জানুয়ারি ২০২৬
বলিউডের সিনেমার প্লেব্যাকে পুরুষ কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে তিনিই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয়, সফলও। এ নিয়ে খুব বেশি তর্কের অবকাশ নেই। বয়সও এখনো ৪০-এর কোটায় পৌঁছেনি। এমন সাফল্যে টইটুম্বুর অবস্থাতেই প্লেব্যাক তথা সিনেমার গানকে ‘না’ করে দিলেন অরিজিৎ সিং। অর্থাৎ এখন থেকে আর সিনেমার জন্য গান গাইবেন না তিনি
২৮ জানুয়ারি ২০২৬
জয়শ্রীর জন্ম কলকাতায়, ১৯৫২ সালে। ১৯৬৮ সালে ‘মিস ক্যালকাটা’ খেতাব লাভ করেন তিনি। বড় পর্দায় তার অভিষেক সত্যজিৎ রায়ের সাড়া জাগানো ‘কলকাতা ট্রিলজি’র প্রথম চলচ্চিত্র ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র মাধ্যমে। উত্তমকুমারের সঙ্গে তার অভিনীত চলচ্চিত্র ‘অসাধারণ’ মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে।
১৬ জানুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর তারকা সমৃদ্ধ অনুষ্ঠান থেকে ঘোষণা করা হয়েছে বছরের সেরা বিজয়ীদের নাম। রোববার (১১ জানুয়ারি) ক্যালিফোর্নিয়ার বেভারলি হিলটন হোটেলে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
১২ জানুয়ারি ২০২৬