ঢাকার ৭ রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে বাস চলাচল শুরু
-2af723-480x270.webp)
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে সাতটি রুটে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি সাধারণ রুট এবং একটি চক্রাকার রুট। রোববার বেলা ১১টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী শিমুল বিশ্বাস।
নতুন ব্যবস্থায় চালু হওয়া ছয়টি সাধারণ রুট হলো— গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে ঢাকার আজিমপুর, মিরপুর থেকে কেরানীগঞ্জ, ঘাটারচর থেকে ডেমরা, ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর, ঘাটারচর থেকে ধউর এবং টঙ্গী থেকে আজিমপুর। অন্যদিকে চক্রাকার বাস চলবে মিরপুর-১ থেকে কচুক্ষেত, সৈনিক ক্লাব, জাহাঙ্গীর গেট ও আগারগাঁও হয়ে আনসার ক্যাম্প পর্যন্ত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিমুল বিশ্বাস বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হওয়া সাতটি রুটের কোনো কোনোটিতে ৩০০টি করে বাস রয়েছে। উন্নত বিশ্বের নগরগুলোর আদলে ঢাকার ৩২টি রুটের প্রতিটির বাসের জন্য আলাদা রং নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আজ শুধু ফটোসেশন করলাম আর পরে বন্ধ হয়ে যাবে— এমনটা হবে না।
তিনি আরও বলেন, “কায়েমি শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে অতীতে সব সরকার চাইলেও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে বিলম্ব হয়েছে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান নিয়ে সবাইকে প্রশ্ন ও জবাবদিহির আওতায় এনে পরিবর্তনকে দ্রুততর করেছেন।”
দীর্ঘদিন পরিবহন খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে শিমুল বিশ্বাস বলেন, “এ খাতের সীমাবদ্ধতা, দোষত্রুটি ও সমালোচনার জন্য প্রতি মুহূর্তে লজ্জাবোধ করি এবং আমরা আত্মসমালোচনা গ্রহণ করি। আমরা বৈরী সমালোচনা ও বকাবকি থেকে মানুষের দোয়ায় ফিরতে চাই।”

সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে অল্প কিছু মানুষ লাভবান হলেও শৃঙ্খলা ফিরলে বেশির ভাগ মানুষ উপকৃত হবে বলে মন্তব্য করেন শিমুল বিশ্বাস। তিনি বলেন, “ঢাকা নগরের অসহনীয় যানজট এবং জানমালের অনিরাপদ ব্যবস্থার অবসান সবাই চায়। আজ ব্যাটারিচালিত রিকশা বা টেসলা বাহিনী এবং রিকশা গোটা ঢাকা দখল করে রেখেছে।”
তিনি আরও বলেন, “গরিব মানুষের জন্য এগুলোর প্রয়োজন থাকলেও যানজটে আমাদের কত শ্রমঘণ্টা, সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে, তার হিসাব করলে মাথা ব্যথা হয়ে যাবে। ঢাকায় শৃঙ্খলা আনতে পারলে তা দেশের জিডিপি ও প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখবে।”
সড়কের বিশৃঙ্খলা দেশের ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিদেশিরা বিমানবন্দর থেকে নেমে সচিবালয় বা হোটেলে যাওয়ার পথে সড়কের বিশৃঙ্খলা দেখে কোনো মালিক, শ্রমিক বা দলকে নয়, গোটা বাংলাদেশ সম্পর্কেই রূঢ় মন্তব্য করে। তখন বাংলাদেশে বসবাসকারী সবাই তার অংশীদার হয়ে যায়। ঢাকা সুশৃঙ্খল হলে এর ঢেউ সারা দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে এবং মানুষ অন্যান্য অনিয়ম ও অরাজকতা দূর করতেও শক্তি পাবে।”
এ অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনের আগে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ স্থান ছিল উল্লেখ করে শিমুল বিশ্বাস বলেন, “সাড়ে তিনশ বছর আগে আমরা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলাম বলেই কবি ‘সুজলা সুফলা সোনার বাংলাদেশ’ লিখেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহ, দখল-বেদখল ও নিজেদের দুর্বলতায় আমরা আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, বার্মার আরাকান, বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমানা হারিয়েছি।”
অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও দুর্ঘটনা কমাতে ঢাকার ৯৮টি বাস রুট কমিয়ে ৩২টি মূল রুট করা হয়েছে। তিনি বলেন, “সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও দুর্ঘটনা রোধে ঢাকার ৯৮টি বাস রুটকে ৩২টি মূল রুটে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার মধ্যে আজ কম-বেশি ১৮টি ব্যানারের বাসকে ছয়টি কোম্পানির অধীনে এনে ছয়টি রুট চালু করা হলো।”
“পাশাপাশি শহরের ভেতরে নির্ধারিত ২৫টি চক্রাকার রুটের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে অনুমোদিত পাঁচটির মধ্যে এসি বাস দিয়ে একটি রুট আজ চালু হয়েছে; বাকি চারটি রুটের জন্য ২৭ আসনের মিনিবাসের ফরমাশ দেওয়া হয়েছে, যা আগামী দুই মাসের মধ্যে চালু হবে,” বলেন ডিএমপি কমিশনার।
নতুন ব্যবস্থায় বাসশ্রমিকদের চুক্তির পরিবর্তে বেতনভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব বাসমালিক ও শ্রমিক সমিতির কাছে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, দ্রুত ৩২টি রুটের বাসে আলাদা রং, রুট নম্বর ও ডিজিটাল বোর্ড যুক্ত করা হবে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, “এ কার্যক্রম কোনো পাইলট প্রজেক্ট নয়, এটি চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এবং এখান থেকে পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।” নতুন ব্যবস্থার বিরোধিতা করে সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে রাখলে সংশ্লিষ্ট ‘দুষ্কৃতকারীদের’ বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডিটিসিএ ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আরবান ট্রান্সপোর্ট অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আনিসুর রহমান, বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এম এ বাতেন এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম।
যেভাবে এল ফ্র্যাঞ্চাইজি বাসব্যবস্থা
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০১৫ সালে তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেন। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকার বাস চলাচলের রুটগুলো আট ভাগে ভাগ করে প্রতিটি রুটে আলাদা রঙের বাস চালানো হবে। তবে ২০১৭ সালে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর সেই উদ্যোগ থমকে যায়।
পরে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এতে ২৪৬টি বাস কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠন এবং ২৭৮টি রুট পুনর্বিন্যাস করে ২২টি রুট নির্ধারণের উদ্যোগ ছিল।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঘাটারচর-সাইনবোর্ড রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহন চালু করা হয়। তবে অন্য বাস কোম্পানিগুলোকে এ ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে ওই উদ্যোগও বন্ধ হয়ে যায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাস রুট রেশনালাইজেশনের কার্যক্রম থেমে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাসমালিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাড়া মেলেনি।
পরে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক বৈঠক করেন। এর ধারাবাহিকতায় ছয় মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসব্যবস্থা আংশিকভাবে চালু হলো।











-f3a338.jpg)




