মানবিক করিডোর ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু কথা

এ এম কামরুল ইসলাম
আপডেট : ৩০ মে ২০২৫, ০৩: ১৪

মোংলা বন্দরে দুবার চাকরি করলেও আমি বন্দর বিশেষজ্ঞ নই। তবে বন্দরের সিন্ডিকেট দুর্নীতির কথা কিছু জানি। মোংলা বন্দরের দুর্নীতি যদি সাগর সমান হয়, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্নীতি আকাশ সমান।

দেশে বর্তমানে সেই চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি মিয়ানমারের জন্য মানবিক করিডোর নিয়ে নানা মুখরোচক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রতিবেশী বন্ধু দেশ (?) বরাবরের মতো তাদের কূটবুদ্ধি খাটিয়ে জনগণকে ভুল বুঝিয়ে ফায়দা লোটার ফন্দি করছে। তাদের কূটকৌশলের চাপে অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দিশেহারা হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতেই আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলতে চাই।

বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দরকে উন্নত করতে চাইছেন। কিন্তু সেটা হয়ে গেলে গতানুগতিক সিন্ডিকেশন আর থাকে না। বন্দরের সিন্ডিকেট কারবারিদের পকেটে নগদ নারায়ণ কমে যাবে। পোর্টের এফিশিয়েন্সি বাড়ানো হলে দেশীয় সিন্ডিকেট দুর্নীতি করতে পারবে না।

ফ্রি-ট্রেড জোন (এফটিজেড) বা মুক্ত বাণিজ্য এলাকা মূলত বিদেশি কোম্পানিকে আমাদের দেশের ভূমি শুল্কমুক্তভাবে ব্যবহার করতে দেওয়া। তবে কেবল এফটিজেড ঘোষণা করলেই হবে না, বাংলাদেশের বন্দরের দক্ষতাও বাড়াতে হবে। এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দর অধিকাংশ সময় ৮০ শতাংশ ভর্তি থাকে। শিপ পর্যন্ত যেতে সময় লাগে ২২ থেকে ২৫ দিন। জাহাজের জট, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেশন— সব মিলিয়ে বিশাল একটি ‘ব্যাড ইকোসিস্টেম’ তৈরি হয়ে আছে।

অনেকে প্রশ্ন করছেন— আশিক চৌধুরী কী করছে? আশিক চৌধুরী চেষ্টা করছেন, যেসব কারণে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় সেগুলোর গিট্টু খোলার জন্য। ভাবুন, AP Mollar & Maersk ডলার ইনভেস্টমেন্ট করলে কী হবে? পোর্ট অকুপেন্সি ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। গেট টু শিপ ট্রান্সফার টাইম ২২ দিন থেকে ৯ দিনে নেমে আসবে। অর্থাৎ মোটাদাগে ১২ থেকে ১৫ দিন সময় বাঁচবে। এতে দেশের বাইরে পণ্য রপ্তানি করা এখনকার তুলনায় অনেক সহজ হবে।

একটা উদাহরণ দিই। আমাদের তুলনামূলক প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম। আমাদের কাছে টাকা না এলে সাধারণত ভিয়েতনামে সেই টাকা চলে যায়, গার্মেন্টস অর্ডারও চলে যায়। ভিয়েতনামের Cai Mep-Thai Vai বন্দরের লোডিং লিড টাইম ১১ দিন। অর্থাৎ আমাদের এখনকার থেকে অর্ধেক সময়। যখন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশকে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে, তার পাশাপাশি ভিয়েতনামও থাকে। চিন্তা করে দেখুন, কত বড় ‘রেড ফ্ল্যাগ’ তাহলে আমাদের পাশেই অবস্থান করছে। এ জায়গাতেই অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশকে বাদ করে দেয়।

সমস্যা হলো— আমাদের দেশের সিন্ডিকেট চায় বেশি বেশি জাহাজের জট। কারণ এই জটের ওপর তাদের ইনকাম। প্রসঙ্গত, জানা দরকার— সব সিন্ডিকেট আবার নিয়ন্ত্রণ করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

বাংলাদেশের বিজনেস গেট হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। একে নিয়ন্ত্রণ করে এক পয়সা করে কমিশন নিলেও কোটি টাকা হয়। অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও আশিক চৌধুরী এটা নিয়ে কয়েক দিন ব্যাপক কাজ করেছেন। এখন বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ছুটে যাচ্ছে দেখে একটি মহল নেতিবাচতক প্রচারণা শুরু করেছে। তারা বলার চেষ্টা করছে— আশিক চৌধুরী শুধু প্রেজেন্টেশন দিতে জানেন, আসল কাজ পারেন না।

মনে রাখতে হবে— আশিক চৌধুরী বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান। তার কাজ বিনিয়োগ আনার জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, সেটি নিশ্চিত করা। সেই কাজটিই তিনি করে চলেছেন।

এবার মিয়ানমারের জন্য মানবিক করিডোর নিয়ে কিছু কথা। আমি ১৯৯২ সাল থেকে মোট তিনবার জাতিসংঘ মিশনে ছোটখাটো কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কম্বোডিয়া, কসোভো ও দারফুর জাতিসংঘ মিশনে কাজ করার অভিজ্ঞতা কিছুটা জানানোর চেষ্টা করছি। তাহলে মানবিক করিডোর কী, তা সহজে জানতে পারবেন।

কম্বোডিয়া মিশনে কাজ করার সময় দেখেছি, মূল মিশনের সদরদপ্তর ছিল থাইল্যান্ডে। সেখান থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কম্বোডিয়ায় খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা পাঠানো হতো থাইল্যান্ড থেকে।

জাতিসংঘের গাড়ি বহর প্রবেশের জন্য থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে কয়েকটি করিডোর ছিল। সেখান থেকে দুই দেশে যাতায়াতের জন্য কোনো অনুমতি লাগত না। আমরা অফিশিয়াল কাজের জন্য হরহামেশাই থাইল্যান্ড যাওয়া আসা করতে পারতাম। এমনকি নিত্যপণ্য জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্যও গাড়ি চালিয়ে থাইল্যান্ডে চলে যেতাম।

প্রায় প্রতিদিন কম্বোডিয়া থেকে থাইল্যান্ডে জাতিসংঘের কার্গো ফ্লাইট থাকত। মিশনের যেকোনো সদস্য ছুটি কাটানোর জন্য বিনা ভিসায় ফ্রি ফ্লাইটে থাইল্যান্ড যেতে পারত। শুধু তাই নয়, ছুটিতে দেশে যাওয়ার জন্য ব্যাংকক এয়ারপোর্টে গিয়ে সেখান থেকে দেশে ঘুরে আবার বিনা ভিসায় থাইল্যান্ড হয়ে কম্বোডিয়া যেতে পারতাম। এটা ছিল জাতিসংঘ মিশনের জন্য থাইল্যান্ডের মানবিক করিডোর।

কসোভো মিশনে আমার অবস্থান দীর্ঘ না হলেও আমার বেশ মনে আছে, আমরা জাতিসংঘের চার্টার্ড ফ্লাইটে প্রথমে মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিয়ে গিয়ে নেমেছিলাম। সেখান থেকে গাড়িতে করে যাই কসোভো। মেসিডোনিয়া থেকে কসোভো পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটিও ছিল মানবিক করিডোর।

এবার বলি দারফুর মিশনের কথা। দারফুর মিশনে যাওয়ার সময় আমরা সরাসরি দারফুর গেলেও পরবর্তী সময়ে যতবার যাতায়াত করেছি, ততবার সুদানের খার্তুম বিমানবন্দর ব্যবহার করেছি। কারণ খার্তুমে ছিল দারফুর মিশনের সদরদপ্তর। অর্থাৎ মানবিক করিডোর।

সচেতন মহলের কাছে আমার প্রশ্ন— জাতিসংঘকে মানবিক করিডোর দিয়ে থাইল্যান্ড, মেসিডোনিয়া, সুদান কি তাদের সার্বভৌমত্ব হারিয়েছিল?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ শান্তি মিশন পাঠানোর আগেই পার্শ্ববর্তী দেশের কাছে মানবিক করিডোর চায়। সেটা নিশ্চিত হওয়ার পর সেখানে মিশন পাঠায়। যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট মিশনে কর্মরত সব সদস্যকে কাছাকাছি দেশে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্যও প্রয়োজন হয় মানবিক করিডোর। জাতিসংঘের ভাষায় এই জায়গাকে বলা হয় ইভ্যাকুয়েশন সেন্টার।

এখন মিয়ানমারের রাখাইন সমস্যার সমাধানের জন্য যদি জাতিসংঘ হস্তক্ষেপে করে, তাহলে সবার আগে প্রয়োজন হবে বাংলাদেশের মানবিক করিডোর। কয়েক মাস আগে জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশে এসে সার্বিক পরিস্থিতি দেখে গেছেন। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য অধ্যাপক ইউনূস সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। সুতরাং মিয়ানমারের সমস্যা সমাধানের জন্য জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ করতে হলে আগে প্রয়োজন মানবিক করিডোর।

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কোনো দোষ না পেয়ে কিছু কিছু দল এখন মানবিক করিডোর ও বন্দরের দোহাই দিয়ে জনগণকে ভুল বোঝাতে চেষ্টা করছে। ‘দেশ গেল, দেশ গেল’ বলে মায়াকান্না করছে। সুতরাং তাদের উদ্দেশে লালনের ভাষায় বলতে চাই—

জাত গেল, জাত গেল বলে

এ কী আজব কারখানা।

সত্য কাজে কেউ নয় রাজি

সবই দেখি তা না না না।

দেশের জনগনকে বলতে চাই— দুষ্টু লোকদের মিষ্টি কথা শুনে কখনো তাদের ফাঁদে পা দেবেন না।

লেখক: সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠাতা, সোনামুখ পরিবার

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

রাষ্ট্র মানুষের সৃষ্টি, মানুষ রাষ্ট্রের নয়

প্রশাসন, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সেবা করার বদলে অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ কিংবা আধুনিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো— সব জায়গায় একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে: রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ রাষ্ট্রের জন্য?

৫ দিন আগে

ভুলের পর অনুতাপ ও সংশোধন

বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। বন্ধুর কোনো কথায় কষ্ট পাওয়া, ভুল বোঝা বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া— এসব মানবিক। প্রকৃত বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে সেখানে ক্ষমা আছে, সংশোধনের সুযোগ আছে। যে সমাজে ক্ষমা নেই, সেখানে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

৬ দিন আগে

আমার বাবা নুরুল ইসলামের রাষ্ট্রীয় খেতাব চাই

এই সাহসিকতার মূল্য তাকে দিতে হয় জীবনের বিনিময়ে। হত্যাকারীরা তার কাছ থেকে মাইক কেড়ে নেয়, লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করে, শরীর ক্ষতবিক্ষত করে এবং পরে গুলি চালায়। এরপর তাকে গণকবরে নিক্ষেপ করা হয়।

৯ দিন আগে

শিক্ষা খাতের দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স কার্যকর হোক

প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনলাইন ভর্তি ও নিয়োগ-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা, আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা— এসব পদক্ষেপ দুর্নীতি কমাতে কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো প্রভাবশ

৯ দিন আগে