বিচিত্র

লাশের সঙ্গে বিয়ে!

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
লাসের সঙ্গে বিয়ে!

বিয়ে সাধারণত জীবিত দুই মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি ও সামাজিক স্বীকৃতির বন্ধন। কিন্তু পৃথিবীর কিছু জায়গায় এমন কিছু প্রথা বা নিয়ম আছে, যা আমাদের পরিচিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। তেমনই এক ব্যতিক্রমী রীতি হলো মরণোত্তর বিয়ে—যেখানে জীবিত ব্যক্তি তাঁর প্রয়াত প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। এধরনের বিয়ের বৈধতা রয়েছে আধুনিক ও উদার সমাজব্যবস্থার দেশ ফ্রান্সে। প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় ৫০টি মরণোত্তর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

মরণোত্তর বিয়ের ধারণা ফ্রান্সে একেবারে নতুন নয়। এর শিকড় রয়েছে প্রায় একশো বছর আগের সময়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু সৈনিক যুদ্ধে নিহত হন। সেইসব সৈনিকের সঙ্গিনীরা, যাঁরা তাঁদের সঙ্গে বিয়ের স্বপ্ন দেখতেন, তাঁরা চাইতেন তাঁদের ভালোবাসা যেন শুধু স্মৃতিতে নয়, আইনের চোখেও স্বীকৃতি পায়। এই দাবির ভিত্তিতে শুরু হয় মরণোত্তর বিয়ের আইনি স্বীকৃতির প্রচেষ্টা।

১৯৫৯ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সে একটি বড় ধরনের বন্যা হয়। সেই বন্যায় প্রাণ হারান বহু মানুষ। এরই মধ্যে ইরিন জোডার নামের এক নারী তাঁর প্রয়াত প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ের আবেদন করেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল (Charles de Gaulle) তাঁর আবেদনকে গুরুত্ব দিয়ে এই বিয়েতে অনুমোদন দেন। সেই থেকেই ফ্রান্সে মরণোত্তর বিয়ে আইনি স্বীকৃতি লাভ করে।

মরণোত্তর বিয়ে করতে হলে পাড়ি দিতে হয় বেশ কিছু কঠিন ধাপ। প্রথমেই আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনি ও মৃত ব্যক্তি একটি প্রকৃত ও আন্তরিক সম্পর্কের মধ্যে ছিলেন এবং বিয়ের পরিকল্পনাও করেছিলেন। এরপর মৃত ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হয়। সবশেষে এই আবেদনটি জমা দিতে হয় সরাসরি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের কাছে। প্রেসিডেন্ট অনুমোদন দিলে তখনই বিয়েটি আইনি স্বীকৃতি পায় এবং বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। তবে এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে হয়।

এটা শুধু একটি আইনি পদক্ষেপ নয়—এটা ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি ও আবেগের এক নিখাদ বহিঃপ্রকাশ। অনেক সময় সঙ্গীর মৃত্যু ঘটে হঠাৎ করে, যখন তারা বিয়ের প্রস্তুতির মাঝপথে থাকে। কেউ কেউ আবার বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েও যেতে পারেন পৃথিবী ছেড়ে। তখন সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে, সম্পর্কের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতেই অনেকেই এই রীতির আশ্রয় নেন।

এই বিয়ের মাধ্যমে জীবিত ব্যক্তি মানসিকভাবে কিছুটা শান্তি পান। শোকের ভার হালকা হয়, সম্পর্কের সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়। পাশাপাশি, এতে কিছু আইনি সুবিধাও মেলে—যেমন প্রয়াত ব্যক্তির সম্পত্তির ওপর আংশিক অধিকার, উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু পাওয়ার সুযোগ ইত্যাদি।

যদিও ফ্রান্সে মরণোত্তর বিয়েকে ভালোবাসা ও সম্মানের নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়, তবে এর বিরুদ্ধে মতও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটা জীবনের স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম এবং অনেকের কাছে তা অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়। বিশেষ করে, মৃত ব্যক্তির সম্মতি যে কখনোই সরাসরি নেওয়া সম্ভব নয়—এই প্রশ্ন অনেকের মাথায় আসে। তবে ফ্রান্সের আইনি কাঠামো এটিকে যথেষ্ট বিবেচনার মধ্য দিয়ে অনুমোদন দেয়, যাতে কোনো রকম অসামঞ্জস্য না ঘটে।

শেষ পর্যন্ত, মরণোত্তর বিয়ে আমাদের দেখিয়ে দেয় ভালোবাসা কেবল জীবিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সম্পর্ক, প্রতিশ্রুতি এবং অনুভূতির মূল্য কখনো কখনো মৃত্যুরও ঊর্ধ্বে উঠে যায়। ফ্রান্সের এই অনন্য প্রথা প্রমাণ করে, ভালোবাসা যদি যথার্থ হয়, তবে তা সময়, সমাজ ও মৃত্যু—সবকিছুকেই অতিক্রম করতে পারে।

সূত্র: বিবিসি, ফ্রেঞ্চ সিভিল কোড

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

অস্কারে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদারে’র বাজিমাত, কারা পেলেন কোন পুরস্কার

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস বা অস্কারের আসর জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১৫ মার্চ) এ অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান তারকা ও সিনেমাপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল পুরো ভেন্যু।

৫ দিন আগে

ঈদে আসছে নতুন নাটক ‘বোবা কান্না’

নাটকের কাহিনীতে দেখা যাবে, জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ কীভাবে নিজের অনুভূতিগুলো চেপে রাখে এবং সেই নীরব কষ্ট একসময় গভীর বেদনায় রূপ নেয়। ভালোবাসা, ভুল বোঝাবুঝি, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে নাটকের গল্প।

৬ দিন আগে

৯৮তম অস্কারে সেরা অভিনেত্রী জেসি বাকলি

আইরিশ এই অভিনেত্রীর আজকের এই রাজকীয় পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। বিবিসি ওয়ানের একটি ট্যালেন্ট শো ‘আই’ড ডু অ্যানিথিং’-এ রানার-আপ হওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই জেসি বাকলি তার লক্ষ্য ও প্রতিভা দিয়ে নিজের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি

৬ দিন আগে

ভ্রমণগদ্য প্রকাশনা উপলক্ষে সুহৃদসভা’র আড্ডা-ইফতার

দেশে ভ্রমণসাহিত্যের মানোন্নয়ন, নতুন লেখক তৈরি এবং পাঠক বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে ‘ভ্রমণগদ্য সাহিত্য পুরস্কার’ প্রবর্তন এবং লেখক কর্মশালা আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

৭ দিন আগে