ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন: অনিরাপদ বিশ্ব

এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

বিশ্বের যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র— মানবতা ও মানবাধিকারের কথা বলে গলা ফাটালেও প্রকৃত অর্থে মানবতা ও মানবাধিকারের শত্রু বলেই বিশ্ববাসী মনে করে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’ নামক রাষ্ট্রটিকে। তাদের সামরিক আগ্রাসনে বারবার বিশ্ব বিপর্যস্ত হয়েছে। নিজেদের স্বার্থে তারা বহু রাষ্ট্রকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ওই সব রাষ্ট্রে লুটের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন আগ্রাসনের কারণে মানবতা ও মানবাধিকার আজ ধুঁকে ধুঁকে কেঁদে মরছে। মানবতা ধ্বংস ও দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে। এই সুপার পাওয়ার হওয়ার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে, আইনকে পদদলিত করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে, সেই দৃশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিরই নগ্ন বহির্প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।

আগ্রাসী নীতির নজিরবিহীন এ ঘটনা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন, তেমনি ঘটনাটি বৃহৎ রাষ্ট্রের যা খুশি তা করার বিপজ্জনক এক দৃষ্টান্ত হিসেবেই থেকে যাবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নগ্ন হামলা ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অশান্তি ও গৃহযুদ্ধের হুমকি এবং লাতিন আমেরিকাজুড়ে সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত অজুহাত অগ্রহণযোগ্য। ব্যবসায়িক বাস্তববাদের ওপর আদর্শিক বৈরিতা জয়লাভ করেছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে আনতে গিয়ে স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বিমানঘাঁটি, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে ব্যাপক হামলা চালান। এ হামলায় সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে মাদুরোর আটকাবস্থার ছবি প্রকাশ করেছেন। পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি ভেনেজুয়েলায় ন্যায়সঙ্গতভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত সরকার পরিচালনার ও ভেনেজুয়েলার তেলখনিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলোকে পাঠানোর ঘোষণা দেন।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে চোখ বাঁধা, কানে হেডফোন লাগানো, হাতে হাতকড়া ও কোমরে বেঁধে এক রাষ্ট্রের বৈধ প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া— এই দৃশ্য কি মানবতা ও মানবাধিকারের দৃষ্টান্ত বহন করে? নাকি মধ্যযুগীয় কোনো সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের দৃশ্য?

দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো— এটি আজকের তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর এক ভয়ংকর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মূর্ত প্রতীক। এই দৃশ্য সরাসরি ক্ষমতা বদলের ঘোষণা শুধু লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য একটি অশনিসংকেত ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তারা মাদুরোকে ছাড়বে না। এমনকি ততদিন দেশটির শাসনভারও কার্যত তারাই দেখভাল করবে— অনেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো।

একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে এভাবে আটক করার ঘটনা নজিরবিহীন। তবে এই হামলা ও গ্রেপ্তার ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাসের তীব্র চাপ প্রয়োগের ধারাবাহিকতারই অংশ। গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলার উপকূলে বড় আকারের নৌ বহর মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে নৌ যানে বিমান হামলা চালানো হয় এবং ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয়।

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অপরাধী চক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’সহ কয়েকটি গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ক্যারিবীয় সাগরে কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু হয়। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাংকার জব্দ এবং দেশটির চারপাশে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়।

মূলত ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখলের উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা চালিয়েছে বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ভেনেজুয়েলার ওপর চালানো এই বিমান হামলা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উদ্ধত আচরণের নগ্ন বহির্প্রকাশ। হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন আবারও নগ্ন শক্তির আশ্রয় নিয়েছে।

এই আগ্রাসন দেশটির জনগণের স্বাধীন ইচ্ছা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি আঘাত। এ হামলায় ভেনেজুয়েলার কারাকাস ও দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীনতার সর্বজনস্বীকৃত নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।

এ ধরনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলবে এবং লাখ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসীর জীবন বিপন্ন করবে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।

গত কয়েক মাস যাবৎ ভেনেজুয়েলা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র আসে— এমন অভিযোগে ভেনেজুয়েলার নৌ যানে হামলা, তেলবাহী জাহাজ আটক থেকে শুরু করে ক্যারিবীয় সাগরে রণতরি মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় এই ঘটনা ঘটিয়েছে— তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঠিক একইভাবে ইরাকে নিউক্লিয়ার অস্ত্র রয়েছে বলে মিথ্যা প্রেক্ষাপট তৈরি করে ইরাকে হামলা করা হয়েছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের লাতিন আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক ডেনিয়েল শ বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা ভিয়েতনাম বা ইরাক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে যেতে পারে। ভেনেজুয়েলার জনগণ কখনোই বিদেশি শাসন মেনে নেবে না।’

ডেনিয়েলের মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর দেশটিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যেকোনো প্রচেষ্টা তীব্র প্রতিরোধের জন্ম দেবে এবং এটি ভিয়েতনাম বা ইরাকের মতো একধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।’

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘ সময় ধরে ভেনেজুয়েলায় কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে, তবে পরিস্থিতি ডেভিড বনাম গোলিয়াথের মতো হয়ে উঠতে বাধ্য। সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি এগিয়ে থাকলেও ভেনেজুয়েলায় বিক্ষোভ ও গণআন্দোলনের পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গেরিলা প্রতিরোধের ছোট ছোট কেন্দ্র গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া বা কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তির সংহতি প্রকাশ কিংবা আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা এককভাবে এই পরিস্থিতি বদলাতে পারবে না।

সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর বেআইনি আক্রমণ চালিয়ে ভেনেজুয়েলা শাসন করার যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে যোগ হয়েছে আরও একটি ভয়াবহ প্রতিশ্রুতি— ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের কার্যকর ‘সমাধান’ করবে ওয়াশিংটন।

প্রশ্ন উঠেছে— এটি কি আন্তর্জাতিক আইন? নাকি খোলামেলা দখলদারিত্ব? জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব— এসব শব্দ কি এখন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রযোজ্য? আমেরিকা তার সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টা এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য পরিচিত। এটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্পষ্ট প্রকাশ, যা ব্ল্যাকমেইল এবং রাজনৈতিক হুমকি থেকে শুরু করে অবশেষে দেশে গণতন্ত্র সংরক্ষণের নামে ভেনেজুয়েলার সরকারকে উৎখাত করে।

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর শাসনকে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসন বলার অবকাশ নেই। তার সরকারের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র নস্যাতের অভিযোগ আছে। কিন্তু স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভেনেজুয়েলার সরকার কে পরিচালনা করবে, কোন পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পরিচালিত হবে— তা নির্ধারণ করার পূর্ণ অধিকার ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের; কোনো বৃহৎ শক্তির নয়। বাইরে থেকে হস্তক্ষেপ করে ও হামলা চালিয়ে সরকার পরিবর্তন আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই হামলাকে মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসনের হামলাকে নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদ বলে অভিহিত করেছেন।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার নামে হোক বা সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে হোক— বিশ্বের দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও শাসন পরিবর্তনের দীর্ঘ নগ্ন ইতিহাস রয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য মূলত ওই সব রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠন করা।

বর্তমান বিশ্বে প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও এর পশ্চিমা মিত্ররা সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে পরোক্ষ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। যদিও ইতিহাস প্রমাণ করে, সম্পদ দখলের এই নব্য উপনিবেশবাদী নগ্ন প্রচেষ্টা কখনোই সফলতা পায়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই মার্কিনিদের পশ্চাদপসরণ ও পরাজয়ের অপমানজনক ইতিহাস রয়েছে। অনেক অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রক্তপাত ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এর খেসারত সেই অঞ্চল ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বকেই শোধ করতে হয়েছে।

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাসও ভয়াবহ, কলঙ্কময় ও বিষাদময়। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় সেই অন্ধকার যুগের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব আরও অনিরাপদ অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। জাতিসংঘসহ সমগ্র গণতান্ত্রিক বিশ্বের উচিত এই নির্লজ্জ আগ্রাসনের নিন্দা জানানো ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ভেনেজুয়েলার জনগণকেই ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভাগ্যের নির্ধারক হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে তথাকথিত নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবেই ভেঙে ফেলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলোর রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে।

ভেনেজুয়েলার জনগণের ওপর এই মার্কিন আগ্রাসন ও তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর সরাসরি আক্রমণ, তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যতের ওপর বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা। এটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বেআইনি এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের জীবন ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে অবৈধ।

ভেনেজুয়েলা তার বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের মজুত ও প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য পরিচিত, যা এটিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ভেনেজুয়েলা শাসনের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি পুতুল শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়— নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মাউরিসিও সান্তোরো মনে করেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশের ওপর প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এ অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছিল।’

ওই কৌশলপত্রে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ‘সম্প্রসারণের’ আহ্বান জানানো হয়েছে এবং একে মনরো ডকট্রিনে ‘ট্রাম্প কোরোলারি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মনরো ডকট্রিন হলো ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত ‘আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা’ নীতি, যা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল কথা ছিল— নিয়ম সবার জন্য সমান হবে, শক্তিশালীর ইচ্ছাই শেষ কথা নয়। অথচ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মূলত ‘শক্তিই ন্যায়’— এই পুরোনো বাস্তবতাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।

ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একে ‘স্বাধীনতার লড়াই’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

মাদুরো আটক হলেও ভেনেজুয়েলার সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা নাকি এককালীন অভিযান— তা স্পষ্ট নয়। এদিকে বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রকে দেশে গণঅভ্যুত্থানে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। এসব কারণে লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ ডগলাস ফারাহ মনে করেন, ‘ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলার পর দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, যার কোনো স্পষ্ট সমাধান থাকবে না।’

ভেনেজুয়েলায় হামলায় নিহত শত শত সাধারণ নাগরিক এরই মধ্যেই এর মূল্য চুকিয়েছেন। মূল্য চুকাতে হবে আরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে, যারা এই দীর্ঘকালীন মিশ্র যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকতে চাইছে। এই যুদ্ধ গত দুই দশক ধরে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী চরিত্র এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রতি তাদের অবজ্ঞাকে উন্মোচিত করেছে।

একই সঙ্গে এ ঘটনা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ‘অথর্ব’ চরিত্রকেও সামনে এনেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর এখনই ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে দাঁড়ানো উচিত। মাদকের অজুহাতে এই হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করা এবং প্রতিক্রিয়াশীল ধনিক-অলিগার্ক শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া।

লেখক: রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মাথা নত করেননি বলেই তিনি হারেননি

রাজনীতি তার কাছে পেশা ছিল না, ছিল আত্মত্যাগের পথ। তিনি দেখিয়েছেন— নারীর শক্তি স্লোগানে নয়, সংকটে প্রকাশ পায়। ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং প্রতিকূলতাই তাকে গড়ে তুলেছে একজন দেশনেত্রী হিসেবে। তাকে বলা হয় গণতন্ত্রের মা— ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রচিন্তার বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার কারণে

৭ দিন আগে

খালেদা জিয়া: রাজনীতির ‘মাইলফলক’

ইতিহাসে সত্যিই এ এক বিরল সাহসী ও দেশপ্রেমিক পরিবার, যার স্বামী একজন দেশবরেণ্য, বিশ্বনন্দিত রাষ্ট্রনায়ক এবং মুক্তিযুদ্ধে বীর সেক্টর কমান্ডার। সেই মা দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের জননী, তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তাদের জ্যেষ্ঠপুত্র আগামীর রাষ্ট্রনেতা, যিনি দেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বিএনপির ভ

৮ দিন আগে

দেশপ্রেমের জন্য খালেদা জিয়ার নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে

খালেদা জিয়ার এই দীর্ঘ পথচলাকে আমি মূল্যায়ন করি তার গভীর দেশপ্রেম দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিটি সংগ্রামে তার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলতেন, ‘এ দেশই আমার ঠিকানা, আর এ দেশের জনগণই আমার আত্মীয়।’

৮ দিন আগে

ক্যাম্পাসে ছাত্র প্রতিনিধিদের এখতিয়ারবহির্ভূত তৎপরতা বন্ধ হোক

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক যেমন ওসমান হাদি হত্যার বিচার চেয়েছে, তেমনি উত্তাল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দঙ্গল পাকিয়ে অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধের প্রতিটি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এ বিবৃতির মাধ্যমে আমরা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিদের এখতিয়ারবহির্ভূত কার্যক্রমে

১০ দিন আগে