শিশু সহিংসতা ঠেকাতে শুধু শাস্তি নয়, দরকার জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ

খবরগুলো এখন বেদনাদায়কভাবে পরিচিত। দেশের এক প্রান্তে একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, অন্য প্রান্তে আরেকজন পরিচিত বা অপরিচিত কারও হাতে নির্যাতিত হয়। আরেকজন নিখোঁজ হয়, পরে মেলে তার মরদেহ। জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে, কয়েক দিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলে। তারপর সেই জায়গা দখল করে নেয় আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতার সংখ্যাগুলো বলছে, এগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে আমরা বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ১৯২টি শিশু ধর্ষণ এবং আরও ১০৫টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। একই সময়ে নানা ধরনের সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ১৯৫টি শিশু, যাদের ২১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
মূলত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও আসকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি এই পরিসংখ্যান শিশুর প্রতি সহিংসতার প্রকৃত ব্যাপকতা তুলে ধরতে পারে না। কিন্তু যতটুকু বলে, তা-ই যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এ ঘটনাগুলোকে প্রধানত আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার আমাদের প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক।
অপরাধীদের অবশ্যই তদন্তের আওতায় আনতে হবে, বিচার করতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। বিচারহীনতা সহিংসতাকে আরও উসকে দেয়। আর যে সার্বভৌম দেশের বিচারব্যবস্থা শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটিতে ব্যর্থ। কিন্তু শুধু শাস্তি দিয়ে শিশুদের প্রতি চলতে থাকা এই সহিংসতা ঠেকানো যাবে না। বরং শিশুদের প্রতি সহিংসতা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে এটিকে একটি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি কেন জরুরি
এই দৃষ্টিভঙ্গিটি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী— দুই পক্ষই মূলত অপেক্ষা করে একজন ভিকটিম বা ভুক্তভোগী তার কাছে আসার জন্য, যাতে প্রয়োজনীয় সেবা অথবা সহায়তা দেওয়া যায়। জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেলথ সেখানে মূলত জানতে চায়, মানুষটি ভুক্তভোগী হলো কেন এবং তা ঠেকানোর কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
যেকোনো সমস্যার বিস্তার ও বণ্টন বোঝা, ঝুঁকি বাড়ায় এমন পরিস্থিতি চিহ্নিত করা, ক্ষতি হওয়ার আগেই হস্তক্ষেপ করা এবং সেই হস্তক্ষেপ আদৌ কাজ করছে কি না তা যাচাই করা—এটাই জনস্বাস্থ্যের পদ্ধতি। শিশুর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি।
এই ঘটনাগুলো ঠেকানোর দায়িত্ব কেবল পুলিশ ও আদালতের নয়। এখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানগুলোরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমরা হয়তো ভুলে যাই, ভয়ংকর ও ব্যাপক এক ধরনের সহিংসতাকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নিজেরই আছে।
অ্যাসিড সহিংসতা দমনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা
নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজারের শুরুর বাংলাদেশ যাদের মনে আছে, তারা জানেন অ্যাসিড নিক্ষেপের কথা— যে সহিংসতা একসময় প্রায় অনিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে হতো। অ্যাসিড সারভাইভরস ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০০২ সালে অ্যাসিড সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন ৪৯৬ জন; ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৮-এ।
এই পতন আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, কিংবা কারও কোনো একক উদ্যোগের ফলও নয়। এই সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার একসঙ্গে কয়েকটি দিক থেকে পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর একদিকে ছিল আইনি প্রতিকার। ২০০২ সালে প্রণীত হয় অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ও অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন। একটি অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া কঠোর করে, অন্যটি অ্যাসিডের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে।
অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর পাশাপাশি কাজ করেছে, যাতে ভুক্তভোগীরা চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা পান। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনায় ধরে রেখেছে এবং সামাজিক সংগঠনগুলো অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারাভিযান চালিয়ে গেছে। এই সমন্বিত চেষ্টারই ফলাফল হলো, বাংলাদেশ আজ অ্যাসিড সন্ত্রাস মোকাবিলায় একটি সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত।
এই ঘটনাটি উল্লেখ করছি কারণ এর থেকে আজকের জন্য আমাদের শিক্ষা স্পষ্ট: রাজনৈতিক অঙ্গীকার যখন সমন্বিত পদক্ষেপে রূপ নেয় এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে— এবং সহিংসতার সুযোগ তৈরি করে এমন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জোরালো জনমত গড়ে তোলা যায়, তখন যেকোনো সহিংসতা, সেটা যতই বিস্তৃত হোক না কেন, প্রতিরোধ করা যায়।
ক্ষোভ পেরিয়ে প্রতিরোধে যেতে হবে
প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে, শিশুর প্রতি সহিংসতা আর অ্যাসিড সন্ত্রাস কোনোভাবেই একই নয়। শিশুর প্রতি সহিংসতার পেছনে রয়েছে পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আরও অনেক জটিল নিয়ামক। সে কারণে অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত পদক্ষেপগুলো হুবহু অনুকরণ করলে এর সমাধান হবে না।
কিন্তু মূল নীতিটি আমরা অবশ্যই অনুসরণ করতে পারি: কোথায় এবং কেন শিশুরা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঝুঁকিতে, তা বোঝা এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর বদলে আগেই সহিংসতা ঠেকানোর পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের উদ্যোগগুলো আদৌ কাজ করছে কি না। কাজ না করলে ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বলতে এটাই বোঝায়।
নিচের পদক্ষেপগুলো বিশ্ব জুড়ে শিশু সহিংসতা প্রতিরোধে প্রমাণিত পদ্ধতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এগুলোর কয়েকটি আবার বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা ও সক্ষমতার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এগুলোকে একটি সুসংহত জাতীয় প্রতিরোধ কৌশলে রূপ দেওয়া।
প্রথমত, শিশুদের ওপর সহিংসতার একটি সমন্বিত চিত্র তৈরি করতে হবে। শিশুর প্রতি সহিংসতার কোনো সমন্বিত চিত্র আমাদের হাতে নেই। পুলিশের নথিতে ওঠে সেসব ঘটনা, যেগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত পৌঁছায়; হাসপাতাল দেখে ভিন্ন একটি অংশ; সমাজসেবা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দেখে আরেক অংশ। অনেক ঘটনা কোনো নথিতেই ওঠে না।
শিশুরা সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে কোথায় রয়েছে, বাংলাদেশকে তা জানতে হবে। সরকারের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই উৎসগুলোকে যুক্ত করা, যেখানে তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে বয়স, লিঙ্গ, এলাকা, সহিংসতার ধরন, ঘটনাস্থল এবং অভিযুক্তের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক অনুযায়ী।
যেহেতু জবাবদিহি ছাড়া শুধু তথ্য পরিমাপে বিশেষ কোনো লাভ হয় না, তাই এর সঙ্গে প্রয়োজন জাতীয় শিশু সুরক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা। সেখানে থাকবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক, শিক্ষা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; সম্পৃক্ত থাকবে স্থানীয় সরকার।
এই কর্তৃপক্ষের থাকতে হবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং শিশু সুরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ, যাতে সংগ্রহ করা প্রতিটি তথ্য বা ঘটনা পরিপূর্ণভাবে তদন্ত, রেফারেল ও ফলোআপ পর্যন্ত গড়ায়।
আবাসিক মাদরাসা, বোর্ডিং স্কুল, এতিমখানাসহ সব আবাসিক প্রতিষ্ঠানকে চলতে হবে বাধ্যতামূলক সুরক্ষা ও নিবন্ধনের শর্তে। এই শর্তের মধ্যে থাকতে হবে কর্মী নিয়োগে যাচাই ও প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধানের মান, আচরণবিধি, শিশুদের জন্য গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন পরিদর্শন। গুরুতর বা বারবার শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে থাকতে হবে কার্যকর শাস্তির বিধান।
এই প্রসঙ্গে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন সামনে আসে: কিছু পরিবারের হাতে বিকল্প এত কম কেন? আবাসিক শিশু পরিচর্যা নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানে শিশু পাঠানোর পেছনে সুরক্ষার প্রয়োজনের চেয়ে দারিদ্র্যই বেশি কাজ করে। আর প্রতিষ্ঠানে থাকা অনেক শিশুর বাবা-মা জীবিত, যারা যথাযথ সহায়তা পেলে সন্তানকে নিজেদের কাছেই রাখতে পারতেন।
তাই নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী পারিবারিক ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমও প্রয়োজন। দারিদ্র্যের কারণে কোনো পরিবারকে যেন ঘরে বঞ্চনা আর এমন এক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেছে নিতে না হয়, যার নিরাপত্তা সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।
দ্বিতীয়ত, যেসব প্রতিষ্ঠানে শিশুরা থাকে, সেগুলোকে নিরাপদ করতে হবে। আবাসিক মাদরাসায় থাকা শিশুদের যৌন নির্যাতনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো উদ্বেগজনক। তবে এর প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় শিক্ষাকে কলঙ্কিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কেবল এক ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে এনে বাকিগুলো ছেড়ে দেওয়াও সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
এখানে যে মূলনীতিটি সরকারকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সেটা হলো: যে প্রতিষ্ঠান শিশুদের থাকার দায়িত্ব নেয়, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বও তারই।
তৃতীয়ত, শিশু সুরক্ষাকে কমিউনিটি পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশ আগেও এটি করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি মাঠকর্মীদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে হাসপাতাল আর সরকারি দপ্তরের গণ্ডি পেরিয়ে সেবা পৌঁছে দিয়েছিল ঘরে ঘরে। শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানোর সেই সক্ষমতা দরকার। আর এটি তৈরি করতে হবে নতুন কোনো ক্যাডার বা আমলাতন্ত্র তৈরি করে নয়, বরং বিদ্যমান সমাজসেবা জনবলকে শক্তিশালী ও পেশাদার করে তুলে।
কাজটি আসলে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ইউনিসেফ ও আরও কিছু উন্নয়ন সহযোগীদের সাহায্যে বাংলাদেশ শিশু সুরক্ষায় সমাজকর্মীর সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং কমিউনিটিভিত্তিক শিশু সুরক্ষা হাব গড়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক তথ্যপ্রমাণ বলছে, এসব হাব সুরক্ষাসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে এবং বেশ কিছু ধরনের সহিংসতা ও ক্ষতিকর চর্চা কমিয়েছে।
কমিউনিটি পর্যায়ের শক্তিশালী জনবল বাড়তি ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করতে পারে, পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, প্রয়োজনে রেফার করতে পারে এবং প্রথম অভিযোগের পর হারিয়ে যেতে পারত এমন ঘটনাগুলোর খোঁজ রাখতে পারে।
চতুর্থত, এই দায়িত্ব কেবল সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। অ্যাসিড সহিংসতা কমেছিল এ কারণেই যে সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ অপরাধটিকে জনমানুষের কাছে ক্রমশ অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে দরকার শুধু গতানুগতিক সচেতনতা বৃদ্ধি নয়, বরং যেসব পরিস্থিতি শিশু নির্যাতনকে আড়ালে রাখে, তার বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক তৎপরতা।
কোনো ঘটনা জেনেও কিছু না বলা, সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয় পাওয়া, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা, প্রতিষ্ঠানের গোপন করার প্রবণতা— এই বিষয়গুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে মানুষের মনে ‘অভিযোগ জানিয়ে লাভ নেই’— এই বিশ্বাসটি গেঁড়ে যেতে না পারে। এই জনমত তৈরিতে শিশু অধিকার সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, সংবাদমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও কমিউনিটি সংগঠন সবারই ভূমিকা আছে।
একই সঙ্গে শিশুদেরও শেখাতে হবে কোন আচরণ অনিরাপদ এবং যেকোনো সমস্যা বা বিপদে কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে, কোনো ভয় না করেই। এই আলোচনায় ছেলেদেরও রাখতে হবে। পুরুষত্ব, অধিকারবোধ ও ক্ষমতা ঘিরে ক্ষতিকর সামাজিক ধারণাগুলো স্পর্শ না করে অনন্তকাল মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোকে প্রতিরোধ বলা যায় না।
বিচারব্যবস্থা প্রতিরোধের বিকল্প নয়
সবশেষে, ওপরের কোনো কিছুই ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং কার্যকর প্রতিরোধ দেশের বিচারব্যবস্থার ওপরই নির্ভরশীল। তবে ক্রমাগত কঠোরতর শাস্তির দাবি কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো শাস্তি দেওয়ার উদ্যোগকে প্রতিরোধের কৌশল ভেবে নেওয়া ঠিক হবে না।
শিশুসংক্রান্ত মামলায় দরকার প্রশিক্ষিত তদন্তকারী, দ্রুত ফরেনসিক ও চিকিৎসা সহায়তা, ভীতি প্রদর্শন থেকে সুরক্ষা এবং এমন বিচারপ্রক্রিয়া, যা উল্লেখযোগ্যভাবে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে পারে। প্রতিটি মামলা অভিযোগ দায়েরের পর থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত বিশেষায়িত সেল বা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অনুসরণ করা দরকার, যাতে সরকার দেখতে পায় মামলাগুলো কোথায় গিয়ে ঝুলে যাচ্ছে বা হারিয়ে যাচ্ছে।
একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থার শক্তি কেবল আইনে লেখা শাস্তির কঠোরতায় নয়; বরং অপরাধটি ধরা পড়ার, দক্ষভাবে তদন্ত হওয়ার এবং ন্যায্যভাবে বিচার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানোতেই থাকে।
নতুন সরকারের সামনে সুযোগ আছে কোনো ঘটনা ঘটার পর দেওয়া স্রেফ কোনো প্রতিশ্রুতির বদলে শিশু সুরক্ষাকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করার। এর অর্থ শিশুর প্রতি সহিংসতা কমানোর সুস্পষ্ট জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ, সরকারের ভেতরে দায়িত্ব বণ্টন, অগ্রগতির সূচক প্রকাশ এবং ফলাফলের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটি ঘটনার পর আমাদের প্রশ্নটাই বদলাতে হবে। ‘যে এটি করেছে তাকে কীভাবে শাস্তি দেবো?’— এর বদলে প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘এটি যাতে না ঘটে, সেজন্য আমরা কী করতে পারতাম?’ সহিংসতার মহামারি আমরা আগেও মোকাবিলা করেছি। আমি বিশ্বাস করি, আমরা আবারও তা করতে পারব।
লেখক: জুনায়েদ আহসান, পিএইচডি, সহকারী অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ লিডারশিপ অ্যান্ড প্র্যাকটিস, ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিল, যুক্তরাষ্ট্র


















-eb944a-256x144.webp)




