শ্রদ্ধঞ্জলি

বিভুরঞ্জন সরকার : এক সত্যনিষ্ঠ কলমের নীরব বিদায়

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৫, ১৩: ০০
বিভুরঞ্জন সরকার। অলংকরণ: লেখক

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিভুরঞ্জন সরকার এক অনন্য নাম। তাঁর জীবনের সমাপ্তি আমাদের মনে যে শূন্যতার রেখা টেনে দিয়েছে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। তিনি ছিলেন কলম যোদ্ধা, ছাত্ররাজনীতির সংগঠক, আর সর্বোপরি একজন নির্ভেজাল মানুষ।

১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া বিভুরঞ্জন স্কুলজীবনেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি পান। দৈনিক আজাদে সংবাদদাতা হিসেবে তাঁর প্রথম লেখালিখি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে পূর্ণকালীন সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন, এমনকি ডাকসু নির্বাচনে হোল সংসদ থেকেও প্রার্থী হন। আশির দশকের গোড়ার দিকে ছাত্র ইউনিয়নের সংকটময় সময়ে তাঁর এবং তাঁর সমসাময়িক ছাত্রনেতাদের অবদানেই সংগঠনটি পুনর্জাগরণের পথে এগোয়।

তবে সাংবাদিকতার ভুবনেই বিভুরঞ্জন সরকার হয়ে ওঠেন সর্বাধিক পরিচিত। যদিও সাধারণভাবে তাঁকে আমরা কলামিস্ট হিসেবে জানি, তাঁর ভূমিকা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। তিনি শুধু কলাম লিখতেন না—তিনি ছিলেন সংবাদপত্র সংগঠনের অন্যতম কারিগর। আজকের পত্রিকা প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ২০০০ সালের পর থেকে তাঁর সাথে কাজে, না কাজে আমার মাত্র কয়েকবার কথা হয়। সেই কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—লেখালিখি তাঁর কাছে পেশা নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা।

যতদূর মনে পড়ে, শান্তিনগর থেকে তিনি সম্পাদনা করতেন সাপ্তাহিক চলতিপত্র নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। সেই পত্রিকার কয়েকটি বিশেষ সংখ্যার কভার ডিজাইন করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। প্রতিবারই তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় আমি পেয়েছি একজন সহজ-সরল অথচ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষকে। আমার বিশ্বাস, বিভুদার সঙ্গে কারো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব সংঘাত থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

বিভুরঞ্জন সরকার সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যা দশের অধিক, সম্পাদিত গ্রন্থ চারটি। সাম্প্রতিক প্রকাশিত "শেখ হাসিনা: স্বপ্নপূরণের সফল কারিগর" কিংবা "মোনায়েম সরকার যখন নির্বাসনে" গ্রন্থ তাঁকে সমকালীন রাজনীতি ও ইতিহাসের একজন মননশীল ব্যাখ্যাকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কিন্তু জীবনের অন্তিম সময়টা তিনি কাটিয়েছেন নানা দুঃখ-কষ্টে। নিজের শারীরিক অসুস্থতা, ছেলের অসুস্থতা, আর্থিক সংকট—সব মিলিয়ে তিনি এক গভীর অবসাদে ডুবে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট তিনি একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে লিখে যান—এটা জীবনের শেষ লেখা হিসেবে ছাপতে পারেন। সেই লেখায় তাঁর যন্ত্রণা, বেদনা আর অসহায়তার কথা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। পরের দিনই (২২ আগস্ট ২০২৫) মেঘনা নদী থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়—সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

বিভুরঞ্জন সরকার আজ নেই, কিন্তু তাঁর কলম, তাঁর সততা আর তাঁর মানবিকতা আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি দেখিয়েছেন, একজন সাংবাদিকের জীবন কেবল সংবাদ সংগ্রহ বা কলাম লেখা নয়—এটি সমাজ, সত্য এবং মানুষের প্রতি এক অবিচল দায়বদ্ধতা।

তাঁকে স্মরণ করে আমরা শুধু একজন সাংবাদিককে নয়, একজন সহৃদয় মানুষকেও স্মরণ করি। বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি জীবনকে কঠিনতম পরিস্থিতিতেও মানবিকতার আলো দিয়ে উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রস্থান আমাদের জন্য বেদনার হলেও, তাঁর আদর্শ আমাদের পথ দেখাতে থাকবে চিরদিন।

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার আর নেই

লিভার-সংক্রান্ত জটিলতায় গত কয়েক দিন ধরে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন কারিনা। প্রথমে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স যোগে তাকে ভারতের চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

১১ দিন আগে

সেবা প্রকাশনীতে অনিয়ম-দুর্নীতি, কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা

১৪ দিন আগে

নায়িকার অভিযোগ, মুক্তি পাচ্ছে না ‘কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ’

নানা সমালোচনার পর মুক্তির দুই দিন আগেই স্থগিত করা হলো চিত্রনায়িকা মৌসুমী অভিনীত সিনেমা ‘কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ’-এর সেন্সর সনদপত্র। অভিনেত্রী জেবা জান্নাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিনেমার সেন্সর সনদপত্রটি বাতিল করা হয়।

১৪ দিন আগে

যুদ্ধ-ক্ষুধা-অবিনাশী সৌন্দর্য— মারাহ খালেদের ক্যানভাসে গাজার দিনলিপি

মারাহর কাজগুলো নিয়ে আমি যখন পড়ালেখা করছিলাম, আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল তার সেই ছোট্ট তাঁবুর গল্প। এক শরণার্থী শিবিরের ভেতরে, যেখানে মানুষের নিজের জন্য জায়গা নেই, সেখানে একটি তাঁবুকে গ্যালারি বানিয়ে ফেলল সে। এ যেন সেই প্রবল ধ্বংসযজ্ঞ ও অসহায়ত্বের মধ্যেও এক নীরব বিদ্রোহ।

১৪ দিন আগে