আনন্দ-বিষাদে দেবী দুর্গাকে বিদায়, বিসর্জনে শেষ দুর্গোৎসব
-62abf3-480x270.webp)
পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা ও উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে দুর্গোৎসব। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি আর ভক্তদের ‘বলো দুগ্গা মাই কি জয়’ ধ্বনিতে মুখর রাজধানী। আনন্দের আবহের মধ্যেই দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর সময় ভক্তদের মনে ভিড় করছে বিষাদের সুর।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের বিজয়া শোভাযাত্রা। বিকেল ৪টায় পলাশী মোড় থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়। রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা নিয়ে জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার হয়ে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে যাওয়ার কথা রয়েছে। রাত ১০টার মধ্যে শোভাযাত্রাটি সেখানে পৌঁছানোর কথা।
এদিকে ওয়াইজঘাটে ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। নৌকায় করে প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনস্থলে আসছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। সদরঘাট নৌ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রব জানান, পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে নৌ পুলিশ সদস্যরা ওয়াটার বোর্ড ও স্পিডবোট নিয়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। যতক্ষণ প্রতিমা বিসর্জন কার্যক্রম চলবে, ততক্ষণ বাড়তি নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মহালয়ায় কন্যারূপে মর্ত্যে আসেন দেবী দুর্গা। পাঁচ দিনের পূজা শেষে বিজয়া দশমীতে কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যান তিনি। অশুভ শক্তির বিনাশের মধ্য দিয়ে দেবীর বিজয় উদ্যাপন করা হয় এই দিনে। তবে প্রতিমা বিসর্জনের সময় ভক্তদের মনে থাকে বিদায়ের বেদনা, সঙ্গে আগামী বছর আবার মাকে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা।
-65abb2.jpg)
বুধবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দশমীর বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সকাল ৭টায় পূজা শুরু হওয়ার পর সকাল ৯টায় দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় পূজার শাস্ত্রীয় পর্ব। পরে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে সিঁদুর খেলা।
স্বামীর দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায় সধবা নারীরা দেবীর চরণে সিঁদুর দেন। এরপর একে অন্যের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে উৎসবে অংশ নেন। পূজার আনন্দের মধ্যেই এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি।
সম্প্রীতির বন্ধন ধরে রাখার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
বিজয়া দশমী উপলক্ষ্যে বুধবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন করা হয়। এতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য অংশ নেন।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, “আমাদের মধ্যে যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা ধরে রাখতে চাই। এ বন্ধনকে ধারণ করেই সামনের দিনে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই।”
পূজা উপলক্ষ্যে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডও চালিয়েছে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি। মন্দির প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে মেডিকেল ক্যাম্প বসানো হয়। বুধবার দুপুরে আয়োজন করা হয় প্রায় ৫০ বছর ধরে চলে আসা রক্তদান কর্মসূচির।
নবমীর রাতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, “বিশ্বের মধ্যে এটি বিরল যে এক ধর্মের অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অন্য ধর্মের মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভাইয়েরা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সহযোগিতা করেন।”
দেবীর বিদায়ে আবেগাপ্লুত ভক্তরা
বিসর্জনের আগে মণ্ডপে আসা ভক্তদের পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কারিগরদের মধ্যেও ছিল বিদায়ের বিষাদ। পুরান ঢাকার ওয়ারীর বাসিন্দা কারিগর চন্দন চন্দ্র দাস বলেন, “মা দুর্গা আমাদের আরাধ্য দেবী। জগতের সব শক্তির উৎস তিনি। আজ আবার ধরাধাম থেকে তিনি মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীতে চলে যাবেন। জগতের অশুভ শক্তি বিনাশ হোক— এই প্রার্থনা নিয়েই মাকে বিদায় জানাচ্ছি।”
-38b48c.jpg)
ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে এবার সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে পারেননি লালবাগের বাসিন্দা শ্রাবণী দাস। তাই উৎসবের আনন্দের মধ্যেও কিছুটা আক্ষেপ রয়ে গেছে তার। শ্রাবণী জানান, গত বছরের তুলনায় এবার পূজায় বেশি আনন্দ করেছেন তিনি। তবে বিসর্জনের সময় মন খারাপ হচ্ছে তার। বলেন, “আজ একটু কষ্ট হচ্ছে। আবার এক বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা হবে।”
শিক্ষক সীমা রানী পাল এবার প্রথমবারের মতো ট্রাকে করে বিসর্জন শোভাযাত্রায় অংশ নিচ্ছেন। শহরের পূজায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “শহরে উৎসবটা সবার হয়ে যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম সহকর্মী ও তাদের সন্তানদেরও রাতে পূজা দেখতে আসতে দেখা যায়। এ কারণে শহরে সম্প্রীতির মেলবন্ধনটা বেশি।”
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আলাদা রীতি
এ বছর রাজধানীর প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের তীরে ১১টি ঘাট নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরে ২৫৮টি মণ্ডপসহ সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে এবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মূল প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। মন্দিরের ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রতিমাটি এক বছর সংরক্ষণ করা হয়।
এ বিষয়ে শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, “ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দুর্গা স্বয়ং অধিষ্ঠিত। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঐতিহ্য রয়েছে, এই প্রতিমা আমরা এক বছর সংরক্ষণ করি। পরবর্তী পূজার আগে বিসর্জন দেওয়া হয়। এবার প্রতীকী হিসেবে সপ্তমী পূজার দিন প্রতিষ্ঠা করা কলাবউ বা কলাগাছটি বিসর্জন দেওয়া হবে।”



-2ea5b2.jpg)








-2ea5b2-256x144.webp)



