
ড. মিহির কুমার রায়

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনের সেই দিনগুলো এবং জীবন উৎসর্গ করা স্মৃতিগুলো এখন ইতিহাস। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১— এই ১৯টি বছর দেশের মানুষ অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, যার সফল বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। যা জাতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে।
বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে (পৃষ্ঠা ৯২) লিখেছেন— “সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করা হলো। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে ঐ তারিখের তিন দিন পূর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম।”
শেখ মুজিবুর রহমান সেই ১৯৫২ সালেই বাংলাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যান। ওই বছর তিনি চীনের পিকিংয়ে (২–১২ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা করেন। কেন তিনি চীনের বিশ্বশান্তি সম্মেলনে বাংলায় ভাষণ দেন, তার উল্লেখ রয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পৃষ্ঠা ২২৮)-তে। তিনি বলেছেন, ‘পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন, দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে কথা বলতে পারি। তবু মাতৃভাষায় কথা বলা আমার কর্তব্য।’
এরপর স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলায় বক্তৃতা করেন। আসলে বাংলায় বক্তৃতা করে বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলা ভাষাকে বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে পরিচয় করাননি; বাঙালির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বার্তাও পৌঁছে দিয়েছেন।
কিন্তু এত আত্মত্যাগের পর সেই ভাষা আজ কতটা টেকসই? শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বুকের রক্ত দিয়েছেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে; যার বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলা ভাষা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে দিনটি পালিত হয়ে আসছে— যা বাংলার বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধাপ।
আমাদের বড় পরিচয়— আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, চিন্তা ও বোধ একসূত্রে গাঁথা। বাঙালি হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আজ আমাদের গর্বিত পরিচয়— মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি; আমরা একুশের উত্তরাধিকার।
কিন্তু আমরা কি এখনো এই ভাষার মর্যাদা যথাযথভাবে দিতে পারছি? ১৯৮৭ সালে দেশে আইন করা হয় যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু তা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বটে, কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই কেন? এই ব্যর্থতার দায় সবার।
কথা ছিল শিক্ষাব্যবস্থা হবে একমুখী; কিন্তু তা হয়নি। আমরা রাষ্ট্র বদল করেছি, কিন্তু সমাজ বিনির্মাণ করতে পারিনি। বৈষম্য দূরীকরণে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একুশের শিক্ষা হলো— সমষ্টির পক্ষে কোনো বিজয়ই অসম্ভব নয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও জোটবদ্ধ আন্দোলনের সুফলের নজির রয়েছে। আমরা যেন বায়ান্ন ও একাত্তরের অঙ্গীকার ভুলে না যাই।
২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণে আমাদের নানা আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ অমর একুশে গ্রন্থমেলা, যা ব্যাপকভাবে একুশের বইমেলা হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে মাতৃভাষাকে টেকসই করার অন্যতম উপায় হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আলোচনার দাবি রাখে। ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে ভাষাবিদদের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও প্রযুক্তিবিদদেরও সক্রিয় হতে হয়। মায়ের ভাষায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের ধারণাকে সামনে রেখে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার চর্চা থাকলেও বাংলায় মানসম্মত কনটেন্টের অভাব রয়েছে। দেশের ১৭ কোটির বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী, ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ৫ কোটির বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর কথা বিবেচনায় রেখে মাতৃভাষায় উন্নত কনটেন্ট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি জরুরি।
এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি নয়, জ্ঞানার্জন এবং তথ্য ও সেবা প্রাপ্তিও সহজ হবে; পাশাপাশি মাতৃভাষাকে বাঙালির মাঝে চিরঞ্জীব রাখতে সহায়তা করবে।
তবে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে—
প্রথমত, মাতৃভাষার মাধ্যমে সব স্তরে ও সব জনপদে শিক্ষাকে কার্যকরভাবে জনপ্রিয় করা না গেলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও গুণগত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও সরকার জাতি গঠন, শিক্ষার মাধ্যম শক্তিশালী করা, আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তি বলীয়ান করার লক্ষ্যে কাজ করছে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে, বিশেষত ভাষাশিক্ষার ভিত দুর্বল। ভাষা যে মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম— এটি কোমলমতি শিশুদের বোঝানোর মতো দক্ষ শিক্ষক এখনো পর্যাপ্ত নয়। এই দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চপর্যায়ে গেলে ভাষার প্রতি জাতীয়তাবোধ গড়ে ওঠে না।
তৃতীয়ত, আকাশ সংস্কৃতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যবহার বাংলা ভাষার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। এখনো দেশের অনেক বিজ্ঞজন সভা-সমিতিতে ইংরেজিতে বক্তৃতা করেন, যদিও সবাই তা বুঝতে পারেন না। এর মাধ্যমে আমাদের চেতনায় ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট হয়।
চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও আইওটির মতো অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণের কাজ চলছে। কিন্তু ভিত্তিগত দুর্বলতা থাকলে এর সুফল কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা গবেষণার বিষয়।
পঞ্চমত, বাংলায় কথা বলা আর শুদ্ধ বাংলা চর্চা এক বিষয় নয়। এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত। অনেক অভিভাবক শিশুকে শুদ্ধ ভাষা না শিখিয়ে তার হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন— যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে—বাংলা ভাষা কি অন্যান্য ভাষার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে? দেশের রাস্তায় বিলবোর্ডে অশুদ্ধ বাংলা বা রুচিবিবর্জিত ইংরেজির ব্যবহার আমাদের সাংস্কৃতিক অসুস্থতার লক্ষণ বলেই প্রতীয়মান হয়।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন জাতীয় সমঝোতা।
লেখক: গবেষক ও সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনের সেই দিনগুলো এবং জীবন উৎসর্গ করা স্মৃতিগুলো এখন ইতিহাস। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১— এই ১৯টি বছর দেশের মানুষ অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, যার সফল বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। যা জাতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে।
বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে (পৃষ্ঠা ৯২) লিখেছেন— “সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করা হলো। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে ঐ তারিখের তিন দিন পূর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম।”
শেখ মুজিবুর রহমান সেই ১৯৫২ সালেই বাংলাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যান। ওই বছর তিনি চীনের পিকিংয়ে (২–১২ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা করেন। কেন তিনি চীনের বিশ্বশান্তি সম্মেলনে বাংলায় ভাষণ দেন, তার উল্লেখ রয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পৃষ্ঠা ২২৮)-তে। তিনি বলেছেন, ‘পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন, দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে কথা বলতে পারি। তবু মাতৃভাষায় কথা বলা আমার কর্তব্য।’
এরপর স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলায় বক্তৃতা করেন। আসলে বাংলায় বক্তৃতা করে বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলা ভাষাকে বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে পরিচয় করাননি; বাঙালির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বার্তাও পৌঁছে দিয়েছেন।
কিন্তু এত আত্মত্যাগের পর সেই ভাষা আজ কতটা টেকসই? শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বুকের রক্ত দিয়েছেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে; যার বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলা ভাষা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে দিনটি পালিত হয়ে আসছে— যা বাংলার বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধাপ।
আমাদের বড় পরিচয়— আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, চিন্তা ও বোধ একসূত্রে গাঁথা। বাঙালি হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আজ আমাদের গর্বিত পরিচয়— মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি; আমরা একুশের উত্তরাধিকার।
কিন্তু আমরা কি এখনো এই ভাষার মর্যাদা যথাযথভাবে দিতে পারছি? ১৯৮৭ সালে দেশে আইন করা হয় যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু তা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বটে, কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই কেন? এই ব্যর্থতার দায় সবার।
কথা ছিল শিক্ষাব্যবস্থা হবে একমুখী; কিন্তু তা হয়নি। আমরা রাষ্ট্র বদল করেছি, কিন্তু সমাজ বিনির্মাণ করতে পারিনি। বৈষম্য দূরীকরণে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একুশের শিক্ষা হলো— সমষ্টির পক্ষে কোনো বিজয়ই অসম্ভব নয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও জোটবদ্ধ আন্দোলনের সুফলের নজির রয়েছে। আমরা যেন বায়ান্ন ও একাত্তরের অঙ্গীকার ভুলে না যাই।
২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণে আমাদের নানা আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ অমর একুশে গ্রন্থমেলা, যা ব্যাপকভাবে একুশের বইমেলা হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে মাতৃভাষাকে টেকসই করার অন্যতম উপায় হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আলোচনার দাবি রাখে। ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে ভাষাবিদদের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও প্রযুক্তিবিদদেরও সক্রিয় হতে হয়। মায়ের ভাষায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের ধারণাকে সামনে রেখে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার চর্চা থাকলেও বাংলায় মানসম্মত কনটেন্টের অভাব রয়েছে। দেশের ১৭ কোটির বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী, ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ৫ কোটির বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর কথা বিবেচনায় রেখে মাতৃভাষায় উন্নত কনটেন্ট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি জরুরি।
এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি নয়, জ্ঞানার্জন এবং তথ্য ও সেবা প্রাপ্তিও সহজ হবে; পাশাপাশি মাতৃভাষাকে বাঙালির মাঝে চিরঞ্জীব রাখতে সহায়তা করবে।
তবে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে—
প্রথমত, মাতৃভাষার মাধ্যমে সব স্তরে ও সব জনপদে শিক্ষাকে কার্যকরভাবে জনপ্রিয় করা না গেলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও গুণগত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও সরকার জাতি গঠন, শিক্ষার মাধ্যম শক্তিশালী করা, আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তি বলীয়ান করার লক্ষ্যে কাজ করছে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে, বিশেষত ভাষাশিক্ষার ভিত দুর্বল। ভাষা যে মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম— এটি কোমলমতি শিশুদের বোঝানোর মতো দক্ষ শিক্ষক এখনো পর্যাপ্ত নয়। এই দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চপর্যায়ে গেলে ভাষার প্রতি জাতীয়তাবোধ গড়ে ওঠে না।
তৃতীয়ত, আকাশ সংস্কৃতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যবহার বাংলা ভাষার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। এখনো দেশের অনেক বিজ্ঞজন সভা-সমিতিতে ইংরেজিতে বক্তৃতা করেন, যদিও সবাই তা বুঝতে পারেন না। এর মাধ্যমে আমাদের চেতনায় ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট হয়।
চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও আইওটির মতো অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণের কাজ চলছে। কিন্তু ভিত্তিগত দুর্বলতা থাকলে এর সুফল কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা গবেষণার বিষয়।
পঞ্চমত, বাংলায় কথা বলা আর শুদ্ধ বাংলা চর্চা এক বিষয় নয়। এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত। অনেক অভিভাবক শিশুকে শুদ্ধ ভাষা না শিখিয়ে তার হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন— যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে—বাংলা ভাষা কি অন্যান্য ভাষার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে? দেশের রাস্তায় বিলবোর্ডে অশুদ্ধ বাংলা বা রুচিবিবর্জিত ইংরেজির ব্যবহার আমাদের সাংস্কৃতিক অসুস্থতার লক্ষণ বলেই প্রতীয়মান হয়।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন জাতীয় সমঝোতা।
লেখক: গবেষক ও সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

গণভোট ও জনরায় কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো এবং নাগরিকদের রাজনৈতিক আস্থা নিশ্চিত হতে পারে। ফলে দেশের জনগণ সচেতনভাবে, আবেগতাড়িত না হয়ে যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
১০ দিন আগে
ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অতি লোভনীয় উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশ কি বহির্শক্তির খেলার মাঠে পরিণত হবে, নাকি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় একাট্টা হয়ে নিজেদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিকার নিজেরাই করবে— তা নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।
১০ দিন আগে
আমি যে নারী নির্যাতন মামলার ভিকটিম, সেই কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর আমার বাবা— তাকেও শুনতে হয়েছে, ‘এত কিছুর পর মেয়েকে কেন রাজনীতি করতে দেয়!’ ৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম আমার লড়াই শেষ। কিন্তু তারপর অনলাইনে কিছু আইডির এমন হ্যারাসমেন্ট ও স্লাট-শেমিং আমি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।
১১ দিন আগে
এভাবেই লাখ লাখ ভোটারকে একত্রিত করতে সক্ষম একটি নির্বাচন দলীয় কর্মী বাহিনীর একত্রিতকরণের একটি অপারেশনে পরিণত হয়। ফলে শুধু ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনাতেই কয়েক লাখ সংগঠিত কর্মী মাঠে নামাতে হয়। এই মানুষগুলো স্বেচ্ছাসেবী নন, তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয় অর্থ, প্রভাব ও সুবিধার আশ্বাস দিয়ে।
১২ দিন আগে