ঈদে বাড়ি ফেরা হলো না, ১০ মিনিটের দূরত্বে নিভল সব স্বপ্ন

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ১৩: ১৭
স্ত্রী মুন্নি আক্তার ও একমাত্র সন্তান আয়ানের সঙ্গে শিক্ষক মনির হোসেনের একটি স্মৃতিবিজড়িত মুহূর্ত।
স্ত্রী মুন্নি আক্তার ও একমাত্র সন্তান আয়ানের সঙ্গে শিক্ষক মনির হোসেনের একটি স্মৃতিবিজড়িত মুহূর্ত।

মা-বাবার সঙ্গে কোরবানির ঈদ করবেন, একসঙ্গে হাটে গিয়ে কিনবেন ঈদের গরু—এমন কত শত আনন্দ আর স্বপ্ন বুকে নিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ মোটরসাইকেলে চড়ে গ্রামের বাড়ি ফিরছিলেন শিক্ষক মনির হোসেন। কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর মাত্র ১০ মিনিট আগে পিকআপের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিমিষেই নিভে গেল পুরো পরিবারের জীবনপ্রদীপ।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের অলওয়েদার সড়কে চালভর্তি পিকআপের চাপায় শিক্ষক মনির হোসেন (৩৫), তার স্ত্রী মুন্নি আক্তার (৩০) এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান আট বছর বয়সী ফুটফুটে শিশু আয়ানের এই নির্মম মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পৈতৃক ভিটায় যেখানে ঈদের আনন্দ উৎসবে মুখর হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ সাজানো তিনটি কফিনের পাশে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে মহিষের কান্দির আকাশ-বাতাস।

নিহত মনির হোসেন পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি করিমগঞ্জের নোয়াবাদ এলাকার সাইটুটা দাখিল মাদ্রাসার শারীরিক শিক্ষা বিভাগের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ শহরে অবস্থিত ‘অন্বেষা উচ্ছ্বাস কোচিং সেন্টার’-এর পরিচালক ছিলেন তিনি। ছাত্রজীবনে তিনি ওলি নেওয়াজ খান কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে মনির ছিলেন সবার বড়। তার ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম ইমন কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজে গণিত বিষয়ে অনার্সে অধ্যয়নরত এবং অপর ভাই মিলাদ হোসেন ইতালি প্রবাসী। ধানের ব্যবসায়ী বাবা সাফাজ উদ্দিন বেপারি ও গৃহিণী মা আনোয়ারা বেগমকে নিয়ে মনিরের একটি সুখী পরিবার ছিল।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনিরের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, 'সোমবার সকালেও মনিরের সাথে মোবাইলে কথা হয়েছিল। বলেছিল, দুপুরে খেয়েই বউ-বাচ্চাকে নিয়ে মোটরবাইকে করে গ্রামের বাড়ি মহিষের কান্দিতে আসবে। আজ মঙ্গলবার আমাদের সাথে মিঠামইন হাটে গিয়ে কোরবানির গরু কেনার কথা ছিল ওর। কিন্তু ঘাতক গাড়ির চাকা মুহূর্তেই আমার মনিরের সব আশা-ভরসা ভেঙে চুরমার করে দিল।' স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মনিরের আর বাড়ি ফেরা হলো না। চালবাহী একটি পিকআপ ভ্যান কেড়ে নিল তিনটি তাজা প্রাণ। একমাত্র সন্তান আয়ান আর স্ত্রী মুন্নিকে নিয়ে কত আশা আর আনন্দ বুকে জড়িয়ে পরিবারের সাথে ঈদ করতে আসছিল মনির, কিন্তু এক নিমেষেই নিভে গেল পুরো পরিবারের জীবনপ্রদীপ।

মনির হোসেন পরিবার ও শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন এক পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ মানুষ। তার স্ত্রী মুন্নি আক্তার ছিলেন সংসারের প্রাণকেন্দ্র আর আট বছরের ছোট শিশু আয়ান ছিল বাবা-মায়ের চোখের মণি।

মনিরের মামাতো ভাই ও প্রতিবেশী পল্লব হাসান বলেন, ‘আমরা একই সঙ্গে পড়াশোনা করে বড় হয়েছি। যতবার দেখা হতো, মনির আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করত। সবসময় বলত ওর কোচিং সেন্টারে যাওয়ার জন্য।’

তিনি আরও বলেন, কিশোরগঞ্জ থেকে দীর্ঘ দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এসে, মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বের কাছে হেরে গেল তিনটি তাজা প্রাণ। মা-বাবার সঙ্গে আর ঈদ করা হলো না তাদের। এই দুর্ঘটনায় পরিবারটির কোরবানির ঈদের সব আনন্দ এক নিমেষেই ম্লান হয়ে গেছে। বাড়ির উঠানে রাখা তিনটি কফিনের পাশে এখন শুধু স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি। ক্ষতবিক্ষত তিনটি লাশ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা-বাবাসহ প্রিয়জনেরা। এভাবেই চিরতরে সমাপ্তি ঘটল মনিরের একটি সুন্দর ও সাজানো স্বপ্নের।

স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, একই পরিবারের তিনটি তাজা প্রাণের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মহিষের কান্দি গ্রামে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস।

‘দুপুরে যে মানুষটি হাসিমুখে বাসা থেকে বের হলো, সন্ধ্যায় তার নিথর দেহ ফিরবে—তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি!’—কিশোরগঞ্জের অলওয়েদার সড়কে পিকআপ চাপায় নিহত ভাই ও ভাবির কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে এভাবেই চিৎকার করে কাঁদছিলেন ছোট ভাই আশরাফুল।

এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা শুধু তিনটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, নিমিষেই ধ্বংস করে দিয়েছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন আর আশা। ছোট্ট আয়ানের অসমাপ্ত শৈশব, মায়ের স্নেহ আর বাবা মনিরের সংগ্রামের গল্প এখন কেবলই স্মৃতি। সড়কের এক মুহূর্তের অব্যবস্থাপনায় তিনটি তাজা প্রাণের আলো নিভে যাওয়ার পর, নিহতদের গ্রামের বাড়ি মহিষের কান্দি মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জানাজায় ঢল নেমেছিল হাজারো শোকাতুর মানুষের।

রাজনীতি/এসআর

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement