‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ঘিরে ২ বিক্রয়কর্মীকে ‘হয়রানি’, প্রতিবাদ ইউপিএলের

দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) শোরুমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা আত্মজীবনী সংকলন ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইকে ঘিরে আক্রমণাত্মক আচরণ ও দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ইউপিএলের বাংলাবাজার শোরুমে গিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি বইটিকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে এর বিপণন বন্ধের দাবি জানান বলে অভিযোগ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি।
এ ঘটনাকে ‘লজ্জাকর এবং দুর্ভাগ্যজনক’ উল্লেখ করে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউপিএল। বিবৃতিটি নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ইউপিএল জানিয়েছে, ওই ব্যক্তিরা শোরুমের শাটার বন্ধ করে তাদের দুই বিক্রয়কর্মীকে ‘প্রবল হয়রানি’ করেন। একপর্যায়ে তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটক করে রাখা হয় এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিবৃতিতে ইউপিএল বলেছে, তাদের পক্ষ থেকে প্রশ্নকারীদের জানানো হয়েছিল যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ কোনো বই নয়। ইউপিএল তাদের প্রকাশিত প্রতিটি বইকে ধারণ করে। কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবগত করা এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তাদের জানা নেই। সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইউপিএল সে অনুযায়ী যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সোমবারের ঘটনাকে ‘জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর এবং দুর্ভাগ্যজনক’ উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনোভাবে চাপের মুখে পড়েছে তারা। সরকার, ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন বই নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা থেকে ইউপিএল প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল। একই সময়ে মওদুদ আহমেদের গ্রন্থাবলি নিয়ে একাধিকবার চাপের মুখে পড়ার কথাও জানিয়েছে প্রকাশনীটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অধ্যাপক আসিফ নজরুলের গঙ্গাচুক্তি বিষয়ক গ্রন্থও পর্যালোচকদের মতামতের ভিত্তিতে ‘অত্যন্ত প্রতিকূল সময়ে’ প্রকাশ করেছে ইউপিএল। আবার কোনো কোনো পাণ্ডুলিপি প্রকাশে ইউপিএল অসম্মতি জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরকারি হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকাশক হিসেবে তারা এসব চাপ যথাসম্ভব উপেক্ষা করেছে এবং এর ফলে বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রকাশনার মৌলিক মানদণ্ড থেকে সরে আসেনি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
ইউপিএল জানিয়েছে, কোনো বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করে। তাদের পাণ্ডুলিপি পর্যালোচকেরা স্বাধীনভাবে প্রতিটি বই যাচাই করেন এবং তাদের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতেই বই প্রকাশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই নীতির কারণে কোনো চাপের মুখে তারা কখনো কোনো বই সরিয়ে নেয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিগত সময়ের মতো এখনও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিজ্ঞাপন ইউপিএলের পেজে প্রকাশিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রচিত জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসবিষয়ক একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য বইটিতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ পর্যালোচকদের মতামতের ভিত্তিতে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানায় ইউপিএল।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সম্পর্কে ইউপিএল বলেছে, “আমরা মনে করি, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বাংলাদেশের ইতিহাসের পরিক্রমায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই, বাংলাদেশ সৃষ্টির ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এই গ্রন্থে পাওয়া যায়।”
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথানিয়মে নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল যথাযথ আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেবে। তবে প্রকাশক ও বিশেষত একাডেমিক প্রকাশক হিসেবে তাদের মত, কোনো ফৌজদারি অপরাধের উসকানি নেই— এমন বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির সার্বিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিগত আমলেও আদর্শ প্রকাশনীর তিনটি বই আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ না করেই বইমেলায় তাদের স্টল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একই পেশাদার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছিল ইউপিএল। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এখনও তাদের অবস্থান একই রকম দৃঢ় ও অবিচল থাকবে।
ইউপিএল মনে করে, রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশের স্বার্থে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব মুক্তচিন্তা ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার পরিসরে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা এবং এ ধরনের হস্তক্ষেপ প্রতিহত করা। প্রকাশনার মতো জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম আইনসম্মত নয়— এমন চাপ বা হুমকির মুখে থাকলে দেশের সামগ্রিক সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে লেখক, পাঠক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সহপ্রকাশক, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা, সরকারের বিবেচক অংশ এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবার পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইউপিএল। একই সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পে ‘গুণ্ডামির রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি উপলব্ধি করে রাষ্ট্র, সমাজ ও জ্ঞানচর্চার স্বার্থে যেকোনো অবৈধ তৎপরতা কঠোর হাতে দমন করার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।














-6d5bc4-256x144.webp)

-eeb4fe-256x144.webp)
