বিনম্র শ্রদ্ধা: বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ শংকর

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭: ২৩

পঞ্চম দশকের বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ শংকর সম্পন্ন করলেন তার ইহজাগতিক যাত্রা। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬— ৯৩ বছরের দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন অনন্তলোকের পথে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এই কথাশিল্পী রেখে গেলেন তার কালজয়ী সাহিত্যকর্মের বিশাল ভান্ডার, অসংখ্য চরিত্র, অগণিত পাঠকের আবেগ এবং কয়েক প্রজন্মের মানসগঠনে গভীর ছাপ। তার পুরোনাম মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় হলেও তিনি পাঠকের কাছে ছিলেন শুধু ‘শংকর’— এক নাম, এক আবেগ, এক সময়ের প্রতীক। আমাদের মা-চাচি-খালা-ফুপিদের কাছে তিনি ছিলেন খুব কাছের প্রিয় লেখক; আমাদের প্রজন্মের কাছে হয়তো কিছুটা দূরের, কিন্তু তাদের পাঠজীবনের অন্তরঙ্গ অংশ।

তিনি ছিলেন পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর দশকের তারুণ্যের চিরচেনা সাহিত্যিক। তার কালজয়ী উপন্যাস চৌরঙ্গী আমার মা কতবার যে পড়েছেন, তার হিসাব নেই। আম্মার সাবিত্রী স্কুলের বান্ধবী, সমসাময়িক চাচা-ফুফিরাও এই উপন্যাসকে মনে করতেন জীবনঘনিষ্ঠ এক অনন্য কাহিনি। সদ্য স্বাধীন কলকাতার সাহেবপাড়া, অভিজাত হোটেল সংস্কৃতি, নাগরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নভঙ্গ, সম্পর্কের টানাপোড়েন— সব মিলিয়ে ‘চৌরঙ্গী’ হয়ে উঠেছিল সময়ের প্রতিচ্ছবি। ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ দুইশো বছরের অভিঘাত তখনও ছড়িয়ে ছিল কলকাতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে; সেই ইতিহাসের আবহ, সেই পরিবর্তনশীল সমাজবাস্তবতা তার কলমে পেয়েছে শিল্পিত অথচ নির্মোহ ভাষ্য।

এই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৬৮ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রে মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় শংকরের জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করে। পরবর্তীতে তার ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। সাহিত্য থেকে সিনেমা— দুই পরিসরেই শংকর হয়ে ওঠেন নাগরিক জীবনের নৈতিক সংকট, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মানবিক দ্বন্দ্বের অনন্য কথক। তার সৃষ্ট চরিত্রেরা শুধু কাহিনির মানুষ নয়; তারা সময়ের দলিল, সমাজের প্রতিচ্ছবি, মধ্যবিত্ত মানসিকতার উন্মোচিত রূপ।

আমার নিজের শৈশবের স্মৃতিতে শংকর জড়িয়ে আছেন খুব ব্যক্তিগতভাবে। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে কাটানো সেই দীর্ঘ চৈত্র-বৈশাখের দুপুরে দেখেছি— আম্মা আমাদের ঘুম পাড়াচ্ছেন। এক হাতে আমাদের পিঠে আলতো থাবা, আরেক হাতে তার প্রিয় উপন্যাস। সংসারের সারাদিনের কাজ গুছিয়ে নিয়ে বই পড়াই ছিল তার একমাত্র বিনোদন। বিয়ের আগের অভ্যাসে নিজের সংগ্রহে রাখা শংকর, নিমাই ভট্টাচার্য— ছিলেন তার নিত্যসঙ্গী। আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি ভেবে তিনি বইয়ের পাতায় ডুবে যেতেন। কখনো আমরা সত্যিই ঘুমাতাম, কখনো ভান করতাম। তিনি বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে কখন যে নিজেও ঘুমিয়ে পড়তেন— টের পেতাম না। তার আগে খুব যত্ন করে পাতার কোণা মুড়ে বুকের ওপর উপুড় করে রাখতেন বইটি। বেশিরভাগ দিন আমি আর বড় বোন সেই সুযোগে বাইরে পালানোর উপায় খুঁজতাম। শৈশবের সেই দুপুরগুলোয় শংকর ছিলেন আমাদের ঘরের নীরব সঙ্গী।

সত্তর-আশির দশকে আজকের মতো ইউটিউব বা গুগলের যুগ ছিল না। তখনকার সমসাময়িক লেখক-সাহিত্যিকদের উপন্যাসই ছিল সেকালের নারীদের মানসিক আশ্রয়। সাহিত্য ছিল বিনোদন, ছিল আত্মমগ্নতার অবকাশ, ছিল নিজের অদেখা অনুভূতির আয়না। প্রিয় লেখকের চরিত্রের নামে সন্তানের নামকরণ হতো। ঘরে ঘরে আলোচনায় থাকতেন শংকর, নিমাই, শরৎচন্দ্র, আশাপূর্ণা দেবী। শংকর ছিলেন সেই সময়ের একরকম ‘ক্রাশখাওয়া’ লেখক— যেমন আমাদের প্রজন্ম সুনীল বা শীর্ষেন্দু পড়ে আলোড়িত হয়েছে, তেমনি আমাদের মায়েদের প্রজন্ম ডুবেছিল শংকরের সৃষ্ট জগতে। বই হাতে নীরবে কাঁদতে দেখা সেই মায়েদের চোখের জলই প্রমাণ করে— তার সাহিত্য হৃদয়ের গভীরে পৌঁছাতে পারত।

১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ববঙ্গের যশোহর জেলায় জন্ম তার। বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই পরিবার কলকাতায় চলে যায়; হাওড়ায় তার বেড়ে ওঠা। সেখানেই শুরু সাহিত্যচর্চা। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত ‘কত অজানারে’ উপন্যাস তাকে রাতারাতি জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এরপর ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’, ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’সহ অসংখ্য রচনায় তিনি মানবজীবনের বহুমুখী বাস্তবতা, নাগরিক সংকট, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈতিক দ্বিধা ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে অন্বেষণ করেছেন। তার লেখায় ছিল জীবন ঘষে আগুন জ্বালানোর এক নিরন্তর প্রয়াস— জিয়ন কাঠিতে জীবন খোঁজার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

বাংলাদেশের জল-হাওয়া-মাটি-পানিতে সিক্ত তার জন্মসূত্রের শেকড় আমাদেরই ভূগোলে প্রোথিত। সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষের স্মৃতি বহন করা এক ভূখণ্ডের সন্তান হয়েও তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাহিত্যপুরুষ। নাগরিক জীবনের অন্তর্লীন সত্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মানবিক ভাঙনের যে ভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায় তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। আজ, কাল কিংবা পরশু নয়— শতাব্দী পেরিয়েও পাঠক ফিরে আসবেন তার কাছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে খুঁজে নেবে নিজস্ব সময়ের আয়নায়। বিনম্র শ্রদ্ধা, শংকর।

লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৬ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৬ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

৯ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

১০ দিন আগে