বিরোধী দলে থাকতেই দাফনে বাধা, ক্ষমতায় গেলে কী করবেন— প্রশ্ন তাসনিম জারার

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা। বিরোধী দলে থেকেই যদি কারও নিজ বাড়িতে দাফনে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা হাতে পেলে তারা কী করবেন— এমন প্রশ্ন রেখেছেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দলটি ছেড়েছিলেন তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। পরে তিনি ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যান।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা লিখেছেন, “নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন।”
“কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?” লেখেন জারা।
পোস্টে দাফন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও সমাজের প্রচলিত রীতির কথাও তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তিনি লিখেছেন, “আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।”
মানিক পশারীর মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি লেখেন, “শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারা দিন তাঁর পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাঁকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।
জারা লেখেন, “তাঁর জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল। মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।’ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃতব্যাক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।”
“অবশেষে মাঝরাতের পর পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না,” যোগ করেন তিনি।
মানিক পশারীর দাফন নিয়ে জামায়াত নেতাকর্মীদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তাসনিম জারা বলেন, “মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেয়া হবে না’ এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাঁদের কাছ থেকে নিতে হবে।”
তাসনিম জারা লেখেন, “ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথে সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন।”
মানিক পশারী গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে তাসনিম জারা লিখেছেন, “পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাঁকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।”
তিনি আরও লেখেন, “মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তাঁরা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।”
পোস্টের শেষাংশে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে তাসনিম জারা লেখেন, “একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।”
পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে ছিলেন। দুই মাস অসুস্থ থাকার পর শনিবার সকাল ১০টার দিকে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বজনরা তাঁর মরদেহ দুপুর ১২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসলে জেলা জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন।
মানিক পশারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন। এতে তার মরদেহে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে এবং পিরোজপুরে কবর দিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা বাধা প্রদান করে বলে অভিযোগ করেন তার স্বজনরা।
পরে পিরোজপুর জেলা পুলিশের সহায়তায় লাশ সরিয়ে নেওয়া হয় পুলিশ লাইনসে। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে ‘গার্ড অফ অনার’ শেষে নিরাপত্তায় লাশ ঘিরে রাখা হয়। তবে স্থানীয় কিছু লোক পিরোজপুরে তাঁকে দাফন না করার দাবি তোলেন। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের অবস্থান করতেও দেখা যায়।
পরে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশের সহায়তায় মানিক পশারীর লাশ চিতলিয়া গ্রামের বাড়ি নিয়ে যান স্বজনরা। সেখানে রাত ২টার দিকে পুলিশি পাহারায় তার দাফন করেন স্বজনরা। দিনভর উত্তেজনার মধ্যে পিরোজপুরে মরদেহ পৌঁছানোর প্রায় ১৪ ঘণ্টা পরে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
উল্লেখ্য, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
















