গণশুনানির নামে নাটক চলছে কি আগের ধারায়?

রুহিন হোসেন প্রিন্স

সার, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানির দাম যুক্তিহীনভাবে বাড়ানোর প্রক্রিয়া কি অব্যাহত থাকবে?

একসময় আগ্রহ নিয়ে, জেনে-শুনে, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অন্যান্য বিষয়ে মূল্য নির্ধারণের জন্য আয়োজিত গণশুনানিতে অংশ নিয়েছি। যুক্তিসঙ্গতভাবে আমরা অনেকে কথা বলেছি। অধিকাংশ সময় সাধারণ মানুষের স্বার্থে বলা আমাদের যুক্তি গ্রহণ করা না হলেও প্রচারমাধ্যমের সহায়তায় আমাদের বক্তব্য আগ্রহীরা জানতে পেরেছেন। জনমত গড়ে ওঠায় সরকার কখনো কখনো পিছু হটেছে।

বিগত সরকারের সময় এসব বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় আমরা অনেক সময় প্রতিবাদ জানিয়ে গণশুনানিতে যাইনি। অনেকের আশা ছিল, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে গণশুনানি করবে। কিন্তু না— তা হলো না। সরকার অতীতের কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারী সরকারের পথেই হাঁটছে।

সম্প্রতি গণশুনানি না করেই সরকারি কোম্পানির তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গণশুনানিতে ন্যায্য ও যৌক্তিক প্রমাণিত না হলেও তারা জেট ফুয়েল বিক্রিতে পদ্মা তেল কোম্পানির চার্জহার বাড়িয়েছে।

একইভাবে নতুন শিল্প ও বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণে বর্ধিত গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে শিল্পভোক্তারা জ্বালানি সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এমনকি জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষমতার বৈধ ব্যবহার না করে বিইআরসি নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, এতে ভোক্তা স্বার্থ ও অধিকার বিপন্ন হয়েছে।

এই কথাগুলো আমরা আরও আগে থেকেই বলে আসছি। এবার কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) লিখিতভাবে সেগুলো আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

শুধু তাই নয়, ক্যাব বিইআরসি আইন ২০০৩-এর ধারা ২২(খ), ৩৪(৪) ও ৩৪(৬) লঙ্ঘন এবং ভোক্তা স্বার্থ ও অধিকার খর্ব করার অভিযোগে বিইআরসি চেয়ারম্যান ও সব সদস্যকে ওই আইনের ধারা ১১ অনুযায়ী অপসারণ এবং ৪২ ধারা অনুযায়ী শাস্তির দাবি জানিয়ে গত ৩১ জুলাই রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়েছে। এ বিষয়ে আমরা একমত।

ফলস্বরূপ, বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গণশুনানিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্যাব। আমরাও যাইনি। সব মিলিয়ে বিইআরসি ও গণশুনানি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

কিন্তু দাম বাড়িয়ে কৃষকসহ সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হয়তো চলতেই থাকবে। জনগণের প্রতিরোধ গড়ে না ওঠা পর্যন্ত এই লুটপাট থামবে না। যে লুটপাটনির্ভর পুঁজিবাদী অর্থনীতির ধারায় দেশ চলছে— এটাই তার অনিবার্য পরিণতি।

সারের দাম বৃদ্ধি, আগামীতে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব জনজীবনে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনে, সংকটকে আরও গভীর করবে— এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

সরকারি তথ্যই বলছে, দেশের প্রতি চারজনের একজন বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। এই দারিদ্র্যের হার কি বেড়েই চলবে?

নাকি এ বাস্তবতাকে ঠেকিয়ে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য সমাজ বিপ্লবের পথে হাঁটব?

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মব-সহিংসতা চিরতরে নির্মূলে করণীয়

এমন অদ্ভুত আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের বরখেলাপ আমাদের আবারও অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমরা কি এমন গণতান্ত্রিক সরকার চেয়েছিলাম, যারা অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই মব-সন্ত্রাসীদের কাছে নতজানু থাকবে? সরকার কি ভুলে গেছে, একটি ঘটনায় প্রশাসনের নতজানু অবস্থা আরও বহু ঘটনার পথ প্রশস

৯ দিন আগে

যুদ্ধ থামলেও তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর অর্থ আরও স্পষ্ট— যুদ্ধের সামরিক উত্তাপ কমলেও অর্থনৈতিক অভিঘাত অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে। সাধারণ ভোক্তার জন্য এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

১১ দিন আগে

মেধা ও রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক

রাষ্ট্র পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদরা; তাদের সহায়তা করে প্রশাসন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস; আর নীতিগত সুবিধা অনেকাংশে পায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই ত্রিমুখী কাঠামোর ভেতরে মেধাবী ছাত্রদের অবস্থান কোথায়— এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

১১ দিন আগে

সরকারি প্রাথমিকে অনলাইন ক্লাস চালু করা কতটা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশের জনগণের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত। তাদের অধিকাংশই সাধারণ মোবাইল ব্যবহার করে। অপরদিকে ওয়াই-ফাই সকলের বাসা-বাড়িতে নেই। এ অবস্থায় নানা আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে সাধারণ মানুষের সন্তানদের অনলাইন ক্লাস করা বিঘ্নিত হবে।

১৫ দিন আগে