
এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

হঠাৎ করেই গণমাধ্যমে চোখ পড়ল, চোখ আটকে গেল একটি সংবাদে। সংবাদটি হলো— ‘বৃহস্পতিবার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখা হবে বলে জানিয়েছে তারা।’
প্রশ্ন জাগে— তাদের দাবি কী? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?
এরই মধ্যে গত কয়েক দিনে রান্নার জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের লাখো পরিবার দৈনন্দিন রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শহুরে পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থাও নেই। জীবনধারণের এমন গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ নিয়ে গত কয়েক দিনে যা ঘটছে এবং পরিস্থিতির যে গতিপথ বোঝা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।
বাজারে এমনভাবে সংকট তৈরি করেছে অসৎ ব্যবসায়ীরা যে টাকা দিয়েও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ভোক্তা পর্যায়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। এ সুযোগে ভোক্তাদের জিম্মি করে দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করছে একদল অসাধু ব্যবসায়ী। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁর এলপিজি ব্যবহারকারীরা।
ফোনে ১২ কেজি এলপিজির দাম ২২০০-২৫০০ টাকা বলা হলেও সাংবাদিক বা টিভি ক্যামেরা দেখলে সেই দাম হয়ে যায় ১৫০০ টাকা। কেন? কী কারণ? এর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। বিক্রেতারা দাবি করেন, তারা ১৫০০ টাকাতেই এলপিজি বিক্রি করছেন। কিন্তু ক্রেতাদের পালটা অভিযোগ— বাস্তবে ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায় এলপিজি কিনতে হচ্ছে।
বড় কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত সাপ্লাই দিতে পারছে না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। একটি গাড়ি একদিন গেলে চার-পাঁচ দিন পর লোড হচ্ছে। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর দাবি, শীত মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকলেও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা ও জাহাজ সংকটের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করে থাকে। তবে ভূ-রাজনৈতিক কারণে একটি বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এলপিজি আনা যাচ্ছে না। এটিই অন্যতম কারণ।
মনে করা হচ্ছে, এ সমস্যা সমাধানে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে, যা উদ্বেগজনক। এর ফলে পুরো এলপিজি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং অসৎ ব্যবসায়ীরা জনগণের পকেট লুটছে। সংকটের অজুহাতে এভাবে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এলপিজির দাম সরকার নির্ধারণ করে।
প্রতি মাসের শুরুতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারনির্ধারিত সেই মূল্যে এলপিজি কখনোই বিক্রি হয় না। সিলিন্ডারপ্রতি ভোক্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আদায় করা হয়। এ হিসাবে মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভোক্তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে এলপিজি সিন্ডিকেট।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা ৯০ লাখের বেশি। প্রতিটি সিলিন্ডারে যদি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়, তাহলে মাসে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা গ্রাহকের পকেট থেকে লুটে নেওয়া হচ্ছে। তারপরও কেন এই অরাজকতা?
এলপিজির এ পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টরা একে অন্যকে দোষারোপ করছে। খুচরা বিক্রেতারা দোষ দিচ্ছেন ডিলারদের, ডিলাররা দোষ দিচ্ছেন বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে, আর বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দোষ চাপাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ওপর। এই ফাঁকে ভোক্তারাই হচ্ছেন লুটপাটের শিকার।
বর্তমানে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি সিলিন্ডার ভরার ব্যবসায় যুক্ত। এসব কোম্পানির দাবি, বিইআরসির দাম নির্ধারণের ফর্মুলা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবহন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ এতে যথাযথভাবে সমন্বয় করা হয় না। তাদের মতে, বিইআরসি ও অপারেটরদের সমন্বয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের প্রকৃত মার্জিন নির্ধারণ করা হলে বাজার অস্থিতিশীল হতো না। প্রাইসিং ফর্মুলা সঠিক না হলে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলাররা টিকে থাকতে গিয়ে দাম বাড়াবেই।
বাজারে কিছু সংকট তৈরি হয় প্রকৃতি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে। আবার কিছু সংকট তৈরি হয় মানুষের সচেতন কারসাজিতে। বাংলাদেশের চলমান এলপিজি সংকট পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের কারসাজির ফল। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার উধাও করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। একে বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা বলা যায় না। এটি দিনের আলোয় ডাকাতি, যার পেছনে রয়েছে সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
এলপিজি কোনো বিলাসী জ্বালানি নয়; এটি শহর ও উপশহরের লাখো পরিবারের রান্নাঘরের প্রধান ভরসা। যেখানে পাইপলাইনের গ্যাস নেই বা নিয়মিত সংকট থাকে, সেখানে এলপিজিই একমাত্র বিকল্প। নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এলপিজি নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, ছোট খাবারের দোকান ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচও গ্যাসের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এলপিজির সংকট সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
এলপিজি সিন্ডিকেট সরকার নির্ধারিত মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করে জনগণের পকেট কাটছে। অথচ সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও ড. ইউনূস সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট দমনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের এই ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য।
দেশের লাখো পরিবারের রান্নাঘরের একমাত্র জ্বালানি এখন এলপিজি। শহর থেকে মফস্বল— সবখানেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ থাকলেও নিয়মিত সংকটের কারণে সিলিন্ডার গ্যাসই ভরসা। এই নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির বাজারে যদি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হয়, তবে তা সরাসরি জনজীবনের ওপর আঘাত।
এলপিজির সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি, বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল তদারকির ফল। সরকার মূল্য সমন্বয় করলেও সরবরাহ, মজুত ও খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়বে— এটা জানা থাকার পরও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি।
অন্যান্য দেশেও এলপিজি বাজার অস্থির হয়, কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রীয় তদারকি সেই অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ভারতের উদাহরণ দেওয়া যায়— সেখানে রান্নার গ্যাসকে প্রায় জনসেবার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিতরণ থাকলেও রয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও সরাসরি নজরদারি। বাংলাদেশে বাজার উন্মুক্ত করা হলেও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।
এই সংকট আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে— আইন প্রয়োগ দুর্বল হলে বাজার ব্যর্থ হয়। প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে দুর্বল রাষ্ট্র মানেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার জনস্বার্থে পরিচালিত হবে, নয়তো তা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি থাকবে।
শুধু দাম ঘোষণা করাই যদি শেষ দায়িত্ব হয়, তবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কী? মাঠপর্যায়ের তদারকি ছাড়া মূল্যনির্ধারণ অর্থহীন। বিইআরসির হাতে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল ও কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায় না।
চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, সার— সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র। এলপিজি সেই পুরোনো গল্পের নতুন সংস্করণ। এই সংকটকে জটিল করেছে খাতটির কাঠামোগত বাস্তবতা— রাষ্ট্রীয় বাফার মজুত নেই, পুরো বাজারই বেসরকারি হাতে।
এলপিজি কোনো বিলাসী পণ্য নয়, এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি। এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং মজুত ও সরবরাহের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিকার সংস্থার যৌথ অভিযান জোরদার করতে হবে। কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণই পারে পরিস্থিতি সামাল দিতে।
এলপিজি আমদানি, বিতরণ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত পক্ষ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। পুরো ব্যবস্থাপনায় নাগরিকের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। তাই দ্রুত, যৌক্তিক ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

হঠাৎ করেই গণমাধ্যমে চোখ পড়ল, চোখ আটকে গেল একটি সংবাদে। সংবাদটি হলো— ‘বৃহস্পতিবার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখা হবে বলে জানিয়েছে তারা।’
প্রশ্ন জাগে— তাদের দাবি কী? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?
এরই মধ্যে গত কয়েক দিনে রান্নার জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের লাখো পরিবার দৈনন্দিন রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শহুরে পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থাও নেই। জীবনধারণের এমন গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ নিয়ে গত কয়েক দিনে যা ঘটছে এবং পরিস্থিতির যে গতিপথ বোঝা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।
বাজারে এমনভাবে সংকট তৈরি করেছে অসৎ ব্যবসায়ীরা যে টাকা দিয়েও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ভোক্তা পর্যায়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। এ সুযোগে ভোক্তাদের জিম্মি করে দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করছে একদল অসাধু ব্যবসায়ী। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁর এলপিজি ব্যবহারকারীরা।
ফোনে ১২ কেজি এলপিজির দাম ২২০০-২৫০০ টাকা বলা হলেও সাংবাদিক বা টিভি ক্যামেরা দেখলে সেই দাম হয়ে যায় ১৫০০ টাকা। কেন? কী কারণ? এর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। বিক্রেতারা দাবি করেন, তারা ১৫০০ টাকাতেই এলপিজি বিক্রি করছেন। কিন্তু ক্রেতাদের পালটা অভিযোগ— বাস্তবে ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায় এলপিজি কিনতে হচ্ছে।
বড় কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত সাপ্লাই দিতে পারছে না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। একটি গাড়ি একদিন গেলে চার-পাঁচ দিন পর লোড হচ্ছে। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর দাবি, শীত মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকলেও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা ও জাহাজ সংকটের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করে থাকে। তবে ভূ-রাজনৈতিক কারণে একটি বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এলপিজি আনা যাচ্ছে না। এটিই অন্যতম কারণ।
মনে করা হচ্ছে, এ সমস্যা সমাধানে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে, যা উদ্বেগজনক। এর ফলে পুরো এলপিজি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং অসৎ ব্যবসায়ীরা জনগণের পকেট লুটছে। সংকটের অজুহাতে এভাবে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এলপিজির দাম সরকার নির্ধারণ করে।
প্রতি মাসের শুরুতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারনির্ধারিত সেই মূল্যে এলপিজি কখনোই বিক্রি হয় না। সিলিন্ডারপ্রতি ভোক্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আদায় করা হয়। এ হিসাবে মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভোক্তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে এলপিজি সিন্ডিকেট।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা ৯০ লাখের বেশি। প্রতিটি সিলিন্ডারে যদি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়, তাহলে মাসে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা গ্রাহকের পকেট থেকে লুটে নেওয়া হচ্ছে। তারপরও কেন এই অরাজকতা?
এলপিজির এ পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টরা একে অন্যকে দোষারোপ করছে। খুচরা বিক্রেতারা দোষ দিচ্ছেন ডিলারদের, ডিলাররা দোষ দিচ্ছেন বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে, আর বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দোষ চাপাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ওপর। এই ফাঁকে ভোক্তারাই হচ্ছেন লুটপাটের শিকার।
বর্তমানে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি সিলিন্ডার ভরার ব্যবসায় যুক্ত। এসব কোম্পানির দাবি, বিইআরসির দাম নির্ধারণের ফর্মুলা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবহন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ এতে যথাযথভাবে সমন্বয় করা হয় না। তাদের মতে, বিইআরসি ও অপারেটরদের সমন্বয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের প্রকৃত মার্জিন নির্ধারণ করা হলে বাজার অস্থিতিশীল হতো না। প্রাইসিং ফর্মুলা সঠিক না হলে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলাররা টিকে থাকতে গিয়ে দাম বাড়াবেই।
বাজারে কিছু সংকট তৈরি হয় প্রকৃতি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে। আবার কিছু সংকট তৈরি হয় মানুষের সচেতন কারসাজিতে। বাংলাদেশের চলমান এলপিজি সংকট পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের কারসাজির ফল। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার উধাও করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। একে বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা বলা যায় না। এটি দিনের আলোয় ডাকাতি, যার পেছনে রয়েছে সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
এলপিজি কোনো বিলাসী জ্বালানি নয়; এটি শহর ও উপশহরের লাখো পরিবারের রান্নাঘরের প্রধান ভরসা। যেখানে পাইপলাইনের গ্যাস নেই বা নিয়মিত সংকট থাকে, সেখানে এলপিজিই একমাত্র বিকল্প। নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এলপিজি নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, ছোট খাবারের দোকান ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচও গ্যাসের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এলপিজির সংকট সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
এলপিজি সিন্ডিকেট সরকার নির্ধারিত মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করে জনগণের পকেট কাটছে। অথচ সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও ড. ইউনূস সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট দমনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের এই ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য।
দেশের লাখো পরিবারের রান্নাঘরের একমাত্র জ্বালানি এখন এলপিজি। শহর থেকে মফস্বল— সবখানেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ থাকলেও নিয়মিত সংকটের কারণে সিলিন্ডার গ্যাসই ভরসা। এই নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির বাজারে যদি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হয়, তবে তা সরাসরি জনজীবনের ওপর আঘাত।
এলপিজির সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি, বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল তদারকির ফল। সরকার মূল্য সমন্বয় করলেও সরবরাহ, মজুত ও খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়বে— এটা জানা থাকার পরও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি।
অন্যান্য দেশেও এলপিজি বাজার অস্থির হয়, কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রীয় তদারকি সেই অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ভারতের উদাহরণ দেওয়া যায়— সেখানে রান্নার গ্যাসকে প্রায় জনসেবার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিতরণ থাকলেও রয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও সরাসরি নজরদারি। বাংলাদেশে বাজার উন্মুক্ত করা হলেও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।
এই সংকট আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে— আইন প্রয়োগ দুর্বল হলে বাজার ব্যর্থ হয়। প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে দুর্বল রাষ্ট্র মানেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার জনস্বার্থে পরিচালিত হবে, নয়তো তা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি থাকবে।
শুধু দাম ঘোষণা করাই যদি শেষ দায়িত্ব হয়, তবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কী? মাঠপর্যায়ের তদারকি ছাড়া মূল্যনির্ধারণ অর্থহীন। বিইআরসির হাতে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল ও কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায় না।
চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, সার— সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র। এলপিজি সেই পুরোনো গল্পের নতুন সংস্করণ। এই সংকটকে জটিল করেছে খাতটির কাঠামোগত বাস্তবতা— রাষ্ট্রীয় বাফার মজুত নেই, পুরো বাজারই বেসরকারি হাতে।
এলপিজি কোনো বিলাসী পণ্য নয়, এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি। এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং মজুত ও সরবরাহের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিকার সংস্থার যৌথ অভিযান জোরদার করতে হবে। কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণই পারে পরিস্থিতি সামাল দিতে।
এলপিজি আমদানি, বিতরণ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত পক্ষ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। পুরো ব্যবস্থাপনায় নাগরিকের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। তাই দ্রুত, যৌক্তিক ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে, আইনকে পদদলিত করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে, সেই দৃশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিরই নগ্ন বহির্প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।
৪ দিন আগে
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কখনো বৃত্তি পরীক্ষা বাতিল, কখনো পুনর্বহাল— এই দোদুল্যমান সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক— সবার মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি করছে। প্রশ্ন জাগে, কেন এই হঠকারিতা? যদিও প্রকাশ্যে বোঝা যায়, হাইকোর্টে মামলাজনিত কারণে এ বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিশুদের মনে বিরূপ প্রভাব ফ
৫ দিন আগে
শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা বহির্জগতের নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত দুর্বলতা। লোভ, হিংসা, অহংকার, প্রতিশোধস্পৃহা, ক্ষমতার মোহ এবং অন্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। এই প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ না করলে কোনো রাষ্ট্র, কোনো ধর্মীয় আহ্বান কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাই স্থায়ী শান্
৭ দিন আগে
বর্তমানের নারী রাজনীতিকরাও যদি জেলা বা জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সুযোগ ও উৎসাহ পান, তারাও একইভাবে সফল হতে পারবেন। এই পরিবর্তনের জন্য নারী আন্দোলনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। দলগুলোর ভেতরে থাকা নারী নেত্রীরা একাকী লড়াই করে পেরে উঠছেন না, তাই বাইরে থেকে আমাদের মতো সংগঠনগুলোরা সমর্থন তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
৮ দিন আগে