
বিল্লাল বিন কাশেম

একটা জীবনে মানুষ বহু ভুল করে। আবার সেই ভুল থেকেই শিক্ষা নেয়, নিজেকে সংশোধন করে এবং নতুন করে পথচলা শুরু করে। ভুল মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য— এটি যেমন দুর্বলতা, তেমনি উন্নতিরও সোপান। ভুল না করলে মানুষ শেখে না, আর না শিখলে বড় হয় না। তাই ভুলকে একেবারে অস্বীকার করা যেমন বাস্তবতাবর্জিত, তেমনি ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়াও সমানভাবে ক্ষতিকর। প্রয়োজন ভুলের স্বীকৃতি, আত্মসমালোচনা এবং সংশোধনের সাহস।
মানুষ জন্মগতভাবে পরিপূর্ণ নয়, সে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরিণত হয়। শিশুকাল থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আমরা ভুল করি— কখনো সিদ্ধান্তে, কখনো আচরণে, কখনো কথায়। পারিবারিক জীবনেই তার প্রথম পাঠ শুরু হয়।
মা-বাবা সন্তানের কল্যাণে অনেক সময় কঠোর হন, সন্তান তা ভুল বোঝে। আবার সন্তানও আবেগের বশে এমন কিছু বলে ফেলে, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। কিন্তু পরিবার টিকে থাকে ক্ষমা, সহনশীলতা ও ভালোবাসার ওপর। যদি প্রতিটি ভুলের জন্য স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটত, তবে কোনো পরিবারই অটুট থাকত না।
দাম্পত্য জীবনেও ভুল-ত্রুটি অনিবার্য। স্বামী-স্ত্রী ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন মানসিকতা ও ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে একসঙ্গে পথচলা শুরু করেন। সেখানে মতের অমিল, মনোমালিন্য, ভুল বোঝাবুঝি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পর্ক টিকে থাকে তখনই, যখন উভয়েই উপলব্ধি করেন— মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ভুলকে কেন্দ্র করে অহংকার নয়; সমঝোতা ও আত্মসমালোচনাই সম্পর্ককে স্থায়ী করে।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। বন্ধুর কোনো কথায় কষ্ট পাওয়া, ভুল বোঝা বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া— এসব মানবিক। প্রকৃত বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে সেখানে ক্ষমা আছে, সংশোধনের সুযোগ আছে। যে সমাজে ক্ষমা নেই, সেখানে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
কর্মজীবনেও ভুল অনিবার্য। একজন শিক্ষক ভুল তথ্য দিতে পারেন, একজন চিকিৎসক ভুল নির্ণয় করতে পারেন, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিদ্ধান্তে বিচ্যুত হতে পারেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ভুল ধরা পড়লে তা স্বীকার করার সততা আছে কি না। দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে ভুল স্বীকারকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ প্রকৃত শক্তি নিহিত নিজের ভুল স্বীকারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, তারাই সফল হয়েছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভুল হয়। নীতিনির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন পরিকল্পনায় ত্রুটি কিংবা প্রশাসনিক অদক্ষতা— এসবের ফল ভোগ করে জনগণ। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য হলো, সেখানে আত্মসমালোচনার সুযোগ থাকে। ভুল স্বীকার করে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে রাষ্ট্র এগিয়ে যায়, আর ভুল ঢাকার সংস্কৃতি তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ইসলামে বলা হয়েছে, মানুষ ভুল করবে— কিন্তু উত্তম সে-ই, যে ভুলের পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে। পাপের চেয়ে বড় হলো অনুশোচনার অভাব। আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনের পথ খোলা রেখেছে বলেই ধর্ম মানবজীবনকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ভুলের দুটি দিক আছে— একটি অনিচ্ছাকৃত, অন্যটি ইচ্ছাকৃত। অনিচ্ছাকৃত ভুল মানবিক দুর্বলতার ফল। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভুল, যা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়, তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ইচ্ছাকৃত অপরাধের শাস্তি প্রয়োজন। তবে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে, কেবল প্রতিশোধমূলক মনোভাব সমাজকে সুস্থ করে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ভুলের পরিণতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কারও একটি ভুল বক্তব্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং তাকে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। অনলাইন ট্রল, অপমান ও অবিরাম সমালোচনা একজন মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারে। অথচ আমরা ভুলে যাই— আমরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নই। যে অন্যকে নির্মমভাবে বিচার করছে, সেও কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ভুল করেছে বা করবে।
মানুষের উন্নতির ইতিহাস আসলে ভুল থেকে শেখার ইতিহাস। বিজ্ঞানীরা অসংখ্য ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে সাফল্যে পৌঁছেছেন। কোনো আবিষ্কার একদিনে হয়নি, ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যর্থ প্রচেষ্টাই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও ভুলের গুরুত্ব রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী ভুল উত্তর লিখে সঠিকটি শিখে নেয়। তাই ভুলকে ভয় না পেয়ে, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তবে ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন অভ্যাসে পরিণত না হয়। একবার ভুল করা মানবিক, একই ভুল বারবার করা দায়িত্বহীনতা। আত্মসমালোচনার অভাব মানুষকে একই জায়গায় আটকে রাখে। ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান— সব ক্ষেত্রেই উন্নতির জন্য নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আমাদের সমাজে ক্ষমার চর্চা কমে যাচ্ছে। আমরা দ্রুত বিচার করি, দ্রুত দোষারোপ করি; কিন্তু ধীরে শুনি, ধীরে বোঝার চেষ্টা করি। অথচ ক্ষমা একটি মহৎ গুণ। ক্ষমা মানে অন্যায়ের সমর্থন নয়, বরং মানবিকতার প্রকাশ। ক্ষমা মানুষকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়, আর দ্বিতীয় সুযোগ থেকেই অনেক সময় শ্রেষ্ঠ পরিবর্তনের সূচনা হয়।
শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। যদি তারা দেখে বড়রা নিজেদের ভুল স্বীকার করে না, তবে তারাও দায় এড়িয়ে যেতে শেখে। কিন্তু যদি দেখে বড়রা ভুল স্বীকার করে সংশোধনের চেষ্টা করে, তবে তারা সততার মূল্য বোঝে। ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য নেতৃত্বস্থানীয়দের আগে উদাহরণ স্থাপন করতে হবে।
ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনয়। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে, সে মনে করে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এই মনোভাব বড় ভুলের জন্ম দেয়। ইতিহাসে বহু পতনের পেছনে ছিল অহংকার ও ভুল স্বীকারে অনীহা। বিনয় মানুষকে শোনার ক্ষমতা দেয়, শিখতে সাহায্য করে।
একজন লেখক, সাংবাদিক বা চিন্তাশীল মানুষের দায়িত্ব আরও বেশি। লেখা, বক্তব্য বা বিশ্লেষণে ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধন করা প্রয়োজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি দায়বদ্ধতাও অপরিহার্য। ভুল তথ্য ছড়িয়ে গেলে তা সংশোধন করাই নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের জাতীয় জীবনে সহনশীলতা ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি জোরদার করা জরুরি। রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, নীতিগত বিরোধ থাকবে— কিন্তু প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার সংস্কৃতি সুস্থ নয়। সংলাপ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ভুল সংশোধন সম্ভব। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না— এটাই বাস্তবতা। কিন্তু মানুষ ভুলের ভেতরেই আটকে থাকবে কি না, সেটি তার নিজের সিদ্ধান্ত। ভুলকে স্বীকার করে, শিক্ষা নিয়ে, সংশোধনের পথে হাঁটলেই মানুষ মহৎ হয়ে ওঠে। ভুলকে ঢেকে রাখা নয়; ভুলের মধ্য দিয়েই আলোর পথে এগিয়ে যাওয়াই মানবজীবনের সার্থকতা।
আমরা যেন ভুলের কারণে সম্পর্ক ভেঙে না ফেলি; বরং ভুল থেকেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করি। আমরা যেন ভুলকে অজুহাত না বানাই, বরং উন্নতির সোপান বানাই। বিচার করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করি— আমি কি সম্পূর্ণ নির্ভুল? যদি না হই, তবে অন্যকেও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
মানুষ ভুল করবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলের পর অনুতাপ, আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের চেষ্টা— এগুলোই মানুষকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলে। সেই মানবিকতার চর্চাই হোক আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও জাতীয় জীবনের মূলমন্ত্র।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট

একটা জীবনে মানুষ বহু ভুল করে। আবার সেই ভুল থেকেই শিক্ষা নেয়, নিজেকে সংশোধন করে এবং নতুন করে পথচলা শুরু করে। ভুল মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য— এটি যেমন দুর্বলতা, তেমনি উন্নতিরও সোপান। ভুল না করলে মানুষ শেখে না, আর না শিখলে বড় হয় না। তাই ভুলকে একেবারে অস্বীকার করা যেমন বাস্তবতাবর্জিত, তেমনি ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়াও সমানভাবে ক্ষতিকর। প্রয়োজন ভুলের স্বীকৃতি, আত্মসমালোচনা এবং সংশোধনের সাহস।
মানুষ জন্মগতভাবে পরিপূর্ণ নয়, সে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরিণত হয়। শিশুকাল থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আমরা ভুল করি— কখনো সিদ্ধান্তে, কখনো আচরণে, কখনো কথায়। পারিবারিক জীবনেই তার প্রথম পাঠ শুরু হয়।
মা-বাবা সন্তানের কল্যাণে অনেক সময় কঠোর হন, সন্তান তা ভুল বোঝে। আবার সন্তানও আবেগের বশে এমন কিছু বলে ফেলে, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। কিন্তু পরিবার টিকে থাকে ক্ষমা, সহনশীলতা ও ভালোবাসার ওপর। যদি প্রতিটি ভুলের জন্য স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটত, তবে কোনো পরিবারই অটুট থাকত না।
দাম্পত্য জীবনেও ভুল-ত্রুটি অনিবার্য। স্বামী-স্ত্রী ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন মানসিকতা ও ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে একসঙ্গে পথচলা শুরু করেন। সেখানে মতের অমিল, মনোমালিন্য, ভুল বোঝাবুঝি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পর্ক টিকে থাকে তখনই, যখন উভয়েই উপলব্ধি করেন— মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ভুলকে কেন্দ্র করে অহংকার নয়; সমঝোতা ও আত্মসমালোচনাই সম্পর্ককে স্থায়ী করে।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। বন্ধুর কোনো কথায় কষ্ট পাওয়া, ভুল বোঝা বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া— এসব মানবিক। প্রকৃত বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে সেখানে ক্ষমা আছে, সংশোধনের সুযোগ আছে। যে সমাজে ক্ষমা নেই, সেখানে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
কর্মজীবনেও ভুল অনিবার্য। একজন শিক্ষক ভুল তথ্য দিতে পারেন, একজন চিকিৎসক ভুল নির্ণয় করতে পারেন, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিদ্ধান্তে বিচ্যুত হতে পারেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ভুল ধরা পড়লে তা স্বীকার করার সততা আছে কি না। দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে ভুল স্বীকারকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ প্রকৃত শক্তি নিহিত নিজের ভুল স্বীকারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, তারাই সফল হয়েছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভুল হয়। নীতিনির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন পরিকল্পনায় ত্রুটি কিংবা প্রশাসনিক অদক্ষতা— এসবের ফল ভোগ করে জনগণ। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য হলো, সেখানে আত্মসমালোচনার সুযোগ থাকে। ভুল স্বীকার করে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে রাষ্ট্র এগিয়ে যায়, আর ভুল ঢাকার সংস্কৃতি তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ইসলামে বলা হয়েছে, মানুষ ভুল করবে— কিন্তু উত্তম সে-ই, যে ভুলের পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে। পাপের চেয়ে বড় হলো অনুশোচনার অভাব। আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনের পথ খোলা রেখেছে বলেই ধর্ম মানবজীবনকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ভুলের দুটি দিক আছে— একটি অনিচ্ছাকৃত, অন্যটি ইচ্ছাকৃত। অনিচ্ছাকৃত ভুল মানবিক দুর্বলতার ফল। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভুল, যা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়, তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ইচ্ছাকৃত অপরাধের শাস্তি প্রয়োজন। তবে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে, কেবল প্রতিশোধমূলক মনোভাব সমাজকে সুস্থ করে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ভুলের পরিণতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কারও একটি ভুল বক্তব্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং তাকে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। অনলাইন ট্রল, অপমান ও অবিরাম সমালোচনা একজন মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারে। অথচ আমরা ভুলে যাই— আমরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নই। যে অন্যকে নির্মমভাবে বিচার করছে, সেও কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ভুল করেছে বা করবে।
মানুষের উন্নতির ইতিহাস আসলে ভুল থেকে শেখার ইতিহাস। বিজ্ঞানীরা অসংখ্য ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে সাফল্যে পৌঁছেছেন। কোনো আবিষ্কার একদিনে হয়নি, ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যর্থ প্রচেষ্টাই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও ভুলের গুরুত্ব রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী ভুল উত্তর লিখে সঠিকটি শিখে নেয়। তাই ভুলকে ভয় না পেয়ে, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তবে ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন অভ্যাসে পরিণত না হয়। একবার ভুল করা মানবিক, একই ভুল বারবার করা দায়িত্বহীনতা। আত্মসমালোচনার অভাব মানুষকে একই জায়গায় আটকে রাখে। ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান— সব ক্ষেত্রেই উন্নতির জন্য নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আমাদের সমাজে ক্ষমার চর্চা কমে যাচ্ছে। আমরা দ্রুত বিচার করি, দ্রুত দোষারোপ করি; কিন্তু ধীরে শুনি, ধীরে বোঝার চেষ্টা করি। অথচ ক্ষমা একটি মহৎ গুণ। ক্ষমা মানে অন্যায়ের সমর্থন নয়, বরং মানবিকতার প্রকাশ। ক্ষমা মানুষকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়, আর দ্বিতীয় সুযোগ থেকেই অনেক সময় শ্রেষ্ঠ পরিবর্তনের সূচনা হয়।
শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। যদি তারা দেখে বড়রা নিজেদের ভুল স্বীকার করে না, তবে তারাও দায় এড়িয়ে যেতে শেখে। কিন্তু যদি দেখে বড়রা ভুল স্বীকার করে সংশোধনের চেষ্টা করে, তবে তারা সততার মূল্য বোঝে। ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য নেতৃত্বস্থানীয়দের আগে উদাহরণ স্থাপন করতে হবে।
ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনয়। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে, সে মনে করে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এই মনোভাব বড় ভুলের জন্ম দেয়। ইতিহাসে বহু পতনের পেছনে ছিল অহংকার ও ভুল স্বীকারে অনীহা। বিনয় মানুষকে শোনার ক্ষমতা দেয়, শিখতে সাহায্য করে।
একজন লেখক, সাংবাদিক বা চিন্তাশীল মানুষের দায়িত্ব আরও বেশি। লেখা, বক্তব্য বা বিশ্লেষণে ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধন করা প্রয়োজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি দায়বদ্ধতাও অপরিহার্য। ভুল তথ্য ছড়িয়ে গেলে তা সংশোধন করাই নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের জাতীয় জীবনে সহনশীলতা ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি জোরদার করা জরুরি। রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, নীতিগত বিরোধ থাকবে— কিন্তু প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার সংস্কৃতি সুস্থ নয়। সংলাপ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ভুল সংশোধন সম্ভব। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না— এটাই বাস্তবতা। কিন্তু মানুষ ভুলের ভেতরেই আটকে থাকবে কি না, সেটি তার নিজের সিদ্ধান্ত। ভুলকে স্বীকার করে, শিক্ষা নিয়ে, সংশোধনের পথে হাঁটলেই মানুষ মহৎ হয়ে ওঠে। ভুলকে ঢেকে রাখা নয়; ভুলের মধ্য দিয়েই আলোর পথে এগিয়ে যাওয়াই মানবজীবনের সার্থকতা।
আমরা যেন ভুলের কারণে সম্পর্ক ভেঙে না ফেলি; বরং ভুল থেকেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করি। আমরা যেন ভুলকে অজুহাত না বানাই, বরং উন্নতির সোপান বানাই। বিচার করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করি— আমি কি সম্পূর্ণ নির্ভুল? যদি না হই, তবে অন্যকেও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
মানুষ ভুল করবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলের পর অনুতাপ, আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের চেষ্টা— এগুলোই মানুষকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলে। সেই মানবিকতার চর্চাই হোক আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও জাতীয় জীবনের মূলমন্ত্র।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট

বাঙালির জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি ঘটনা যা এ দেশের বহু মানুষকে বিভিন্নভাবে ছুঁয়ে গেছে এবং সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন অর্থ, ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা ও তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
৬ দিন আগে
আমাদের বড় পরিচয়— আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, চিন্তা ও বোধ একসূত্রে গাঁথা। বাঙালি হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আজ আমাদের গর্বিত পরিচয়— মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি; আমরা একুশের উত্তরাধিকার।
৬ দিন আগে
ভাসানী বিবৃতিতে আরও বলেন, ‘আমি বর্তমান মুসলিম লীগওয়ালাদের মতো মনে করি না যে ভারতের মুসলমানদের প্রতি আমাদের কোনো দায়িত্ব নাই। পাকিস্তানের প্রতি আমাদের দেশপ্রেমের জন্য খাজা নাজিমউদ্দীনের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন পড়ে না। এ দেশের জনসাধারণ ভালো করিয়াই জানেন, বিগত ১৯৪৬ সালে যখন পাকিস্তান ইস্যুর ওপর নির্বাচন
৮ দিন আগে
তারেক রহমান নিজেকে সেই আদর্শিক ধারার উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা, উদ্যোক্তা তৈরি এবং আধুনিক প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তার কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
১০ দিন আগে