আ.লীগের কাছে বিএনপি ভোট ভিক্ষা চেয়েছে: শফিকুর রহমান

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আ.লীগের কাছে বিএনপি ভোট ভিক্ষা চেয়েছে: শফিকুর রহমান

নির্বাচনের সময় বিএনপি আওয়ামী লীগের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার চাঁদাবাজি, দখলদারি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং নিজেদের ব্যর্থতার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছে। জামায়াতকে পরিত্যক্ত ফ্যাসিস্টের সঙ্গে হাত মেলানোর অভিযোগ করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করেন।

তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের সময় বিএনপি আওয়ামী লীগের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছিল। শেখ হাসিনার বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, হাতেপায়ে ধরে ভোট নেওয়ার পর এখন কেন বেইমানি করা হচ্ছে, এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের আরেক নেতার বক্তব্য উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, অন্তত ৯৫টি আসনে বিএনপিকে আওয়ামী লীগ ভোট দিয়ে জিতিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।

জামায়াতের আমির আরও বলেন, নাটোরের বিএনপির একজন সংসদ সদস্যও দলের সাফল্যের পেছনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবদানের কথা বলেছেন এবং তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অথচ নিজের দল বিএনপিকে ধন্যবাদ দিতে পারেননি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও করেন শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, একদিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসার কথা বলে জামায়াতের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

তিনি প্রশ্ন করেন, সীমান্ত দিয়ে টাকা, অস্ত্র ও মাদক প্রবেশ ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ হলে দেশ শাসনের অধিকার কীভাবে থাকে? তাঁর ভাষায়, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে অক্ষম সরকারের দেশ পরিচালনার অধিকার নেই।

চাঁদাবাজি ও দখলদারি নিয়ে অভিযোগ

সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণকে কার্ড দেওয়ার কথা বলা হলেও কতজনকে দেওয়া হয়েছে এবং কবে দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়। এর মধ্যে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা ও দুর্নীতির চাপ বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

প্রবাসে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশে ফেরা এসব মানুষের জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। দেশের মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করারও কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাজারদরের উদাহরণ দিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, চাঁদাবাজির কারণে মানুষ এক টাকার জিনিস তিন টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছে। দুই দিন আগে গণমাধ্যমে পঞ্চগড়ে চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রির খবর দেখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, উপযুক্ত দাম না পেয়ে কৃষকেরা লাউ খাল-বিলে ফেলে দিচ্ছেন। অথচ রাজধানীতে একটি লাউ কিনতে ৪০ থেকে ৬০ টাকা লাগে বলে দাবি করেন তিনি।

চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে অভিযোগ করে শফিকুর রহমান রাড্ডা মেডিকেল সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে জনগণকে উন্মুক্ত সেবা দিয়ে আসছিল। সেখানে হামলার ঘটনায় একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করানো হলেও তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।

তিনি প্রশ্ন করেন, অপরাধের পর শুধু পদত্যাগ করালেই কি দায় শেষ হয়ে যায়? আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। জনগণকে বোকা না ভাবার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষ সবকিছু বোঝে।

বিএনপির ভেতরেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, দলের দীর্ঘদিনের কর্মীরাও এখন চাঁদার দাবির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ করছেন। তাঁর ভাষ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিজেদের লোকজনও এর শিকার হচ্ছেন।

সরকারের সমালোচনা, দায়িত্ব পালনের আহ্বান

সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সাত মাসের সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি জানতে হবে, এত দ্রুত আন্দোলনে নামার কারণ কী এবং ৭০ শতাংশ মানুষের রায় কেন অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় দলীয় ক্যাডারদের বসানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন সাহেবের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে পারদর্শী হলেও নিজের মন্ত্রণালয় দেখার সুযোগ পান না বলে মনে হয়। সংসদে তাঁর দলের একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, মাদকের বড় চালান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকার মধ্য দিয়ে আসে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

দিনের বেলায় ৫০টি ট্রাকে ডাকাতির ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে সরকারের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। তা না পারলে সরকারকে সরে দাঁড়ানোর কথাও বলেন জামায়াতের আমির।

‘জনগণের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন’

শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত বা ১১-দলীয় জোট কোনো দলীয় দাবি নিয়ে মাঠে নামেনি; তারা জনগণের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। তাঁদের প্রতিটি দাবি জনগণের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব দাবি বাস্তবায়নে কর্মসূচি বন্ধ রাখার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, জন্মের সঙ্গে মৃত্যু জড়িত—এ কথা তাঁরা জানেন। তবে অপমানজনক মৃত্যু নয়, জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান। তাঁদের নেতারা কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করেননি উল্লেখ করে তিনিও মাথা নত না করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

প্রথম লংমার্চের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, ভারত নিয়ে আগে নানা হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছিল এবং লংমার্চে জনগণের সাড়া নেই বলে দাবি করা হয়েছিল। জনগণের সাড়া না থাকলে এ নিয়ে এত উদ্বেগ কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, জনগণের অংশগ্রহণই এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেবে।

তিনি আরও বলেন, জামায়াত নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করছে এবং বিশৃঙ্খলায় বিশ্বাস করে না। কেউ যেন তাদের ওপর বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করেন, সেই আহ্বান জানান তিনি।

গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, এর মধ্য দিয়ে জনগণ অতীতের ‘গুনে ধরা’ ও ‘বস্তাপচা’ রাজনীতি আর দেখতে চান না বলে জানিয়েছেন। জনগণ পরিবর্তন ও সংস্কার চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad