
অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

আচরণ বিজ্ঞানীদের মতে কোনো বিশেষ ঘটনা সর্বতোভাবে নিরপেক্ষ, তবে তার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, তাৎপর্য নির্ধারণ এবং দিক-নির্দেশনা গ্রহণ প্রেক্ষিত-প্রেক্ষাপটের মানুষের কাজ। বাঙালির জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি ঘটনা যা এ দেশের বহু মানুষকে বিভিন্নভাবে ছুঁয়ে গেছে এবং সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন অর্থ, ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা ও তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলা ভাষা বিতর্ক খণ্ডিত পরিসরে হলেও দীর্ঘদিনের; ভাষা আন্দোলন হলো তারই ধারাবাহিকতা। এই আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের মাঝে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের এদেশীয় বশংবদদের পক্ষে এটাকে পাকিস্তান ধ্বংসের কুমতলব বলে চিহ্নিত করা সহজ ছিল। অভিজাতগণ ছাড়া সাধারণ মুসলিম লীগাররাও বাংলা ভাষার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল বলেই তাদের একাংশ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে এবং গণপরিষদের সদস্য পদ প্রত্যাহারের মতো আজকের দিনে অকল্পনীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছিল।
ইতিহাসের শিক্ষা বা বিবেকের তীব্র দহনে তারা বিষয়টির তাৎপর্য অনুভব করেছে বলে সাধারণ মুসলমানের কাছে ভাষা আন্দোলনকে হিন্দু, ভারতের চর, কমিউনিস্ট, পাকিস্তান ও ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র বলে চাপানো ততটা সম্ভব হয়নি। অনেকেই হয়তো জানতেন যে ভাষা বিতর্কটির সূচনা হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির বেশ আগেই। বাংলার অভিজাত মুসলমান বিশেষত খাজা-গজা, জমিদার-তালুকদারদের পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু এবং তাদের অনেকেই আলীগড়ে শিক্ষা লাভ করে আভিজাত্য বজায় এবং চাষাভুষাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার অভিপ্রায়ে বাঙালি মুসলমানের ভাষা হিসাবে উর্দুর পক্ষেই ওকালতি করে আসছিল। মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি সৃষ্টি প্রায় নিশ্চিত জেনেই এই বিতর্কটা তীব্রতর হচ্ছিল।
কিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের পরই মাটির কাছাকাছি বাঙালি সুধীজনদের কাছে কয়েক দফায় বাঙালির দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবহারিক ভাষা হিসাবে বাংলাই সুবিবেচনা প্রসূত বলে প্রতীয়মান হয়। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক যে পাকিস্তান সৃষ্টির সিদ্ধান্ত হয়, তাতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘পূর্ববঙ্গ’ একটি স্টেটের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়। সকলের শুধু ধারণা নয়, বিশ্বাসও জন্মে যে— এই স্টেটের প্রায় সকল মানুষের ভাষা বাংলাই হবে রাষ্ট্রের ভাষা।
১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাবকে সংশোধন করা হয়। এবারের প্রস্তাবটি দিল্লি প্রস্তাব নামে পরিচিত এবং তাতে পূর্ববঙ্গের ‘স্টেট’ মর্যাদা ‘প্রদেশ’-এর মর্যাদায় পর্যবসিত হয়। ফলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলেও পূর্ববঙ্গের ভাষা বাংলাই হবে বলে কলকাতার বুকে ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি সুধীজনদের স্বীকৃতি পায়। সুধীজনদের ন্যায় সাধারণ মানুষও আশা করেছিল যে তারা ভৌগোলিক স্বাধীনতার সাথে রুটি-রুজির স্বাধীনতা ও মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার পাবে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির কিছু আগের একটি ও অব্যবহিত পরের একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, তাদের স্বপ্ন ছিল অলীক স্বপ্ন। ক্রমশ তাদের সুপ্তিভঙ্গও শুরু হয়।
১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম সভায় গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বসলেন যে এ দেশের মানুষের পরিচয় মুসলমান বা হিন্দু নয়, তাদের পরিচয় হবে ‘পাকিস্তানি’ বলে। কার্যত এ ঘোষণা ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব। জিন্নাহর এই ঘোষণার মধ্যে অনেকেই জিন্নাহর প্রগতিশীলতা বিশেষত অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা আবিস্কার করেন। সেদিন জিন্নাহর নেতৃত্বে একটি নতুন জাতির উদ্ভব হলেও তা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হাজার বছরের জাতিসত্তা অর্থাৎ, বাঙালি, সিন্ধি, পাঠান, পাঞ্জাবি বা বেলুচ জাতির সাময়িক অবসান ঘটাল।
জিন্নাহর এই বক্তব্যের কিছুদিন পর অর্থাৎ, ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে করাচিতে পাকিস্তান এডুকেশনাল কনফারেন্স থেকে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো দাবি জানানো হয়। বাংলাভাষী বা বাংলা অঞ্চলের বসবাসকারী তথাকথিত বিশিষ্টগণের কেউ কেউ তাতে সমর্থনও দিলেন। এটাকে ভিত্তি ধরে সাধারণ মানুষের মতামতকে তোয়াক্কা না করে কেন্দ্রের কাজকর্মে, পোস্ট কার্ড, মনি অর্ডার ফরম ইত্যাদিতে উর্দুর প্রচলন হয়ে যায়। পূর্ববঙ্গে কর্মরত মোহাজের জাতিউৎসাহী দেশিয় কর্মচারীরা শুদ্ধ-অশুদ্ধ উর্দুতে ‘বাতচিত’ এবং চাষাভুষা ও শিক্ষিত বাঙালিদের প্রতি নাক সিটকানো শুরু করে। এত দ্রুত উর্দুর দাবিকে কার্যকরী করাও ‘পাকিস্তানি’ জাতি সৃষ্টির সাথে নিশ্চয়ই একটি যোগসূত্র ছিল। হয়তো সেদিন মানুষের সরলতা, মোহাচ্ছন্নতা বা শিরশ্ছেদের হুমকির কারণে তা উদঘাটিত হয়নি।
দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন এবং সে ভিত্তিতে পাকিস্তান অর্জিতও হয়েছিল। দ্বি-জাতিতত্ত্বের মূল কথা ছিল ভারতের মুসলমানরা একটা স্বতন্ত্র জাতি এবং হিন্দুরা আর একটি স্বতন্ত্র জাতি। পাকিস্তান অর্জনের আগেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কায়েদে আযম বা বাবা-ই-মিল্লাত অর্থাৎ, জাতির পিতা হয়ে গেলেন আর ভারতে হলো মি. গান্ধী। মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিল না কারণ নির্দ্বিধায় তিনি ভারতীয় জাতির পিতা হিসাবে বরেণ্য হলেন; সমস্যা দেখা দিল জিন্নাহকে নিয়ে। জিন্নাহ কোন বিচারে মুসলমান জাতির পিতা হবেন?
পাকিস্তান আন্দোলনের বহু বহু আগেই শুধু ভারতে নয় সারা বিশ্বে মুসলমানের বসবাস রয়েছে এবং যারা মুসলমানকে জাতি হিসাবে বিবেচনা করে তারাও কোন যুক্তিতে জিন্নাহকে মুসলমান জাতির পিতা বলবেন? চতুর জিন্নাহকে জাতির পিতা থাকতেই হবে বলেই রাতারাতি তিনি একটি জাতিরও জন্ম দিয়ে বসলেন। এই পাকিস্তানি জাতি সৃষ্টির প্রয়াসে ‘উর্দু’ নামক একটি ভাষাকে পাকিস্তানের সব মানুষের ভাষা বানাতে স্বার্থান্ধ মহল প্রয়াসী হলো। উর্দুর পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে পরবর্তীতে মি. জিন্নাহ পাকিস্তানি পরিচয় ঘুচিয়ে মুসলমান পরিচিতি পুনঃআমদানি করেছিলেন। সেটাও কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। মি. জিন্নাহ ও তার সহযোগীদের অতিরিক্ত উর্দু প্রীতির কারণেই গণপ্রতিনিধিদের কোনো সিদ্ধান্ত বা সম্মতি ছাড়াই পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকে উর্দু ইংরেজির স্থান গ্রহণ করতে শুরু করে।
এই বিষয়টি বাঙালিদের মনঃপূত হয়নি বলে সেদিনের গণপরিষদের সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা প্রশ্নে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি মুলতবি প্রস্তাব আনয়ন করেন। তিনি যুক্তি-তর্কে এ কথা প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে অন্তত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা না হোক অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে গ্রহণ সমুচিত হবে। সেখানে তাকে যারা সমর্থন করলেন তারা হলেন প্রেম হরি বর্মা, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত, শিরীষ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং তাকে বিরোধিতা করলেন লিয়াকত আলী খান, নাজিমুদ্দিনসহ মুসলমান সদস্যগণ।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মুলতবি প্রস্তাবটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভাজন ও মুসলমান মুসলমানের দূরত্ব সৃষ্টির প্রয়াস বলে লিয়াকত আলী গং তা বাতিল করে দিলেন। পরিষদের বাইরে কিন্তু এই বিতর্ক আলোড়ন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। একে কেন্দ্র করে ছাত্র গণবিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করলে ২৯ ফেব্রুয়ারি অনেককেই গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি আবেগের বলে তাতে সব ধরনের ছাত্র-তরুণের সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা গেল। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১১ মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালন করে। সেদিন ১৪ ব্যক্তি আহত ও ৬৫ জন গ্রেফতার হলো। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পূর্ব পর্যন্ত এই ১১ মার্চ ‘ভাষা দিবস’ হিসাবে পালিত হতো। ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভায় আবারও ধীরেন্দ্র দত্ত ভিন্নরূপে ভাষা প্রশ্নটি নিয়ে আসেন। তিনজন হিন্দু সদস্য ও নয়জন মুসলমান সদস্য ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ব্যাপারে বক্তব্য রাখেন। ‘বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা’ হিসাবে আনীত প্রস্তাবটিও মুসলিম লীগের কারণে গৃহীত হলো না।
১৯৪৮ সালে পূর্ববঙ্গ সফরে এসে মি. জিন্নাহ একুশে মার্চ লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে ‘উর্দু’ এবং উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে’ বলে দম্ভোক্তি করেন। ভাষা সংগ্রামকে তিনি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন বলে অস্পষ্ট ইঙ্গিত রাখেন। এই সভায় তিনি সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বাঙালি ইত্যাদি জাতিসত্তার বিলোপ ঘটিয়ে আবারও সবাইকে মুসলমান হিসাবে আখ্যায়িত করেন। তিনি হিন্দু ও দালাল মুসলমানদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেই তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মীসহ গুণ্ডা-বদমায়েশদের উসকে দেন। ২৪ মার্চ ছাত্রদের এক সমাবেশে তিনি ভাষা প্রশ্নে একই কথা উচ্চারণ করলে ছাত্র-নেতারা ‘না-না’ ধ্বনি তুলে তার উক্তিকে তলিয়ে দেন। সেদিনই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে ।
১৯৪৮ সালের ২৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে মি. জিন্নাহ উর্দুর প্রশ্নে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেও বাংলা ভাষার প্রশ্নে তার অবস্থান অস্পষ্ট রেখে যান। পরবর্তীতে ঘরে বাইরে বৈরিতার শিকার হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন লিয়াকত আলী-নাজিমুদ্দীনদের পোয়াবারো। ১৯৪৯ সালের ১৪ আগস্ট থেকে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় বহুমাত্রায় বেড়ে যায়। বাংলা ভাষাকে মুসলমানিকরণ ও সরলীকরলের প্রচেষ্টা ও তাকে রোমান হরফে লেখার প্রস্তাবের ভিতর দিয়ে কৌশলে তার বিলুপ্তি প্রচেষ্টাটি সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই কোরাসে যারা শরিক হন তারা হলেন পূর্ববঙ্গের মোহাজের সম্প্রদায়, পুলিশের এক ডিআইজি, নাজিমুদ্দীন, ফজলুর রহমান প্রমুখ।

উর্দুভাষী বাঙালি ফজলুর রহমান ১৯৫১ সালের ১৫ এপ্রিল ‘মাহে নও’ পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে উর্দুর পক্ষে জোরালো বক্তব্য উত্থাপন করেন। অপরদিকে পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা মাঠের আন্দোলনে ও কাগজের লেখায় বাংলাকে হয় পাকিস্তানের একমাত্র ভাষা, না হয় অন্যতম ভাষা ও কমপক্ষে প্রদেশের ভাষা হিসাবে গ্রহণের দাবি জানিয়ে যেতে থাকে। এসবের মাধ্যমে যে উত্তাপ সৃষ্টি হচ্ছিল তাতে তদানীন্তন ‘সংবাদ’ ও ‘মর্নিং নিউজ’ সরকারি পক্ষে এবং সিলেটের ‘নও বেলাল’ ও ঢাকার ‘অবজার্ভার’ ভাষা আন্দোলনকারীদের পক্ষে গতিবেগ সঞ্চার করে। এ সময় কতিপয় প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের জন্ম ও রাজনৈতিক দলের বিকাশপর্ব শুরু হয়। এই পর্যায়ে অনেক ‘ভাষা সৈনিক’ তাদের কতিপয় পূর্বসূরির মতো নিজেদের গুটাতে শুরু করে।
১৯৫২ সালের ২৮ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন কর্তৃক জিন্নাহর মতোই উস্কানিমূলক বক্তব্যের রেশ ধরে ৩০ জানুয়ারি আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ গঠিত হয় যা পরবর্তীতে কাজী গোলাম মাহবুবের নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ নামে আবির্ভূত হয়। সে বছর ১১ মার্চ ভাষা দিবস পালনের প্রস্তুতিকালে সরকার, সরকারি দল মুসলিম লীগ এবং সরকার সমর্থক পত্রিকাগুলো অতিশয় বৈরী অবস্থান গ্রহণ করে।
মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের ভারতের দালাল, হিন্দুর চর, কমিউনিস্ট এবং পাকিস্তান ও মুসলমানের শত্রু আখ্যায়িত করে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়। এই পর্বে তথাকথিত ভাষা সৈনিকদের কেউ নিষ্প্রভ বা কেউবা বিস্মৃতির অতলে চলে যান এবং অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানি প্রভুদের কোলে আশ্রয় নিতে শুরু করে। ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনের শিখাটি যারা প্রজ্বলিত রেখেছিল তারা হলো বামপন্থি বা আওয়ামী লীগের মতো মধ্যমপন্থিরা। মার্শাল ল’য়ের মধ্যেও তাদের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়। তবে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন পরবর্তী অভিজ্ঞতা, ৯২ক ধারা, ইস্কান্দার-আইয়ুবের সামরিক শাসন, জাতিগত নিপীড়ন, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং পাকিস্তানি বশংবদ সৃষ্টির ঘৃণ্য অপকৌশলের উলঙ্গ প্রয়োগ ভাষা আন্দোলনকারীদের একাংশকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। ভাষা আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার হলেও তার চরিত্র বদলাতে থাকে এবং ১৯৬৬ সালের দিকে বাঙালি ধারার একাংশ পাকিস্তানবিরোধী ও স্বাধীনতা প্রত্যাশী হয়ে দাঁড়ায়। এরপর থেকে প্রতিবছর একুশের চেহারা ও চেতনা বদলে যেতে থাকে।
১৯৬৯ সালে এসে ভাষা আন্দোলন আর ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১১ দফা আন্দোলন ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙালি ধারা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে ১৯৭১ সালে মাটির অধিকার আন্দোলনে বাম-মধ্যমদের বিভক্তির নিরসন টেনে হাজার বছরের বিশাল অর্জন স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনে। ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী ইতিহাসের এই নাতিদীর্ঘ বর্ণনা একটি কথাকে স্পষ্ট করে যে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ধারার বিভিন্ন লক্ষ্য ছিল। ভাষা আন্দোলনের যে ধারাটি এটাকে একটি ‘End’ হিসাবে বিবেচনা করেছিল, তারা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পর তার প্রয়োগ ও উৎকর্ষের কাজে হাত দেয়।
রেনেসাঁ সোসাইটি ও তমদ্দুন মজলিসকে এই দলে ফেলা হয়। তারা পাকিস্তানের কাঠামোতে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানের ভাষা বাংলাকে সংস্কৃতের কবল থেকে উদ্ধার করে আরবি ফারসি উর্দু দিয়ে সমৃদ্ধ করতে চায়। তাদের দৃষ্টিতে মনোবিজ্ঞানীর সামগ্রিকতা অনুপস্থিত ছিল। এদের কাছা কাছি কিছু ব্যক্তি বন্ধু বেশে ভাষা আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার জন্য কারও এজেন্ট বা পোষ্য হিসেবে অবস্থান করে। তাদেরকে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও তাদের তস্য দালাল পাকিস্তানের গুপ্তচর হিসাবেই চিহ্নিত করা যায়।
ভাষা আন্দোলনের আর একটি স্রোত আন্দোলনটি একটি ‘Means’ হিসাবে গ্রহণ করে। তাদের একটি উপধারা পাকিস্তানের সকল জাতিসত্তার সাবলীল বিকাশে ভাষার ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে একটি মানবিক পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখত। নিঃসন্দেহে গোপন কমিউনিস্ট পার্টি, যুবলীগ পরবর্তীতে ন্যাপ ছাত্র ইউনিয়ন এবং সেকালের গণতন্ত্রী পার্টি, এই উপধারায় ছিল। তারা পাকিস্তানের প্রতিটি জাতিসত্তার অস্তিত্বসহ তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবনবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাই তারা বাংলাকে পূর্ব বাংলার এবং উর্দুকে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা না বলে সব জাতিসত্তার ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবি জানায়। এই ধারার কেউ কেউ অবশ্য উর্দুকে পশ্চিম পাকিস্তানের এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত ছিল। ভাষা আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসন পর্যন্ত এগিয়ে নিতে সম্মত হলেও তাকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দেবার পক্ষপাতী প্রথমদিকে তারা মোটেই ছিল না।
এই ধারার আর একটি উপধারা ছিল উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী অংশ। তাদের কেউ কেউ বাংলাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে আগ্রহী ছিল। কেউ কেউ অবশ্য উর্দুকে পশ্চিম পাকিস্তানের এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি আদায় করে ইংরেজিকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষায় বহাল রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। এ দুটো স্রোত বাদ দিলে ভাষা আন্দোলনকারী শক্তির একাংশ প্রথম থেকেই একে একটি চূড়ান্ত গন্তব্যে নিয়ে যাবার প্রত্যাশী ছিল। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগের একাংশের কথাই এখানে বলা হচ্ছে। প্রথমদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল মনসুর আহমদ, আবদুস সালাম খান প্রমুখের প্রচণ্ড দাপটে তারা মনের কথাটি প্রকাশ করতে পারেননি। তবে ক্রমশ উপরিউক্ত উপধারাটা বাস্তবতা ও তারুণ্যের আঘাতে দুর্বল হয়ে যায়, শেখ মুজিবের নেতৃত্ব মেনে নেয় বা তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ন্যাপের কিয়দংশও প্রকাশ্যে বা গোপনে তাঁর সাথে স্থান খুঁজে নেয় বা ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন বাঙালি যে ধারাটির কথা বললাম তারা বাস্তবতার কষাঘাতে উপলব্ধি করেছিল যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের নিজস্ব পরিচিতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক মানবিক জীবনবোধ ও শোষণহীন সমাজ স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই তার ৬ দফাকে প্রকাশ্যে রাখলেও প্রতিটি পদক্ষেপে শেখ মুজিব এক দফার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতিহাস বলছে যে বঙ্গবন্ধু এই অগ্রযাত্রায় তার এককালের সহকর্মী এবং পরবর্তীতে ভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানকারীদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় একাকার করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা নয়, শুধু বাংলা ভাষার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাঙালির সুপ্তিভঙ্গের কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছিল।
লেখক: অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির ফেলো

আচরণ বিজ্ঞানীদের মতে কোনো বিশেষ ঘটনা সর্বতোভাবে নিরপেক্ষ, তবে তার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, তাৎপর্য নির্ধারণ এবং দিক-নির্দেশনা গ্রহণ প্রেক্ষিত-প্রেক্ষাপটের মানুষের কাজ। বাঙালির জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি ঘটনা যা এ দেশের বহু মানুষকে বিভিন্নভাবে ছুঁয়ে গেছে এবং সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন অর্থ, ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা ও তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলা ভাষা বিতর্ক খণ্ডিত পরিসরে হলেও দীর্ঘদিনের; ভাষা আন্দোলন হলো তারই ধারাবাহিকতা। এই আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের মাঝে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের এদেশীয় বশংবদদের পক্ষে এটাকে পাকিস্তান ধ্বংসের কুমতলব বলে চিহ্নিত করা সহজ ছিল। অভিজাতগণ ছাড়া সাধারণ মুসলিম লীগাররাও বাংলা ভাষার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল বলেই তাদের একাংশ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে এবং গণপরিষদের সদস্য পদ প্রত্যাহারের মতো আজকের দিনে অকল্পনীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছিল।
ইতিহাসের শিক্ষা বা বিবেকের তীব্র দহনে তারা বিষয়টির তাৎপর্য অনুভব করেছে বলে সাধারণ মুসলমানের কাছে ভাষা আন্দোলনকে হিন্দু, ভারতের চর, কমিউনিস্ট, পাকিস্তান ও ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র বলে চাপানো ততটা সম্ভব হয়নি। অনেকেই হয়তো জানতেন যে ভাষা বিতর্কটির সূচনা হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির বেশ আগেই। বাংলার অভিজাত মুসলমান বিশেষত খাজা-গজা, জমিদার-তালুকদারদের পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু এবং তাদের অনেকেই আলীগড়ে শিক্ষা লাভ করে আভিজাত্য বজায় এবং চাষাভুষাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার অভিপ্রায়ে বাঙালি মুসলমানের ভাষা হিসাবে উর্দুর পক্ষেই ওকালতি করে আসছিল। মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি সৃষ্টি প্রায় নিশ্চিত জেনেই এই বিতর্কটা তীব্রতর হচ্ছিল।
কিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের পরই মাটির কাছাকাছি বাঙালি সুধীজনদের কাছে কয়েক দফায় বাঙালির দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবহারিক ভাষা হিসাবে বাংলাই সুবিবেচনা প্রসূত বলে প্রতীয়মান হয়। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক যে পাকিস্তান সৃষ্টির সিদ্ধান্ত হয়, তাতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘পূর্ববঙ্গ’ একটি স্টেটের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়। সকলের শুধু ধারণা নয়, বিশ্বাসও জন্মে যে— এই স্টেটের প্রায় সকল মানুষের ভাষা বাংলাই হবে রাষ্ট্রের ভাষা।
১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাবকে সংশোধন করা হয়। এবারের প্রস্তাবটি দিল্লি প্রস্তাব নামে পরিচিত এবং তাতে পূর্ববঙ্গের ‘স্টেট’ মর্যাদা ‘প্রদেশ’-এর মর্যাদায় পর্যবসিত হয়। ফলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলেও পূর্ববঙ্গের ভাষা বাংলাই হবে বলে কলকাতার বুকে ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি সুধীজনদের স্বীকৃতি পায়। সুধীজনদের ন্যায় সাধারণ মানুষও আশা করেছিল যে তারা ভৌগোলিক স্বাধীনতার সাথে রুটি-রুজির স্বাধীনতা ও মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার পাবে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির কিছু আগের একটি ও অব্যবহিত পরের একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, তাদের স্বপ্ন ছিল অলীক স্বপ্ন। ক্রমশ তাদের সুপ্তিভঙ্গও শুরু হয়।
১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম সভায় গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বসলেন যে এ দেশের মানুষের পরিচয় মুসলমান বা হিন্দু নয়, তাদের পরিচয় হবে ‘পাকিস্তানি’ বলে। কার্যত এ ঘোষণা ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব। জিন্নাহর এই ঘোষণার মধ্যে অনেকেই জিন্নাহর প্রগতিশীলতা বিশেষত অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা আবিস্কার করেন। সেদিন জিন্নাহর নেতৃত্বে একটি নতুন জাতির উদ্ভব হলেও তা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হাজার বছরের জাতিসত্তা অর্থাৎ, বাঙালি, সিন্ধি, পাঠান, পাঞ্জাবি বা বেলুচ জাতির সাময়িক অবসান ঘটাল।
জিন্নাহর এই বক্তব্যের কিছুদিন পর অর্থাৎ, ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে করাচিতে পাকিস্তান এডুকেশনাল কনফারেন্স থেকে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো দাবি জানানো হয়। বাংলাভাষী বা বাংলা অঞ্চলের বসবাসকারী তথাকথিত বিশিষ্টগণের কেউ কেউ তাতে সমর্থনও দিলেন। এটাকে ভিত্তি ধরে সাধারণ মানুষের মতামতকে তোয়াক্কা না করে কেন্দ্রের কাজকর্মে, পোস্ট কার্ড, মনি অর্ডার ফরম ইত্যাদিতে উর্দুর প্রচলন হয়ে যায়। পূর্ববঙ্গে কর্মরত মোহাজের জাতিউৎসাহী দেশিয় কর্মচারীরা শুদ্ধ-অশুদ্ধ উর্দুতে ‘বাতচিত’ এবং চাষাভুষা ও শিক্ষিত বাঙালিদের প্রতি নাক সিটকানো শুরু করে। এত দ্রুত উর্দুর দাবিকে কার্যকরী করাও ‘পাকিস্তানি’ জাতি সৃষ্টির সাথে নিশ্চয়ই একটি যোগসূত্র ছিল। হয়তো সেদিন মানুষের সরলতা, মোহাচ্ছন্নতা বা শিরশ্ছেদের হুমকির কারণে তা উদঘাটিত হয়নি।
দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন এবং সে ভিত্তিতে পাকিস্তান অর্জিতও হয়েছিল। দ্বি-জাতিতত্ত্বের মূল কথা ছিল ভারতের মুসলমানরা একটা স্বতন্ত্র জাতি এবং হিন্দুরা আর একটি স্বতন্ত্র জাতি। পাকিস্তান অর্জনের আগেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কায়েদে আযম বা বাবা-ই-মিল্লাত অর্থাৎ, জাতির পিতা হয়ে গেলেন আর ভারতে হলো মি. গান্ধী। মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিল না কারণ নির্দ্বিধায় তিনি ভারতীয় জাতির পিতা হিসাবে বরেণ্য হলেন; সমস্যা দেখা দিল জিন্নাহকে নিয়ে। জিন্নাহ কোন বিচারে মুসলমান জাতির পিতা হবেন?
পাকিস্তান আন্দোলনের বহু বহু আগেই শুধু ভারতে নয় সারা বিশ্বে মুসলমানের বসবাস রয়েছে এবং যারা মুসলমানকে জাতি হিসাবে বিবেচনা করে তারাও কোন যুক্তিতে জিন্নাহকে মুসলমান জাতির পিতা বলবেন? চতুর জিন্নাহকে জাতির পিতা থাকতেই হবে বলেই রাতারাতি তিনি একটি জাতিরও জন্ম দিয়ে বসলেন। এই পাকিস্তানি জাতি সৃষ্টির প্রয়াসে ‘উর্দু’ নামক একটি ভাষাকে পাকিস্তানের সব মানুষের ভাষা বানাতে স্বার্থান্ধ মহল প্রয়াসী হলো। উর্দুর পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে পরবর্তীতে মি. জিন্নাহ পাকিস্তানি পরিচয় ঘুচিয়ে মুসলমান পরিচিতি পুনঃআমদানি করেছিলেন। সেটাও কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। মি. জিন্নাহ ও তার সহযোগীদের অতিরিক্ত উর্দু প্রীতির কারণেই গণপ্রতিনিধিদের কোনো সিদ্ধান্ত বা সম্মতি ছাড়াই পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকে উর্দু ইংরেজির স্থান গ্রহণ করতে শুরু করে।
এই বিষয়টি বাঙালিদের মনঃপূত হয়নি বলে সেদিনের গণপরিষদের সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা প্রশ্নে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি মুলতবি প্রস্তাব আনয়ন করেন। তিনি যুক্তি-তর্কে এ কথা প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে অন্তত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা না হোক অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে গ্রহণ সমুচিত হবে। সেখানে তাকে যারা সমর্থন করলেন তারা হলেন প্রেম হরি বর্মা, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত, শিরীষ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং তাকে বিরোধিতা করলেন লিয়াকত আলী খান, নাজিমুদ্দিনসহ মুসলমান সদস্যগণ।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মুলতবি প্রস্তাবটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভাজন ও মুসলমান মুসলমানের দূরত্ব সৃষ্টির প্রয়াস বলে লিয়াকত আলী গং তা বাতিল করে দিলেন। পরিষদের বাইরে কিন্তু এই বিতর্ক আলোড়ন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। একে কেন্দ্র করে ছাত্র গণবিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করলে ২৯ ফেব্রুয়ারি অনেককেই গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি আবেগের বলে তাতে সব ধরনের ছাত্র-তরুণের সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা গেল। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১১ মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালন করে। সেদিন ১৪ ব্যক্তি আহত ও ৬৫ জন গ্রেফতার হলো। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পূর্ব পর্যন্ত এই ১১ মার্চ ‘ভাষা দিবস’ হিসাবে পালিত হতো। ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভায় আবারও ধীরেন্দ্র দত্ত ভিন্নরূপে ভাষা প্রশ্নটি নিয়ে আসেন। তিনজন হিন্দু সদস্য ও নয়জন মুসলমান সদস্য ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ব্যাপারে বক্তব্য রাখেন। ‘বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা’ হিসাবে আনীত প্রস্তাবটিও মুসলিম লীগের কারণে গৃহীত হলো না।
১৯৪৮ সালে পূর্ববঙ্গ সফরে এসে মি. জিন্নাহ একুশে মার্চ লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে ‘উর্দু’ এবং উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে’ বলে দম্ভোক্তি করেন। ভাষা সংগ্রামকে তিনি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন বলে অস্পষ্ট ইঙ্গিত রাখেন। এই সভায় তিনি সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বাঙালি ইত্যাদি জাতিসত্তার বিলোপ ঘটিয়ে আবারও সবাইকে মুসলমান হিসাবে আখ্যায়িত করেন। তিনি হিন্দু ও দালাল মুসলমানদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেই তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মীসহ গুণ্ডা-বদমায়েশদের উসকে দেন। ২৪ মার্চ ছাত্রদের এক সমাবেশে তিনি ভাষা প্রশ্নে একই কথা উচ্চারণ করলে ছাত্র-নেতারা ‘না-না’ ধ্বনি তুলে তার উক্তিকে তলিয়ে দেন। সেদিনই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে ।
১৯৪৮ সালের ২৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে মি. জিন্নাহ উর্দুর প্রশ্নে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেও বাংলা ভাষার প্রশ্নে তার অবস্থান অস্পষ্ট রেখে যান। পরবর্তীতে ঘরে বাইরে বৈরিতার শিকার হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন লিয়াকত আলী-নাজিমুদ্দীনদের পোয়াবারো। ১৯৪৯ সালের ১৪ আগস্ট থেকে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় বহুমাত্রায় বেড়ে যায়। বাংলা ভাষাকে মুসলমানিকরণ ও সরলীকরলের প্রচেষ্টা ও তাকে রোমান হরফে লেখার প্রস্তাবের ভিতর দিয়ে কৌশলে তার বিলুপ্তি প্রচেষ্টাটি সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই কোরাসে যারা শরিক হন তারা হলেন পূর্ববঙ্গের মোহাজের সম্প্রদায়, পুলিশের এক ডিআইজি, নাজিমুদ্দীন, ফজলুর রহমান প্রমুখ।

উর্দুভাষী বাঙালি ফজলুর রহমান ১৯৫১ সালের ১৫ এপ্রিল ‘মাহে নও’ পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে উর্দুর পক্ষে জোরালো বক্তব্য উত্থাপন করেন। অপরদিকে পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা মাঠের আন্দোলনে ও কাগজের লেখায় বাংলাকে হয় পাকিস্তানের একমাত্র ভাষা, না হয় অন্যতম ভাষা ও কমপক্ষে প্রদেশের ভাষা হিসাবে গ্রহণের দাবি জানিয়ে যেতে থাকে। এসবের মাধ্যমে যে উত্তাপ সৃষ্টি হচ্ছিল তাতে তদানীন্তন ‘সংবাদ’ ও ‘মর্নিং নিউজ’ সরকারি পক্ষে এবং সিলেটের ‘নও বেলাল’ ও ঢাকার ‘অবজার্ভার’ ভাষা আন্দোলনকারীদের পক্ষে গতিবেগ সঞ্চার করে। এ সময় কতিপয় প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের জন্ম ও রাজনৈতিক দলের বিকাশপর্ব শুরু হয়। এই পর্যায়ে অনেক ‘ভাষা সৈনিক’ তাদের কতিপয় পূর্বসূরির মতো নিজেদের গুটাতে শুরু করে।
১৯৫২ সালের ২৮ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন কর্তৃক জিন্নাহর মতোই উস্কানিমূলক বক্তব্যের রেশ ধরে ৩০ জানুয়ারি আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ গঠিত হয় যা পরবর্তীতে কাজী গোলাম মাহবুবের নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ নামে আবির্ভূত হয়। সে বছর ১১ মার্চ ভাষা দিবস পালনের প্রস্তুতিকালে সরকার, সরকারি দল মুসলিম লীগ এবং সরকার সমর্থক পত্রিকাগুলো অতিশয় বৈরী অবস্থান গ্রহণ করে।
মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের ভারতের দালাল, হিন্দুর চর, কমিউনিস্ট এবং পাকিস্তান ও মুসলমানের শত্রু আখ্যায়িত করে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়। এই পর্বে তথাকথিত ভাষা সৈনিকদের কেউ নিষ্প্রভ বা কেউবা বিস্মৃতির অতলে চলে যান এবং অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানি প্রভুদের কোলে আশ্রয় নিতে শুরু করে। ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনের শিখাটি যারা প্রজ্বলিত রেখেছিল তারা হলো বামপন্থি বা আওয়ামী লীগের মতো মধ্যমপন্থিরা। মার্শাল ল’য়ের মধ্যেও তাদের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়। তবে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন পরবর্তী অভিজ্ঞতা, ৯২ক ধারা, ইস্কান্দার-আইয়ুবের সামরিক শাসন, জাতিগত নিপীড়ন, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং পাকিস্তানি বশংবদ সৃষ্টির ঘৃণ্য অপকৌশলের উলঙ্গ প্রয়োগ ভাষা আন্দোলনকারীদের একাংশকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। ভাষা আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার হলেও তার চরিত্র বদলাতে থাকে এবং ১৯৬৬ সালের দিকে বাঙালি ধারার একাংশ পাকিস্তানবিরোধী ও স্বাধীনতা প্রত্যাশী হয়ে দাঁড়ায়। এরপর থেকে প্রতিবছর একুশের চেহারা ও চেতনা বদলে যেতে থাকে।
১৯৬৯ সালে এসে ভাষা আন্দোলন আর ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১১ দফা আন্দোলন ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙালি ধারা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে ১৯৭১ সালে মাটির অধিকার আন্দোলনে বাম-মধ্যমদের বিভক্তির নিরসন টেনে হাজার বছরের বিশাল অর্জন স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনে। ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী ইতিহাসের এই নাতিদীর্ঘ বর্ণনা একটি কথাকে স্পষ্ট করে যে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ধারার বিভিন্ন লক্ষ্য ছিল। ভাষা আন্দোলনের যে ধারাটি এটাকে একটি ‘End’ হিসাবে বিবেচনা করেছিল, তারা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পর তার প্রয়োগ ও উৎকর্ষের কাজে হাত দেয়।
রেনেসাঁ সোসাইটি ও তমদ্দুন মজলিসকে এই দলে ফেলা হয়। তারা পাকিস্তানের কাঠামোতে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানের ভাষা বাংলাকে সংস্কৃতের কবল থেকে উদ্ধার করে আরবি ফারসি উর্দু দিয়ে সমৃদ্ধ করতে চায়। তাদের দৃষ্টিতে মনোবিজ্ঞানীর সামগ্রিকতা অনুপস্থিত ছিল। এদের কাছা কাছি কিছু ব্যক্তি বন্ধু বেশে ভাষা আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার জন্য কারও এজেন্ট বা পোষ্য হিসেবে অবস্থান করে। তাদেরকে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও তাদের তস্য দালাল পাকিস্তানের গুপ্তচর হিসাবেই চিহ্নিত করা যায়।
ভাষা আন্দোলনের আর একটি স্রোত আন্দোলনটি একটি ‘Means’ হিসাবে গ্রহণ করে। তাদের একটি উপধারা পাকিস্তানের সকল জাতিসত্তার সাবলীল বিকাশে ভাষার ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে একটি মানবিক পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখত। নিঃসন্দেহে গোপন কমিউনিস্ট পার্টি, যুবলীগ পরবর্তীতে ন্যাপ ছাত্র ইউনিয়ন এবং সেকালের গণতন্ত্রী পার্টি, এই উপধারায় ছিল। তারা পাকিস্তানের প্রতিটি জাতিসত্তার অস্তিত্বসহ তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবনবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাই তারা বাংলাকে পূর্ব বাংলার এবং উর্দুকে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা না বলে সব জাতিসত্তার ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবি জানায়। এই ধারার কেউ কেউ অবশ্য উর্দুকে পশ্চিম পাকিস্তানের এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত ছিল। ভাষা আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসন পর্যন্ত এগিয়ে নিতে সম্মত হলেও তাকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দেবার পক্ষপাতী প্রথমদিকে তারা মোটেই ছিল না।
এই ধারার আর একটি উপধারা ছিল উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী অংশ। তাদের কেউ কেউ বাংলাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে আগ্রহী ছিল। কেউ কেউ অবশ্য উর্দুকে পশ্চিম পাকিস্তানের এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি আদায় করে ইংরেজিকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষায় বহাল রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। এ দুটো স্রোত বাদ দিলে ভাষা আন্দোলনকারী শক্তির একাংশ প্রথম থেকেই একে একটি চূড়ান্ত গন্তব্যে নিয়ে যাবার প্রত্যাশী ছিল। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগের একাংশের কথাই এখানে বলা হচ্ছে। প্রথমদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল মনসুর আহমদ, আবদুস সালাম খান প্রমুখের প্রচণ্ড দাপটে তারা মনের কথাটি প্রকাশ করতে পারেননি। তবে ক্রমশ উপরিউক্ত উপধারাটা বাস্তবতা ও তারুণ্যের আঘাতে দুর্বল হয়ে যায়, শেখ মুজিবের নেতৃত্ব মেনে নেয় বা তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ন্যাপের কিয়দংশও প্রকাশ্যে বা গোপনে তাঁর সাথে স্থান খুঁজে নেয় বা ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন বাঙালি যে ধারাটির কথা বললাম তারা বাস্তবতার কষাঘাতে উপলব্ধি করেছিল যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের নিজস্ব পরিচিতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক মানবিক জীবনবোধ ও শোষণহীন সমাজ স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই তার ৬ দফাকে প্রকাশ্যে রাখলেও প্রতিটি পদক্ষেপে শেখ মুজিব এক দফার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতিহাস বলছে যে বঙ্গবন্ধু এই অগ্রযাত্রায় তার এককালের সহকর্মী এবং পরবর্তীতে ভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানকারীদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় একাকার করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা নয়, শুধু বাংলা ভাষার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাঙালির সুপ্তিভঙ্গের কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছিল।
লেখক: অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির ফেলো

কাজী আরেফ আহমেদ ছিলেন পরিপূর্ণ এক সংগ্রামী নেতা। ক্ষমতার মোহ তাকে কখনোই আচ্ছন্ন করতে পারেনি। একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তিনি দেশের রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তার মৃত্যুদিবসে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।
৫ দিন আগে
আমাদের চোখের সামনে বহু রূপে বর্ণচোরা নতুন খোলস পরে চারপাশে সুশীল কিংবা শক্তিধর সেজে দাঁড়াবে— স্বদেশ-স্বাধীনতা, একাত্তরের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছরের রাষ্ট্র বাংলাদেশের গৌরবময় মাহাত্ম্য ও অর্জনের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস-ঘৃণা ছড়াবে— এই কলঙ্ক তারা ঢাকবে কীভাবে?
৮ দিন আগে
গণভোট ও জনরায় কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো এবং নাগরিকদের রাজনৈতিক আস্থা নিশ্চিত হতে পারে। ফলে দেশের জনগণ সচেতনভাবে, আবেগতাড়িত না হয়ে যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
১০ দিন আগে
ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অতি লোভনীয় উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশ কি বহির্শক্তির খেলার মাঠে পরিণত হবে, নাকি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় একাট্টা হয়ে নিজেদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিকার নিজেরাই করবে— তা নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।
১০ দিন আগে