জাতীয় ৪ নেতার ম্যুরাল অপসারণ— ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধারা, প্রশাসনের দায় অস্বীকার

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর থেকে জাতীয় চার নেতা— সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ম্যুরাল অপসারণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। প্রায় এক মাস আগে সংস্কারকাজের সময় এটি সরানো হয়।
তবে ম্যুরাল অপসারণে উপজেলা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত বা সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন বর্তমান ইউএনও মো. মেহেদী হাসান। সাবেক ইউএনও জাহিদ বিন কাসেমও দাবি করেছেন, তিনি বিষয়টি জানতেন না। ফলে কার নির্দেশে বা দায়িত্বে এটি অপসারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা গোলচত্বরে প্রায় ১০ বছর আগে সরকারি উদ্যোগে জাতীয় চার নেতার ছবি সংবলিত স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিনে সেখানে উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাতের আঁধারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় চার নেতার স্মৃতি সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তাদের স্মৃতিবিজড়িত ম্যুরাল সরিয়ে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
মাধবপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় চার নেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। আগের সরকার তাদের ম্যুরাল সরকারি উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা চত্বর এলাকায় স্থাপন করেছিল। এখন সরকারের নির্দেশে সেটি সরানো হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। আমরা এ ধরনের কাজকে সমর্থন করি না।’
ম্যুরাল অপসারণের বিষয়ে মাধবপুরের সাবেক ইউএনও জাহিদ বিন কাসেমের কাছে জানতে চাইলে বলেন, তিনি এটি অপসারণের বিষয়ে জানতেন না, মুক্তিযোদ্ধারা ভালো বলতে পারবেন। তিনি জানান, সম্প্রতি প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিকের দায়িত্বকালে ম্যুরালটি অপসারণ করা হয়েছিল। গোলাম মোস্তফা হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
জাহিদ বিন কাসেম বর্তমানে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ইউএনও। দায়িত্বে থাকাকালে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যুরাল অপসারণের বিষয়টি জানার পর তিনি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে নেতিবাচক উত্তর দেন। একইভাবে এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কোনো রেজুলেশন, সভা কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না— এ প্রশ্নেরও কোনো ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়নি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জারু মিয়া বলেন, গত ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া দিবসের অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আযম খান মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের বেহাল দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এরপর চত্বরের সংস্কারকাজ ও স্পিডবলের বেড়া নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ ত্বরান্বিত হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে সেখানে জাতীয় চার নেতার পরিবর্তে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর নাম ও ছবি সংযুক্ত করে নতুন ম্যুরাল নির্মাণের কথা শোনা যাচ্ছে।
বর্তমান মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘মাধবপুর উপজেলা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তে ওই ম্যুরাল অপসারণ করা হয়নি। নতুন ম্যুরাল তৈরির ক্ষেত্রেও উপজেলা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।’
এদিকে জাতীয় চার নেতার অন্যতম এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ ম্যুরাল অপসারণের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি এ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
সোহেল তাজ বলেন, ‘বিএনপি সরকারকে স্পষ্ট করে বলতে হবে, তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে কি না। তাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে, তারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সম্মান ও লালন করে কি না।’

















