ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু—তারা আচরণ করেছেন যমজ ভাইয়ের মতো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনে নিজের এজেন্ডা অনুযায়ী গণহত্যা চালিয়ে গেছেন এবং হামলা চালিয়েছেন লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে। দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা ও পদ্ধতি ছিল এক। এখন মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তাঁরা একই রাজনৈতিক পরাজয়ের ভাগীদার হলেন।
২৭ অক্টোবর ইসরায়েলিরা ভোট দেন। নেতানিয়াহুর জোট পায় ৫৩টি আসন, সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে আটটি কম। ৩ নভেম্বর ভোট দেন আমেরিকানরা। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি হারায় প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুটিই। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত দুটি নির্বাচন একই বার্তা দিয়েছে। কেন, সেটা ভেবে দেখা দরকার।
যুদ্ধ শুরুর সময় যমজ দুজন ও তাঁদের সমর্থকেরা এটিকে বর্ণনা করেছিলেন বড় বড় কথায়। বলা হয়েছিল, এটি বিশ্বের সবচেয়ে জটিল অঞ্চলে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকা হবে। ইরান ও তার মিত্রদের চিরতরে ভেঙে দেওয়া হবে।
এর মূল্য ছিল বিপুল। যুদ্ধ অর্থনীতি, জ্বালানি ও নিরাপত্তায় বৈশ্বিক সংকট ডেকে আনে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে বাড়ে জ্বালানির দাম। এরই মধ্যে গাজা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। পশ্চিম তীর কার্যত আবার দখলে চলে গেছে। দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশ ফের ইসরায়েলি দখলে এসেছে। ইয়েমেনে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। ইসরায়েলি বিমান যেখানেই পৌঁছেছে, সেখানেই রেখে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন।
যুদ্ধের বিচার হয় ফলাফলে। কোনো যুদ্ধ সফল হয় তখনই, যখন বিজয়ী পক্ষ পরাজিতের ওপর চূড়ান্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা চাপিয়ে দিতে পারে। এটিই আসল মাপকাঠি; বোমার সংখ্যা বা হতাহতের হিসাব নয়।
এই মাপকাঠিতে যমজ দুজন ব্যর্থ হয়েছেন। কোনো রণাঙ্গনেই কেউ সাদা পতাকা ওড়ায়নি। ইরান প্রচণ্ড আঘাত খেয়েছে, তবু তার সরকার টিকে গেছে এবং আবার আলোচনার টেবিলে ফিরেছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে যুদ্ধবিরতি ও একটি সমঝোতা স্মারকে, আত্মসমর্পণে নয়। হিজবুল্লাহ নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। হামাস মুছে যায়নি, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের প্রশ্নও মুছে যায়নি। হুতিরা এখনো আছে। প্রতিটি রণাঙ্গন এখনো খোলা। ধ্বংস মানেই বিজয় নয়।
ব্যালটের লড়াইয়ে যমজ দুজনের পতনের এটাই আসল কারণ।
ব্যালট পেপারে ট্রাম্পের নাম ছিল না, কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ডের হিসাব ছিল। তিনি আমেরিকাকে টেনে নামিয়েছেন এমন এক যুদ্ধে, যাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, "অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ"। বহু বছর আগে নেতানিয়াহুর কাছ থেকে ওবামা একই প্রস্তাব শুনেছিলেন, কিন্তু বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি। ওবামা পরে বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় আমেরিকা হয়তো এখন আরও খারাপ অবস্থায় আছে।
মার্কিন ভোটাররা সম্ভবত একমত। যুদ্ধের খরচ তাঁরা মিটিয়েছেন জ্বালানি পাম্পে আর মুদি দোকানে। তাঁরা দেখেছেন, মার্কিন সেনাদের প্রাণ আর কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, অথচ কোনো সুস্পষ্ট ফল মেলেনি। তাই তাঁরা প্রেসিডেন্টের দলকে শাস্তি দিয়েছেন, এমনকি কানসাস ও টেক্সাসের মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও।
নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা ভিন্ন, তবে সম্পর্কিত। তিনি বিশাল লক্ষ্য স্থির করেছিলেন: পূর্ণ বিজয়, ইরানি হুমকির অবসান, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ব্যবস্থা। এর কোনোটিই রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়নি। ইসরায়েলিদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, পেয়েছে তারা অন্তহীন যুদ্ধ। বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, পেয়েছে বিচ্ছিন্নতা।
লিকুদ এখনো বৃহত্তম দল, আর ক্ষমতায় টিকে থাকতে নেতানিয়াহু প্রাণপণ লড়বেন। কিন্তু তাঁর শিবির সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ইসরায়েলের অধিকাংশ ভোটার তাঁর জোটের বাইরের দলগুলোকে বেছে নিয়েছেন। এটি তাঁর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেই রায়।
আরেকটি শিক্ষা স্পষ্ট: অর্থ আর সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী লবি এআইপিএসি ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলো মধ্যবর্তী নির্বাচনে খরচ করেছে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার গেছে এমন প্রার্থীদের পেছনে, যাঁরা হেরেছেন। শুধু মিশিগানেই আবদুল এল-সাইয়েদকে হারানোর চেষ্টায় খরচ হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। তবু তিনি জিতেছেন। এআইপিএসির সমর্থন প্রত্যাখ্যান করা আরও বহু প্রার্থীও জয়ী হয়েছেন। তাঁরা খরচ করেছেন অনেক কম। কিন্তু ভোটারদের সামনে তাঁরা এনেছিলেন যুক্তি ও সততা, আর ভোটাররা তা লক্ষ করেছেন।
ইসরায়েলে একই শিক্ষা আরও বড় আকারে প্রযোজ্য। নেতানিয়াহু ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযানে ব্যয় করেছেন কয়েক বিলিয়ন ডলার। বিনিময়ে ইসরায়েল হারিয়েছে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান। বন্ধু কমেছে, সমালোচকদের কণ্ঠ আরও জোরালো হয়েছে, নিজের দেশের ভোটাররাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। শক্তি দিয়ে কেনা গেছে ধ্বংস, বৈধতা নয়।
এবার বড় প্রশ্ন: যাঁরা যমজ দুজনের জায়গা নেবেন, তাঁরা কি এই শিক্ষা নেবেন? নাকি একই ভুল করে একই ফল পাবেন?
ওয়াশিংটনে নতুন ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠতার সামনে সুযোগ আছে। তারা কূটনীতিকে ফিরিয়ে আনতে পারে প্রথম হাতিয়ার হিসেবে, শেষ আশ্রয় হিসেবে নয়। সামরিক সহায়তার সঙ্গে শর্ত জুড়ে দিতে পারে। অন্তহীন যুদ্ধ প্রত্যাখ্যানকারী ভোটারদের কথা শুনতে পারে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের অনেক নেতা এখনো সেই একই দাতাদের কাছ থেকে অর্থ নেন এবং একই বুলি আওড়ান। দলবদল মানেই নীতিবদল নয়।
ইসরায়েলে বিরোধী পক্ষের পরীক্ষা আরও কঠিন। গাদি আইজেনকট, ইয়ার লাপিদ ও তাঁদের মিত্ররা সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু কীভাবে যুদ্ধ করেছেন তা নিয়ে। কেন তিনি যুদ্ধ করলেন, কিংবা পথে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েল কী করেছে, এ প্রশ্ন তোলেন তাঁদের অল্প কয়েকজনই। দখলদারি, বসতি আর অবরোধ বহাল রাখলে তাঁরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাবেন সেই একই বিচ্ছিন্নতা। বদলাবে কেবল মুখ।
যমজ দুজন বিশ্বাস করতেন, শক্তি দিয়ে বাস্তবতা তৈরি করা যায়। বিশ্বাস করতেন, অর্থ দিয়ে কেনা যায় আনুগত্য। দুই দেশের ভোটাররা এখন তাঁদের জানিয়ে দিয়েছেন, তা সত্য নয়। তাঁদের উত্তরসূরিদের উচিত মন দিয়ে শোনা। ইতিহাস একই শিক্ষা বিনামূল্যে দুবার দেয় না।
তারা কি শিখবেন? সময়ই বলবে।
লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক,
রিসার্চ ফেলো, বাংলাদেশ নীতি গবেষণা কেন্দ্র














