
ড. বদিউল আলম মজুমদার

বহু প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন ও পরবর্তী সময়ে বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পরও বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। নির্বাচনি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিগত ১৫ বছর দেশে গেড়ে বসেছিল এক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায় বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন।
রাষ্ট্র মেরামতের জনআকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার গঠন করে ১১টি সংস্কার কমিশন। এর মধ্যে প্রথম গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে তিন দফা আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, যার ভিত্তিতে প্রণীত হয় আগামীর বাংলাদেশের পথরেখা ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। এরই মধ্যে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে।
জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোট হবে। বাকি ৩৬টি সংস্কার প্রস্তাব অধ্যাদেশ ও বিধি প্রণয়ন কিংবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করা হবে।
গণভোট (Referendum) এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট আইন, নীতি বা সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে তাদের মতামত সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ করে।
গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধিদের পরিবর্তে নিজেরা সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। এটি গণতন্ত্রের একটি রূপ, যেখানে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা সরাসরি প্রয়োগ করা হয়, বিশেষ করে দেশের মৌলিক কাঠামো বা বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে।
সংক্ষেপে, গণভোট হলো জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সরাসরি রায় দেওয়ার একটি পদ্ধতি।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যাতে দেশে বিদ্যমান সক্রিয় প্রায় সব দল সই করেছে। যেহেতু সংবিধান হলো ‘উইল অব দ্য পিপল’ বা জনগণের চরম অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি, তাই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জনগণের সম্মতি বা গণভোট আয়োজন করা প্রয়োজন।
গণভোটে ভোটারদের কাছে প্রশ্ন থাকবে— ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’
সবগুলো বিষয়ের জন্য একবারে উত্তর দিতে হবে একটিই— ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।
১ নম্বর প্রশ্ন: নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
২ নম্বর প্রশ্ন: আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
৩ নম্বর প্রশ্ন: সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে— সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
৪ নম্বর প্রশ্ন: জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদের অন্তর্ভুক্ত কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটের নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত যে ৩৬টি সংস্কার আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়িত হবে, সেগুলো এই নিবন্ধের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয় বিধায় এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
নাগরিক সংগঠন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) মনে করে, বাংলাদেশ আজ গণতান্ত্রিক যাত্রার ক্ষেত্রে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে স্বৈরাচারী সরকারকে হঠাতে প্রায় ১৪ শ মানুষ প্রাণ দিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে। ছাত্র-জনতার এ গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনাই করেনি, এটি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জাগরণ, তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার এক তীব্র বিস্ফোরণ।
আমাদের তরুণেরা শহর-নগর-গ্রাম সর্বত্র লাখো দেয়ালে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে তারা নতুন এক বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে অবিচার-বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতা থাকবে না। তারা চায় অংশগ্রহণ, মর্যাদা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।
তাই বাংলাদেশের জন্য আজ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, দরকার গণতান্ত্রিক উত্তরণ। যার জন্য দরকার কতগুলো আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক নীতি ও মূল্যবোধের পরিবর্তন।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ সংস্কারের সে রকম একটি রূপরেখা, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখা। এই দলিলে রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে—
‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রকাশিত জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারা এই মর্মে অঙ্গীকার ও ঘোষণা করছি যে—
নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নে তাদের অঙ্গীকারগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। তাদের কাছ থেকে অস্পষ্টতা বা বেছে বেছে গ্রহণযোগ্যতা (selective acceptance) আর গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
জুলাই জাতীয় সনদ জনগণের রাজপথের আন্দোলন, বিপুল আত্মত্যাগ ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনাপ্রসূত হতাশার বিপরীতে রাজপথের ঐক্যের প্রতীক হয়ে জন্ম নেওয়া একটি সামাজিক চুক্তি। এর প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবনাগুলো রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৪৮টি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর ওপর আসন্ন গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোট দিতে আহ্বান করবে, তা রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট করতে হবে।
এ ছাড়া জুলাই সনদের অন্য ৩৬টি সংস্কার প্রস্তাব যেগুলো আইন বা বিধি কিংবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করা যাবে সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারেও দলগুলোকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
একইভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে দলগুলো কী কী উদ্যোগ নেবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখাও দলের ইশতেহারে থাকা দরকার, যেন কোন দল কোন কোন সংস্কার বাস্তবায়নে বিশেষ উদ্যোগ নেবে এবং কোন কোন দল সংস্কারের ব্যাপারে আন্তরিক তা জনগণ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে।
আমরা মনে করি, গণভোট কী, এটি কীভাবে ও কোন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে এবং এর তাৎপর্য কী— এসব বিষয়ে জনগণের মধ্যে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। তাই গণভোট সম্পর্কে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করা আবশ্যক, যেন জনগণ জেনেবুঝে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
আমাদের প্রত্যাশা, যেহেতু দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, তাই তারাও গণভোটের ব্যাপারে জনগণ সচেতন করার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
দেশের মানুষ এখন আর কেবল আলোচনা নয়, সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চায়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ আর বিলম্বিত করা যাবে না। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় আমরা রাজনৈতিক দলসহ সবার সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করি।
[৭ জানুয়ারি রাজধানীর সিরডাপে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে উত্থাপনের জন্য তৈরি নিবন্ধ]
লেখক: প্রধান নির্বাহী, সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)

বহু প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন ও পরবর্তী সময়ে বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পরও বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। নির্বাচনি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিগত ১৫ বছর দেশে গেড়ে বসেছিল এক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায় বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন।
রাষ্ট্র মেরামতের জনআকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার গঠন করে ১১টি সংস্কার কমিশন। এর মধ্যে প্রথম গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে তিন দফা আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, যার ভিত্তিতে প্রণীত হয় আগামীর বাংলাদেশের পথরেখা ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। এরই মধ্যে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে।
জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোট হবে। বাকি ৩৬টি সংস্কার প্রস্তাব অধ্যাদেশ ও বিধি প্রণয়ন কিংবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করা হবে।
গণভোট (Referendum) এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট আইন, নীতি বা সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে তাদের মতামত সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ করে।
গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধিদের পরিবর্তে নিজেরা সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। এটি গণতন্ত্রের একটি রূপ, যেখানে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা সরাসরি প্রয়োগ করা হয়, বিশেষ করে দেশের মৌলিক কাঠামো বা বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে।
সংক্ষেপে, গণভোট হলো জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সরাসরি রায় দেওয়ার একটি পদ্ধতি।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যাতে দেশে বিদ্যমান সক্রিয় প্রায় সব দল সই করেছে। যেহেতু সংবিধান হলো ‘উইল অব দ্য পিপল’ বা জনগণের চরম অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি, তাই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জনগণের সম্মতি বা গণভোট আয়োজন করা প্রয়োজন।
গণভোটে ভোটারদের কাছে প্রশ্ন থাকবে— ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’
সবগুলো বিষয়ের জন্য একবারে উত্তর দিতে হবে একটিই— ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।
১ নম্বর প্রশ্ন: নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
২ নম্বর প্রশ্ন: আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
৩ নম্বর প্রশ্ন: সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে— সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
৪ নম্বর প্রশ্ন: জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদের অন্তর্ভুক্ত কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটের নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত যে ৩৬টি সংস্কার আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়িত হবে, সেগুলো এই নিবন্ধের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয় বিধায় এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
নাগরিক সংগঠন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) মনে করে, বাংলাদেশ আজ গণতান্ত্রিক যাত্রার ক্ষেত্রে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে স্বৈরাচারী সরকারকে হঠাতে প্রায় ১৪ শ মানুষ প্রাণ দিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে। ছাত্র-জনতার এ গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনাই করেনি, এটি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জাগরণ, তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার এক তীব্র বিস্ফোরণ।
আমাদের তরুণেরা শহর-নগর-গ্রাম সর্বত্র লাখো দেয়ালে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে তারা নতুন এক বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে অবিচার-বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতা থাকবে না। তারা চায় অংশগ্রহণ, মর্যাদা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।
তাই বাংলাদেশের জন্য আজ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, দরকার গণতান্ত্রিক উত্তরণ। যার জন্য দরকার কতগুলো আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক নীতি ও মূল্যবোধের পরিবর্তন।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ সংস্কারের সে রকম একটি রূপরেখা, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখা। এই দলিলে রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে—
‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রকাশিত জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারা এই মর্মে অঙ্গীকার ও ঘোষণা করছি যে—
নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নে তাদের অঙ্গীকারগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। তাদের কাছ থেকে অস্পষ্টতা বা বেছে বেছে গ্রহণযোগ্যতা (selective acceptance) আর গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
জুলাই জাতীয় সনদ জনগণের রাজপথের আন্দোলন, বিপুল আত্মত্যাগ ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনাপ্রসূত হতাশার বিপরীতে রাজপথের ঐক্যের প্রতীক হয়ে জন্ম নেওয়া একটি সামাজিক চুক্তি। এর প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবনাগুলো রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৪৮টি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর ওপর আসন্ন গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোট দিতে আহ্বান করবে, তা রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট করতে হবে।
এ ছাড়া জুলাই সনদের অন্য ৩৬টি সংস্কার প্রস্তাব যেগুলো আইন বা বিধি কিংবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করা যাবে সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারেও দলগুলোকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
একইভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে দলগুলো কী কী উদ্যোগ নেবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখাও দলের ইশতেহারে থাকা দরকার, যেন কোন দল কোন কোন সংস্কার বাস্তবায়নে বিশেষ উদ্যোগ নেবে এবং কোন কোন দল সংস্কারের ব্যাপারে আন্তরিক তা জনগণ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে।
আমরা মনে করি, গণভোট কী, এটি কীভাবে ও কোন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে এবং এর তাৎপর্য কী— এসব বিষয়ে জনগণের মধ্যে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। তাই গণভোট সম্পর্কে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করা আবশ্যক, যেন জনগণ জেনেবুঝে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
আমাদের প্রত্যাশা, যেহেতু দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, তাই তারাও গণভোটের ব্যাপারে জনগণ সচেতন করার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
দেশের মানুষ এখন আর কেবল আলোচনা নয়, সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চায়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ আর বিলম্বিত করা যাবে না। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় আমরা রাজনৈতিক দলসহ সবার সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করি।
[৭ জানুয়ারি রাজধানীর সিরডাপে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে উত্থাপনের জন্য তৈরি নিবন্ধ]
লেখক: প্রধান নির্বাহী, সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)

আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে, আইনকে পদদলিত করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে, সেই দৃশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিরই নগ্ন বহির্প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।
৩ দিন আগে
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কখনো বৃত্তি পরীক্ষা বাতিল, কখনো পুনর্বহাল— এই দোদুল্যমান সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক— সবার মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি করছে। প্রশ্ন জাগে, কেন এই হঠকারিতা? যদিও প্রকাশ্যে বোঝা যায়, হাইকোর্টে মামলাজনিত কারণে এ বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিশুদের মনে বিরূপ প্রভাব ফ
৫ দিন আগে
শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা বহির্জগতের নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত দুর্বলতা। লোভ, হিংসা, অহংকার, প্রতিশোধস্পৃহা, ক্ষমতার মোহ এবং অন্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। এই প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ না করলে কোনো রাষ্ট্র, কোনো ধর্মীয় আহ্বান কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাই স্থায়ী শান্
৭ দিন আগে
বর্তমানের নারী রাজনীতিকরাও যদি জেলা বা জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সুযোগ ও উৎসাহ পান, তারাও একইভাবে সফল হতে পারবেন। এই পরিবর্তনের জন্য নারী আন্দোলনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। দলগুলোর ভেতরে থাকা নারী নেত্রীরা একাকী লড়াই করে পেরে উঠছেন না, তাই বাইরে থেকে আমাদের মতো সংগঠনগুলোরা সমর্থন তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
৭ দিন আগে