হাইত— বিল শুকালে জেগে ওঠার উৎসব

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
নান্দাইলের চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের একটি বিলে হাইত আয়োজন করে মাছ ধরা হয়েছে। ছবি: রাজনীতি ডটকম
নান্দাইলের চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের একটি বিলে হাইত আয়োজন করে মাছ ধরা হয়েছে। ছবি: রাজনীতি ডটকম

কার্তিকের শেষে যখন খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি বুক থেকে হাঁটুতে নামে, ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার গ্রামাঞ্চলে কানাঘুষা শুরু হয়— এবারের হাইত কবে হবে?

হাইত কোনো ক্যালেন্ডারের উৎসব না। এর কোনো সরকারি তারিখ নেই। প্রকৃতিই এর দিনক্ষণ ঠিক করে দেয়। খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যখন কাদা ভেসে ওঠে, যখন পুঁটি, টাকি, শোল ও বোয়াল মাছগুলো ছোট ছোট ডোবায় আটকা পড়ে, তখনই গ্রামের লোকজন হাঁক দেন— অমুক দিন ভোরে হাইত। নিজেদের পকেটের টাক খরচা করে চারদিকে মাইক পাঠিয়ে হাইতের দিনক্ষণ প্রচার করেন।

নির্দিষ্ট দিনের ভোর হতে না হতেই বিলের দৃশ্যটা বদলে যায়। কে নেই সেখানে? হাতে পলো নিয়ে কিশোর, জাল কাঁধে যুবক, কোমরে খলই বাঁধা বৃদ্ধ, এমনকি শাড়ি গুটিয়ে কাদায় নেমে পড়ের বিলপাড়ের বউ-ঝিরাও। শহরের মানুষ যাকে বলে ‘কমিউনিটি ফিশিং’, সেটাই গ্রামের মানুষের কাছে হাইত।

ঢাক-ঢোলের আওয়াজ নেই, তবুও এটা উৎসব। বিলের পাড়ে দাঁড়ালে শুধু শোনা যায় হৈ...ওই খানে, ওইখানে, গেল গা! পলোর ঝপাৎ শব্দ, কাদায় পিছলে পড়ে হাসির রোল, আর একটা বড় শোল পেলে পুরো বিল কাঁপানো চিৎকার।

এরকম একটি হাইত হয়ে গেল মঙ্গলবার ভোরে নান্দাইল উপজেলার চন্ডীপাশা ইউনিয়নের জালিয়া বিলে। বিলপাড়ের বাসিন্দারাসহ দূর-দূরান্তের মৎস্য শিকারিরা জাল, জালি, পলো নিয়ে হাইতে যোগ দেন। এদের অনেকেই মাছ ধরতে পেরেছেন, আবার কেউ খালি হাতে ফিরেছেন। কিন্তু কারও আনন্দের কমতি নেই। যারা মাছ ধরতে পারেননি তারা আশায় থাকেন, সামনের কোনো বছরে হাইতে যোগ দিয়ে ধরতে পারবেন মাছ।

হাইতের এক অলিখিত নিয়ম আছে— এই মাছ কারও একার না। বিলের পানি যতদিন ছিল, ততদিন মাছ বড় হয়েছে সবার অগোচরে। পানি শুকালে তাই ভাগও সবার। কেউ একা জাল পাততে পারবে না। সবাই একসাথে নামবে।

আগে মুরুব্বিরা বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সীমানা দেখিয়ে দিতেন। তারপর একসঙ্গে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কাদায় ঝাঁপ। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ডোবা-নালা ছেঁকে মাছ উঠে আসে। টাকি, পুঁটি, চিংড়ি, কই, মাঝে মাঝে বড়ো বোয়ালও। মাছ ধরার চেয়েও বড় আয়োজন ভাগাভাগি।

বিলের পারেই কচু পাতার স্তূপ করা হয়। সমান ভাগ। যে পলো আনেনি, শুধু দেখতে এসেছে, সেও খালি হাতে ফেরে না। গ্রামের বিধবা চাচি, যিনি কাদায় নামতে পারেননি, তার ভাগটা বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। এটাই হাইতের প্রাণ।

এখন অনেক কিছু বদলে গেছে। খাল-বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে, ইটভাটার ট্রাক বিলের বুক চিরে যাচ্ছে। পানি আগের মতো থাকে না। সরকারি লিজে উন্মুক্ত জলাশয় এখন আর উন্মুক্ত নেই। তাই হাইতও কমে আসছে। তবু যে বছর বিলে পানি বেশি হয়, যে বছর খাল শুকায়, আজও ছেলে-বুড়ো পলো নিয়ে ছোটে।

কারণ হাইত শুধু মাছ ধরা না। এটা লোকজনকে মনে করিয়ে দেয়— আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, এখনো একসঙ্গে নামতে পারি, একসঙ্গে হাসতে পারি, আর পাওয়া জিনিসটা সমান ভাগে ভাগ করে নিতে পারি। এই শহুরে সময়ে, যেখানে সবকিছুই আমার আর তোমার, সেখানে হাইত শেখায়— বিলটা আমাদের সবার।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad