একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না, হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন মা-বাবা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?
সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশ
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই হাজার ৩৮ শিশু তখনো নিখোঁজ।
তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর চিত্র তুলে ধরে। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনার তথ্য হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই করা হয় না।
সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যার কারণে বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে, আবার কেউ অপহরণ-পাচার-যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো, তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের সঙ্গে কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।
ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
নিখোঁজ শিশুর ঘটনা সাধারণ নিখোঁজের মামলা নয়
শিশুর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা সবসময় থাকে না। তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু ও পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনাকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।
জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয়গুলো দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।
পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকে
সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর মা-বাবা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।
প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা বিষয়ক ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন। তিনি পরিবারকে অনুসন্ধানপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো— কেউ তাদের কথা শুনছেন এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন— অন্তত এতটুকু নিশ্চিত হওয়া।
শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়
নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল, তাকে কি নির্যাতন-ভয়ভীতি-জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে।
শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে।
সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে
যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না, কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।
এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে, তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারও নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা কোনো কিছু গোপন রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত কোনো প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা প্রয়োজন। শিক্ষক ও কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত করা, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানানো এবং শিশুর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি।
তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারে
একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজও অনুসন্ধানে সহায়ক হতে পারে।
ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। শিশুটিকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে।
হেল্পলাইন ১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে
চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানেন? স্কুল, মাদরাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বরটি দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তাটি হোক সহজ— বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।
শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্ব
শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম— সবারই ভূমিকা রয়েছে।
স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত করতে এবং তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধ
একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।
আমরা এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা নির্ভয়ে বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয়, বরং সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।
শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করাকে সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের উচিত এই অঙ্গীকারের তাৎপর্য অনুধাবন করে তা বাস্তবে কার্যকর করা।
শিশুর নিরাপত্তা তার অধিকার
শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়— ‘শিশুটি কোথায়?’, তাকে আরও জিজ্ঞাসা করতে হবে— কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?’
আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখক: কলামিস্ট ও উন্নয়ন পেশাজীবী

















-eb944a-256x144.webp)
