মতামত

আর্থিক সংকটে ক্ষুদ্র-শিল্প উদ্যোক্তারা: সমাধান জরুরি

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল

উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার বৃদ্ধি ক্ষুদ্র শিল্প-উদ্যোক্তাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ওপর, ফলে তারা তাদের ব্যবসা পরিচালনায় মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ঋণের সুদহার বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়িক ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখেছেন অনেক উদ্যোক্তা। এই পরিস্থিতিতে কর্মহীনতার ঝুঁকি এবং জনবল ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। কিছু বিশ্লেষক সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

গত বছরের জুনে ব্যাংক ঋণের সুদহার ছিল ৯ শতাংশ, যা বর্তমানে ১৪–১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও এক দফা নীতি সুদহার বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। এমন দফায় দফায় সুদহার বৃদ্ধির ফলে বড় প্রতিষ্ঠানও চাপে পড়তে পারে এবং বহু প্রতিষ্ঠান রুগ্ন তালিকাভুক্ত হবে। উল্লেখযোগ্য, ২০২০ সালের এপ্রিলে সরকারের পরামর্শে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয় এবং মেয়াদি আমানতের সুদ ৬ শতাংশ রাখা হয়। দীর্ঘদিন সুদহার সীমাবদ্ধ থাকলেও, পরবর্তীতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটে সুদহার বৃদ্ধি শুরু হয়।

বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭৯ লাখ ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে টিকে থাকার লড়াই করছে।

সীমিত আকারের ওষুধশিল্প, ওয়ার্কশপ, গ্রামীণ হস্তশিল্প, মুদি দোকান ও জুতা তৈরির ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বোঝা যায়, তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মারাত্মক চেষ্টার মধ্যে রয়েছেন। ক্রেতাদের চাহিদা কমে গেছে, বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি বিল বেড়েছে, এবং ব্যাংক ঋণ নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে গেছে। এসএমই খাত মোট দেশজ উৎপাদনে এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখে এবং মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এই শিল্পে কাজ করে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব বেশি পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর।

উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গুরুত্ব অপরিসীম। তারা সহজেই ব্যবসা শুরু করতে পারে, কম পুঁজি প্রয়োজন এবং অভিজ্ঞতার তেমন প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বা উৎপাদিত পণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর নির্ভরশীল। যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না পারে, দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অবশ্য, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের যথাযথ সহযোগিতা পাওয়া যায় না। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তারা বড় প্রতিষ্ঠানের মতো সমস্যা কাটিয়ে রাখতে পারে না। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না হয়। ব্যাংকিং লেনদেনে সমস্যা না হয় এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম থাকে। এছাড়া, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওনার টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় ও সহযোগিতা দিতে পারে।

বর্তমানে ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। যাদের ঋণ রয়েছে, তারা সুদ ও কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছেন। ফলে অনেক ঋণ খেলাপি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করতে পারে।

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসাথে থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে। দ্রুত সমাধান না হলে দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। তাই সময় থাকতেই এই খাতের জন্য নজর দেওয়া জরুরি।

লেখক: কলাম লেখক ও শিল্প-উদ্যোক্তা

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লক্ষাধিক কর্মীর কাঠামো, বিপুল অর্থের নির্বাচন

এভাবেই লাখ লাখ ভোটারকে একত্রিত করতে সক্ষম একটি নির্বাচন দলীয় কর্মী বাহিনীর একত্রিতকরণের একটি অপারেশনে পরিণত হয়। ফলে শুধু ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনাতেই কয়েক লাখ সংগঠিত কর্মী মাঠে নামাতে হয়। এই মানুষগুলো স্বেচ্ছাসেবী নন, তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয় অর্থ, প্রভাব ও সুবিধার আশ্বাস দিয়ে।

৬ দিন আগে

বিকৃত ইতিহাস, অনুর্বর জাতি, অসুস্থ মস্তিষ্ক

বিপরীতভাবে, ইতিহাস যখন বিকৃত হয়— ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অবহেলার কারণে— তখন একটি জাতি ধীরে ধীরে তার শেকড় হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে বিদ্যমান।

৭ দিন আগে

অমর একুশের বইমেলা: সত্যিই কি প্রাণের কথা বলে?

অর্থাৎ এ পর্যন্ত তিনবার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে; এবারেরটি হবে চতুর্থ। তবে নির্বাচনের কারণে বইমেলা কখনো বন্ধ থাকেনি। ১৯৭৯ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা চলেছে। ১৯৯১ সালেও মেলা চলেছে পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে। ১৯৯৬ সালেও একই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ১৯৭৯ সালের মেলাটি কিছুটা ব্যতিক

৮ দিন আগে

আমরা সবাই গাধা…

যতদিন শাসনব্যবস্থা মানুষকে রাজকীয় যন্ত্রের বিনিময়যোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য করবে, ততদিন এ দেশ বহু রাজার, শোষিত প্রজার দেশ হয়েই থাকবে— আর নাগরিকরা চিরকালই গলা মিলিয়ে গান গাইতে বাধ্য হবে— আমরা সবাই গাধা…

১১ দিন আগে