প্রাথমিকে বৃত্তি পরীক্ষা বনাম মেধা যাচাই: কেন এই হঠকারিতা?

জাকির আহমদ খান কামাল

প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, নান্দনিক ও আবেগিক বিকাশ ঘটানো এবং তাদের মধ্যে দেশাত্মবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সৃজনশীলতা তৈরি করা— যেন তারা একটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে ও আজীবন শিখতে আগ্রহী হয়। এটি তাদের মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি উন্নত জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক স্তরে বৃত্তি পরীক্ষা ও মেধা যাচাই নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেনগুলোর মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কখনো বৃত্তি পরীক্ষা বাতিল, কখনো পুনর্বহাল— এই দোদুল্যমান সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক— সবার মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি করছে। প্রশ্ন জাগে, কেন এই হঠকারিতা? যদিও প্রকাশ্যে বোঝা যায়, হাইকোর্টে মামলাজনিত কারণে এ বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিশুদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে— এমন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন আগেই সতর্ক হলো না?

বৃত্তি পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের অনেক শিশুর জন্য বৃত্তির অর্থ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম ভরসা। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যনিষ্ঠ হতে সাহায্য করে— এমন যুক্তিও রয়েছে বৃত্তি পরীক্ষার পক্ষে।

বিপরীতে এমন অভিযোগও রয়েছে— কিন্ডারগার্টেন, কোচিং বাণিজ্য, গাইডবই আর নম্বরের দৌড়ে শৈশবের আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষাভীতি কমিয়ে শিশুর প্রকৃত শিখন দক্ষতা ও আচরণগত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাই ছিল ধারাবাহিক মূল্যায়নের উদ্দেশ্য।

ধারাবাহিক মূল্যায়নকে কার্যকর করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মানসম্মত নির্দেশিকা ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু দুর্বল বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং মূল্যায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে এই পদ্ধতিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কাগুজে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।

যদিও ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পেছনে যুক্তি ছিল আরও মানবিক, তবু এতে অভিভাবকদের আস্থা কমেছে এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মান যাচাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

সমস্যা আসলে বৃত্তি পরীক্ষা, মেধা যাচাই বা ধারাবাহিক মূল্যায়ন— কোনটি ভালো, সেটি সমস্যা নয়; সমস্যা নীতি নির্ধারণের অসঙ্গতি ও হঠকারী সিদ্ধান্তে। শিক্ষা নীতিতে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবন কোনো পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে না। বারবার পদ্ধতি বদলানো সংগত নয়; এতে অভিভাবকেরা দিকনির্দেশনা হারান এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা।

প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রথমত একটি সুস্পষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রয়োজন। বৃত্তি পরীক্ষা থাকলে তা সীমিত, মানবিক ও চাপমুক্ত হতে হবে— যেখানে মুখস্থ নয়, বোঝাপড়া ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন হবে।

সর্বোপরি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা জরুরি।

শিশুর শৈশব রক্ষা করে, সমান সুযোগ নিশ্চিত করে এবং মানসম্মত শিক্ষা দেওয়াই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়— চাই দূরদর্শী, স্থিতিশীল ও মানবিক শিক্ষা নীতি।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা

কেউ কেউ বলেছেন, শেখ মুজিব হেয়ালি পরিহার করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় যদি সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তাহলে পাকিস্তানের অপ্রস্তুতির সুযোগ নিয়ে আমরা আরও কম জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুর বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম। কী হতো জানি না, তবে বিতর্ক না বাড়িয়ে অনুমান করা যায়— এটি হতো হঠকারী আচরণের নব সংযোজন এবং তার

৫ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: প্রবাসী শ্রমবাজার সুরক্ষায় কূটনৈতিক প্রস্তুতি জরুরি

এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও বৈদেশিক আয় কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে আঞ্চলিক যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত, ভিসা নবায়নে জটিলতা, প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রত্যাবাসনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্র

৫ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ‘সার-বিদ্যুৎ রাজনীতি’: ইতিহাস কি আবার ফিরে আসছে?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময়গুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বড় যুদ্ধের সময়কাল মিলে গেছে, যার প্রভাব দেশের কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে অনুভূত হয়েছে। ফলে এসব সংকটকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।

৬ দিন আগে

বেলুচ সমস্যা ও তার সমাধান

বেলুচরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও স্বাধীনচেতা। ইংরেজ আমলেও তাদের শাসন করা হতো পরোক্ষ স্বাধীনতা বা সমঝোতার মাধ্যমে। এই পরোক্ষ স্বাধীনতার অর্থ ‘পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন’ও হতে পারে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কালে তার মর্যাদা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের। কিছুদিন পর একে অনেকটা বলপূর্বক পাকিস্তানের অংশ করে নেওয়া

৭ দিন আগে