ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন

তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ উন্মোচন

আজাদ খান ভাসানী

গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে গড়ে ওঠা আধুনিক বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক— এ প্রশ্ন আজ তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব ও নির্মম। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নকে আবারও নির্মমভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বলপ্রয়োগে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের এক ভয়াবহ ও জঘন্য নজির। এটি কেবল ভেনেজুয়েলার ওপর হামলা নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।

আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী থাবায় গোটা বিশ্ব আজ ক্ষতবিক্ষত। ভোরে ডেল্টা ফোর্সের অতর্কিত অভিযানে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া এবং পরে তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটিয়ে নেওয়ার দৃশ্য বিশ্ববাসীকে হতবাক, বিস্মিত ও শঙ্কিত করেছে।

একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে চোর-ডাকাতের মতো প্রকাশ্যে অপমান করা কতটা অমর্যাদাকর ও বর্বর, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে— আমেরিকা নিজেই আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা আমাদের শেখায় সব রাষ্ট্র সমান, সবার সার্বভৌমত্ব সমানভাবে সম্মানযোগ্য। জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার স্পষ্টভাবে বলে দেয়, কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ একটি গুরুতর অপরাধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এসব আইন-কানুন কেবল দুর্বল ও নির্ভরশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্যই প্রযোজ্য, শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য নয়। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ আবারও প্রমাণ করে— আন্তর্জাতিক আইন আসলে ক্ষমতাবানদের স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ার মাত্র।

আজ ভেনেজুয়েলা, কাল কে? এ প্রশ্ন কেবল আবেগের নয়, বরং ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাম্রাজ্যবাদ কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। আজ তেল, কাল গ্যাস, পরশু পানি কিংবা কৌশলগত ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে যেখানেই স্বার্থ, সেখানেই আগ্রাসন। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ যে এই আগ্রাসনের অন্যতম প্রধান কারণ, তা আজ আর গোপন নয়। ‘গণতন্ত্র রক্ষা’, ‘মানবাধিকার’ কিংবা ‘স্থিতিশীলতা’— এসব শব্দ আসলে লুণ্ঠন ও দখলদারিত্বের মুখোশ মাত্র।

ইতিহাসে এমন আগ্রাসনের নজির নতুন নয়। পানামার শাসক জেনারেল নরিয়েগাকে অপহরণ করে বন্দি করা, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে নাটক সাজিয়ে গ্রেপ্তার ও পরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা— সবই আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের ধারাবাহিক ইতিহাস। ভেনেজুয়েলা সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ অধ্যায় মাত্র।

আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা— বিশ্বের কোনো অঞ্চলই আজ এ আগ্রাসন থেকে নিরাপদ নয়। কখনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কখনো রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, কখনো অভ্যুত্থান, আবার কখনো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ— এগুলোই সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির চেনা কৌশল। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগের পর সর্বশেষ সরাসরি বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, যা সাম্রাজ্যবাদের নগ্নতম প্রকাশ।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কেবল ভেনেজুয়েলার জনগণই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেও প্রতিবাদ উঠেছে। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপকে প্রকাশ্যে ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বহু মানবাধিকার কর্মী ও বুদ্ধিজীবী প্রশ্ন তুলেছেন— একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কীভাবে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পদদলিত করতে পারে?

এ প্রতিবাদ প্রমাণ করে, আমেরিকার জনগণ ও শাসকগোষ্ঠী এক নয়। সাম্রাজ্যবাদী সিদ্ধান্ত আসে একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাধর এলিট শ্রেণি থেকে। আরও উদ্বেগজনক হলো— যুক্তরাষ্ট্রের ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবি— তারা ভেনেজুয়েলার ‘দায়িত্ব নেবে’। প্রশ্ন হলো— এই দায়িত্ব তাদের কে দিয়েছে? কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা? কোন গণভোট? নাকি কেবল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির জোরেই তারা নিজেদের বিশ্বশাসক মনে করছে?

গণতন্ত্রের মৌলিক শিক্ষা হলো— একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার কেবল সেই দেশের জনগণের। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে জনগণের কোনো মূল্য নেই। সেখানে কেবল সম্পদ ও কৌশলগত স্বার্থই মুখ্য। এ প্রেক্ষাপটে শান্তি ও মানবাধিকারের ফেরিওয়ালাদের দ্বিচারিতাও নগ্ন হয়ে ওঠে।

বিশ্ব শান্তি নোবেল পুরস্কার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যখন শান্তির নামে বন্ধুত্বের অভিনয় করা হয়, আর সুযোগ পেলে সেই সম্পর্ককেই ব্যবহার করা হয় আধিপত্য বিস্তারের কাজে, তখন শান্তি আর শান্তি থাকে না। তা হয়ে ওঠে সাম্রাজ্য বিস্তারের কৌশল।

অন্যদিকে ইসরাইল নামক ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্রটি গত দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনে যে নজিরবিহীন গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তির নিরঙ্কুশ সমর্থন এই সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রকেই আরও স্পষ্ট করে। প্রশ্ন জাগে— এই বর্বরতা রুখার মতো কি বিশ্বে আর কেউ নেই?

আজ বিশ্ব কার্যত সাম্রাজ্যবাদের কব্জায় বন্দি। মুক্তির বার্তা কে দেবে? এ প্রশ্ন আমাদের নিয়ে যায় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর কাছে। তিনি বলেছিলেন, ‘বর্তমানে কোনো কোনো শক্তি একদিকে স্বাধীনতা ও শান্তির বড় বড় বুলি আউরাচ্ছে, অপরদিকে তারাই অন্য দেশের স্বাধীনতা-আন্দোলন দমন, আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ, ক্রমাগত সরকার উৎখাত, সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক হামলায় নিয়োজিত রয়েছে। এখন আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, নতুন ও পুরনো উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনসমূহকে সক্রিয় ও সম্মিলিত সমর্থন দান করা।’

পরিশেষে বলা যায়, ভেনেজুয়েলার ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে— এই বিশ্বব্যবস্থা আসলে কার জন্য? যদি আন্তর্জাতিক আইন কেবল শক্তিশালীদের রক্ষা করে, যদি সার্বভৌমত্ব কেবল কাগুজে শব্দে পরিণত হয়, তবে এই ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি কোথায়?

আজ সময়ের দাবি বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত ও স্বাধীনতাকামী মানুষের ঐক্য। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ভেনেজুয়েলার পক্ষে দাঁড়ানো মানে কেবল একটি দেশের পক্ষে দাঁড়ানো নয়; এটি বিশ্বব্যাপী ন্যায়, সার্বভৌমত্ব ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানো। নইলে আগামী দিনে আরও অনেক দেশ, আরও অনেক মানুষ এই বর্বরতার শিকার হবে। আর আমরা রয়ে যাব ইতিহাসের নীরব দর্শক হয়ে।

লেখক: সদস্য সচিব, ভাসানী পরিষদ

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

এলপিজি সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অসহায় সরকার ও জনগণ

প্রশ্ন জাগে— তাদের দাবি কী? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?

৮ দিন আগে

গণভোট ২০২৬: কী ও কেন?

‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যাতে দেশে বিদ্যমান সক্রিয় প্রায় সব দল সই করেছে। যেহেতু সংবিধান হলো ‘উইল অব দ্য পিপল’ বা জনগণের চরম অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি, তাই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জনগণের সম্মতি বা গণভোট আয়ো

৮ দিন আগে

বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তি ও নৈতিকতা

ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত থেকেও নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষায় সচেতন অবস্থান নিয়েছে (European Council on Foreign Relations, ২০২৩)। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা জরুরি।

৮ দিন আগে

নতুন বাংলাদেশ: দায়িত্বশীল রাজনীতি ও সচেতন নাগরিকত্ব

এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকেই আসে ‘নতুন বাংলাদেশে’র ধারণা। এটি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার, একটি সামাজিক চুক্তি— যেখানে রাষ্ট্র হবে মানুষের সেবক, প্রভু নয়।

১০ দিন আগে