পুঁজিবাজারে মহামারি—শেয়ারমূল্য তলানিতে

ফজলুল বারী

বিশ্ববাজারে ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্বের ফেরিওয়ালা নিজ দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা পেয়েও কী ব্যর্থ হলেন? তাঁর তত্ত্বের কোনো উপাদানই তো বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণ শূন্য হয়নি—কমেওনি, বরং বেড়েছে।

তরুণশক্তি বিপথগামী; প্রযুক্তি ও সুশাসন সূচক ঋণাত্মক; সামাজিক ব্যবসা কল্পলোকেই রয়ে গেছে। ফলে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ক্ষুধা ও হতাশার মাত্রা আগের তুলনায় আরও বেশি।

অন্যদিকে অনুরুদ্ধ কুমারা দিশানায়েকে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেউলিয়া শ্রীলঙ্কার অর্থ–সামাজিক–রাজনৈতিক সূচককে সম্মানজনক উচ্চতায় তুলেছেন। দিশানায়েক নোবেলপ্রাপ্ত নন; আন্তর্জাতিক বাজারের ভাষ্যকারও নন। তবু তিনি নিজ দেশে দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটিয়েছেন।

ড. ইউনূস রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে ১৪ মাস অতিক্রম করলেও ঋণ সূচক ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো খাতেই ধনাত্মক পরিবর্তন নেই। জনগণকে তিনি কী দুদণ্ড স্বস্তি দিতে পারলেন? রাজধানী ঢাকা তাঁর আমলে মিছিল–বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয়েছে। অর্জিত জাতীয় ঐক্য ক্ষয়ে গেছে; সরকারি প্রশাসনসহ সর্বত্র ক্যাডার–নির্ভরতা বেড়েছে; সরকারের পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। উৎপাদন ও বিনিয়োগ–বান্ধব খাতে দৃশ্যমান ব্যয় নেই বললেই চলে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সূচক নিম্নগামী। সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক চিত্র অর্থবাজার ও পুঁজিবাজারে—উভয় বাজারের ব্যবস্থাপনা নৈরাজ্যমুখী। অর্থবাজার দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. আহসান এইচ. মনসুর নতুন নোট ছাপিয়ে বাজার সামলাচ্ছেন—খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে। জুন প্রান্তিকের খেলাপি ঋণের তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

সম্প্রতি ড. মনসুর পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। একীভূত করা হচ্ছে এমন এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যার জন্মই হয়নি। ইতোমধ্যে ওই পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগকারীদের শেয়ারমূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে এসব ব্যাংকের এনএভি ঋণাত্মক। অথচ কোনো বিনিয়োগকারী তো ঋণাত্মক এনএভির শেয়ার কেনেননি; তারা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত লভ্যাংশ নিয়মিতই পেয়েছেন।

এনএভি ঋণাত্মক হলে লভ্যাংশ অনুমোদন পেল কীভাবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগ কী করছিল? অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ এত জনবল নিয়েও কী দেখেনি? যদি হিসাব কারসাজি হয়ে থাকে—তবে বাংলাদেশ ব্যাংককেই দায় নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণও বাংলাদেশ ব্যাংককেই দিতে হবে—অতি দ্রুত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিনিয়োগ–বিনাশী সিদ্ধান্ত দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চোখে লাল সংকেত দেখিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে নতুন বিনিয়োগ আসার সুযোগ নেই।

আর্থিক সাময়িকী গ্লোবাল ফাইন্যান্স-এর মূল্যায়নে ড. মনসুর ‘সি’-গ্রেডের গভর্নর। ভিয়েতনামের নয়েন থি সাং এবং সাম্প্রতিক দেউলিয়া–অবস্থা থেকে ফিরে আসা শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নন্দলাল সিং—উভয়েই ‘এ প্লাস’ রেটিং পেয়েছেন।

বাংলাদেশের এই সুশীল এনজিও–ঘরানার গভর্নর অর্থ ও পুঁজিবাজারের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বিএসইসি—যার চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, তাঁর অন‍্যতম যোগ্যতা ‘জামাই বাবাজি’ পরিচয়‍। ১৬ লাখ বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও তাঁর সময়ে প্রায় উজাড় হয়েছে; নি:স্বের কাতারে দাঁড় করিয়েছেন সবাইকে।

রাশেদ মাকসুদের সর্বশেষ কীর্তি—আইসিইউতে থাকা পুঁজিবাজারে সংশোধিত ‘মার্জিন রুল’ চাপিয়ে দেওয়া। যেদিন থেকে এই রুল ওয়েবসাইটে ঝুলেছে—সেদিন থেকেই বাজার পতন শুরু। এ পর্যন্ত ডিএসইএক্স সূচক প্রায় এক হাজার পয়েন্ট কমেছে। বাজারমূলধন হ্রাস পেয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

ডিএসইর মূল বাজারে তালিকাভুক্ত ৩৮৬ কোম্পানির মধ্যে ২১৩টির শেয়ারমূল্য কমেছে। এসএমই মার্কেটের ১৯ কোম্পানির মধ্যে ৭টির দাম কমেছে ৪৩ শতাংশ; ৫টির দাম কমেছে ৩০–৪০ শতাংশ; ৩টির কমেছে ৩৫ শতাংশ। (তথ্য: সপ্তাহের দুই কার্যদিবস আগের, পরবর্তী দুই দিনও পতন অব্যাহত ছিল।)

সপ্তাহের শেষ দিন ডিএসইএক্স সূচক আবার ১২৩ পয়েন্ট কমেছে। পুরো সপ্তাহে পতন ২৬৫.২৫ পয়েন্ট। সূচক নেমে এসেছে ৪৭০৩–এর ঘরে। খাতভিত্তিক রিটার্ন ডিস্ট্রিবিউশনে ২১ খাতেই লাল সংকেত। মূল্যবৃদ্ধিতে মাত্র দুটি খাত সবুজ। লেনদেনে তিনটি খাত সবুজ—বাকি ১৮–এ লাল চক্ষু। ডিএসইর মার্কেট পিই ৮.৫৭—ধুধু মরুভূমিতে একমাত্র মরুদ্যান। দুর্দান্তভাবে ক্রয়–অনুকূল, বাকি সব চিত্র মড়কের মতো।

মড়কেও বাণিজ্য হয়। পুঁজিবাজারে মহামারি—শেয়ারমূল্য তলানিতে। এটিও এক ধরনের সুযোগ। যেসব কোম্পানির লভ্যাংশ, ইপিএস, এনএভি ভালো—মন্দাবস্থাতেও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখে—এখন তাদের শেয়ার আকর্ষণীয়। লভ্যাংশ বিবেচনায় শক্ত মৌলভিত্তিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে বেশি মুনাফা মিলবে। ব্যাংকের মুনাফা সুদ–নির্ভর; কোম্পানির মুনাফা সুদমুক্ত—হালাল আয়।

ব্যাংকখাতে মন্দা। অধিকাংশ ব্যাংক দুর্বল—ঝুঁকিপূর্ণ। তবে শক্তিশালী কিছু ব্যাংকের এখন সোনালী সময়। কমপক্ষে দশটি ব্যাংক প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করছে। ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরেও ভালো বাণিজ্য চলছে। প্রতিটি খাতেই কিছু শক্তিশালী কোম্পানি আছে—ডিভিডেন্ড বিচার করে এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত।

কিন্তু কিনবে কে? ভরসা ও আস্থার জায়গায় বাজার ব্যবস্থাপকদের ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি ঝুলছে—সমস্যা এখানেই। —১৪ নভেম্বর ২০২৫

লেখক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

আগে কাজ করি তারপর কথা বলব: গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশের মুখে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিকরাও। তারা গভর্নরের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘আগে কাজ করি তারপরে কথা বলব।’

৩ দিন আগে

‘ব্যবসায়ী গভর্নরে’র নিয়োগ ঘিরে দিনভর আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক

তবে পুরনো গভর্নরের জায়গায় নতুন গর্ভনর নিয়োগই শেষ নয়, বিদায়ী গভর্নরের বিদায়ের প্রক্রিয়াটি দিনভর ছিল আলোচনায়। তার উপদেষ্টাকে ধাওয়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে নতুন গভর্নরের পরিচয় নিয়ে প্রথমে ধোঁয়াশা ছড়িয়েছে। পরে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় সরকারের ব্যাংক খাতের সংস্কারের আন্তরিকতা নিয়েও প্

৩ দিন আগে

প্রয়োজনেই গভর্নর পদে পরিবর্তন, আরও অনেক জায়গায় হবে: অর্থমন্ত্রী

এদিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হলো।

৩ দিন আগে

সেলিম রায়হানের প্রশ্ন— সরকার কি সত্যিই ব্যাংক খাত সংস্কারে আন্তরিক?

তিনি লিখেছেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু আর্থিক নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থা। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যবসায়িক পটভূমির কাউকে বসানো হলে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

৩ দিন আগে