জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি

বিপিসির শূন্য ভাণ্ডার, রাজস্বের ফাঁদ এবং বিপন্ন অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা

মনোয়ার মোস্তফা
বিপিসির শূন্য ভাণ্ডার, রাজস্বের ফাঁদ এবং বিপন্ন অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা

গত রাতে দেশে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সাত মাস বয়সী বর্তমান সরকারের আমলে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জ্বালানি তেলভেদে দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।

একটি দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। ফলে এই বিপুল মাত্রায় দাম বৃদ্ধির অভিঘাত অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে কতটা মারাত্মক হবে, তা সহজেই বোধগম্য। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধির কথা বলা হলেও এর পেছনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতিগত ব্যর্থতাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

মূল্যস্ফীতির অক্টোপাস ও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বৃদ্ধি নয়, বরং এটি একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তেলের দাম বাড়ার প্রথম ও সরাসরি প্রভাব পড়ে নানা ধরনের উৎপাদন ও বিশেষ করে পরিবহন খাতে। পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অর্থ— কৃষকের মাঠ থেকে শুরু করে পাইকারি বাজার হয়ে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যাওয়া।

পাশাপাশি গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচকে এমন একপর্যায়ে নিয়ে যায়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সীমিত আয়ের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করে। কৃষি খাতে সেচের খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয়— সবকিছুই জ্বালানির দামের ওপর নির্ভরশীল। এমনিতেই দীর্ঘ সময় ধরে দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত, তার ওপর নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্ববাজারের দোহাই বনাম বিপিসির আয়-ব্যয়ের খতিয়ান

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার বরাবরই যে যুক্তিটি সামনে নিয়ে আসে, তা হলো আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি। এ কথা ঠিক, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান যুদ্ধাবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সারা বিশ্বেই তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যার প্রকৃতি ও গভীরতা খানিকটা ভিন্ন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) গত এক দশকের আর্থিক খতিয়ান পর্যালোচনা করলে একটি চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। গত ১০ বছর ধরে বিপিসি মুনাফার রেকর্ড গড়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪৮ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এবং এই ১০ বছরের মধ্যে ৯ বছরই তারা লাভের মুখ দেখেছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— এত বিপুল পরিমাণ মুনাফা করার পরও সামান্য আন্তর্জাতিক সংকটে কেন বিপিসিকে সাধারণ মানুষের কাঁধে দামের বোঝা চাপাতে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সরকারের একটি আত্মঘাতী আইনের মধ্যে।

রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ জব্দের আইন

২০২০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবহৃত বা উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে নিয়ে আসার জন্য একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করে। আইনটির আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধাস্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানশিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন, ২০২০’।

এই আইনে বলা হয়, দেশের ৬১টি স্বশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও করপোরেশনের (যেমন— বিপিসি, পেট্রোবাংলা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি) ব্যাংকে জমে থাকা অতিরিক্ত অলস অর্থ একটি নির্দিষ্ট হিসাব শেষে তিন মাসের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এই আইনের বাধ্যবাধকতায় বিপিসি তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে মোট ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে বাধ্য হয়।

সমস্যাটি তৈরি হয় ঠিক এর পরপরই। ২০২১-২২ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আচমকা বেড়ে যায় এবং পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিপিসির আর্থিক অবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। আগের জমানো মুনাফার টাকা সরকারি কোষাগারে চলে যাওয়ায় বিপিসি কোনো ‘বাফার’ বা আপৎকালীন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পায়নি।

এ অবস্থায় ২০২১-২২ অর্থবছরের পর থেকে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা থাকা সত্ত্বেও বিপিসি আর নতুন করে কোনো উদ্বৃত্ত অর্থ কোষাগারে জমা দিতে পারেনি। উলটো বিশ্ববাজারে চড়া দামে তেল কিনে দেশে কম দামে বিক্রির (ভর্তুকি মূল্যে) কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিপিসিকে বড় অঙ্কের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সংকটের মুখে পড়তে হয়। নিজেদের জমানো টাকা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ফলে বিপিসি আজ আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য পরিবর্তনেও অসহায় হয়ে পড়ে।

রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস যখন আমদানি করা জ্বালানি তেল

বিপিসির অর্থ সরকারের কোষাগারে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আরও একটি বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত করের বোঝা। জ্বালানি তেলের দামের একটি বড় অংশই হলো সরকার-আরোপিত নানা ধরনের শুল্ক ও কর। আমদানি করা জ্বালানি তেল থেকে সরকারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতিবছর প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমানে এক লিটার ডিজেলের ওপর সামগ্রিক করের পরিমাণ প্রায় ৩১ দশমিক ৮৫ টাকা। একইভাবে অকটেন ও পেট্রোলের ওপর যথাক্রমে ২৮ দশমিক ১৮ শতাংশ ও ফার্নেস অয়েলের ওপর ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপিত রয়েছে। অর্থাৎ, ভোক্তারা যে দামে তেল কিনছেন, তার একটি বিশাল অংশ সরাসরি সরকারের কোষাগারে কর হিসেবে চলে যাচ্ছে।

নীতিগত বৈপরীত্য: কৌশলগত পণ্য নাকি আয়ের উৎস?

বিশ্ববাজারে যখন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয়, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন দেশের বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার সাধারণত আমদানি শুল্ক বা ভ্যাট কমিয়ে দেয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্র্যাটেজিক’ বা কৌশলগত পণ্যের ক্ষেত্রে সরকার এই কাজটি কখনোই করে না। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও সরকার দেশীয় ভ্যাট বা ট্যাক্সের হারে কোনো পরিবর্তন আনে না বা ছাড় দেয় না।

সরকার যদি জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত এই বিশাল পরিমাণের কর কিছুটাও কমিয়ে দিত, তবে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশের ভেতরে তেলের দাম এতটা বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সরকার তা করে না, কারণ জ্বালানি খাতকে তারা সাধারণ মানুষের সেবার পরিবর্তে রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করে।

একটি কৌশলগত পণ্যকে এভাবে কেবল আয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত অত্যন্ত ভয়াবহ হতে বাধ্য।

বহুমাত্রিক অভিঘাত ও আশু করণীয়

জ্বালানি তেলের এই দামবৃদ্ধিতে কেবল অর্থনীতিই সংকুচিত হবে না, এর সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাতও হবে সুদূরপ্রসারী। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন সেটি রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নিতে খুব বেশি সময় লাগে না। একটি দেশের সরকার কেবল রাজস্ব আয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে এভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে না।

অতএব, বর্তমান সরকারের উচিত হবে সামগ্রিক বাস্তবতা অনুধাবন করে অবিলম্বে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা। বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে ও বিপিসির শূন্য ভাণ্ডারের দায়ভার সাধারণ জনগণের কাঁধে না চাপিয়ে তেলের ওপর থেকে অতিরিক্ত শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঘোড়াকে থামাতে হলে জ্বালানি তেলের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। সরকারের উচিত হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা।

লেখক: উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষক

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement
বিপিসির শূন্য ভাণ্ডার, রাজস্বের ফাঁদ এবং বিপন্ন অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা