দেশভাগের পর প্রথম ডিব্রুগড় থেকে নৌপথে পণ্য, ব্রহ্মপুত্রকে করিডর করতে চায় ভারত
-2e39ee.jpg)
দেশভাগের প্রায় ৮০ বছর পর ভারতের আসামের ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে আবারও বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে ‘ডিএলবি পাটকাই’ নামের জাহাজটির যাত্রার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এই নৌপথকে নতুন করে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদকে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও যাচাই করছে দেশটি।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ডেকান হেরাল্ডের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার (৫ অক্টোবর) আসামের বোগিবিল থেকে জাহাজটির যাত্রা উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় জাহাজ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।
ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশে পাঠানো মিথানল উৎপাদন করেছে আসামের নামরুপে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড (এপিসিএল)। এই মিথানল বাংলাদেশের ঢাকার পানগাঁও বন্দরে নেওয়া হবে, যা বহনকারী জাহাজটি বোগিবিল থেকে ব্রহ্মপুত্রের ওপর ভারতের জাতীয় নৌপথ-২ ধরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ধুবড়ি হয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে।
এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট (আইবিপিআর) ধরে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকার দিকে যাবে জাহাজটি। বোগিবিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত জাহাজটি মোট প্রায় এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে।
ভারতের কর্মকর্তারা বলছেন, এই যাত্রা মূলত ব্রহ্মপুত্রকে একটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর পণ্য পরিবহন করিডর হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশভাগে থেমে যায় যে নৌপথ
ডিব্রুগড়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ও কলকাতার নদীপথের যোগাযোগ নতুন নয়। ব্রিটিশ আমলে ডিব্রুগড় ছিল পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর। চা, কাঠ, কয়লা ও যাত্রী পরিবহনে ব্রহ্মপুত্রের এই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
১৮৫৬ সালেই সরকারি স্টিমার কলকাতা থেকে ডিব্রুগড়ে যাতায়াত শুরু করে। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড়ের স্টিমার ঘাট থেকে ডিব্রু-সাদিয়া রেলপথ চালু হয়। ১৯১৩ সালের দিকে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে প্রতিদিন ডিব্রুগড় পর্যন্ত স্টিমার চলাচল করত। এসব নৌযানে চা, কাঠ, কয়লা ও যাত্রী পরিবহন করা হতো।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ সেই যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দেয়। ডিব্রুগড় থেকে কলকাতায় পণ্য পরিবহনের নদীপথটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে যেত। ফলে ভারত ভাগের পর এই বাণিজ্যিক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড় এলাকায় নদীর তলদেশেও পরিবর্তন আসে। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় নদীবন্দর থেকে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর বন্দরটির ঘাটও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে চা পরিবহনে রেলপথের ব্যবহার বাড়তে থাকে। পরে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ আন্তসীমান্ত নদীপথের বাণিজ্য আরও স্থগিত করে।
সোমবার ডিব্রুগড় থেকে মিথানলবাহী জাহাজের যাত্রা উদ্বোধন করা ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের বেড়ে ওঠাও এই ডিব্রুগড়েই। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুরোনো সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তার দাদা-নানাদের প্রজন্ম ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে বড় হয়েছে। ঘাট বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ৭০ বছর সেই বাঁশি আর শোনা যায়নি। এখন আবার ডিব্রুগড় থেকে একটি জাহাজ বিশ্বের দিকে যাত্রা করছে।
বাংলাদেশ হয়ে ফের খুলছে পথ
ভারত ও বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে নদীপথে বাণিজ্য ও নৌপরিবহন নিয়ে প্রটোকল সই করে। পরে ব্রহ্মপুত্রের সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত প্রায় ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ১৯৮৮ সালে ভারতের জাতীয় নৌপথ-২ ঘোষণা করা হয়।
তবে এই জলপথে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হতে আরও বহু বছর লেগে যায়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গুয়াহাটির পান্ডু থেকে পশ্চিম আসামের ধুবড়ি পর্যন্ত সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে নিয়মিত কার্গো চলাচল শুরু হয়।
এরপর ধীরে ধীরে এই পথের ব্যবহার বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে বারাণসী থেকে বাংলাদেশের নদীপথ ব্যবহার করে ডিব্রুগড় পর্যন্ত যায় পর্যটনবাহী জাহাজ ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’।
বোগিবিলের যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। সেটি চালু হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সম্প্রতি বোগিবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও অভিবাসন-সংক্রান্ত অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার পরই এবার আসামের পণ্য সরাসরি বাংলাদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আসামের পণ্য যাবে আন্তর্জাতিক বাজারে
ভারতের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু বাংলাদেশে মিথানল পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশটির লক্ষ্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে নদীপথের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, নামরুপে উৎপাদিত আসামের নিজস্ব পণ্য আসামের নিজস্ব নদীপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে৷ এটি তাৎপর্যপূর্ণ। তার ভাষায়, উত্তরপূর্ব ভারত এখন আর ভারতের ‘প্রান্তসীমা’ নয়, বরং পূর্বের দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার।
সোনোয়ালও ডিব্রুগড়ের পুরোনো নদীবন্দরকে নতুন করে গড়ে তোলার কথা বলেন। তার দাবি, চা উৎপাদনের জন্য ‘ভারতের চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে তার পুরোনো অবস্থান ফিরে পাচ্ছে।
ব্রহ্মপুত্রকে পণ্য পরিবহনের করিডর করার পরিকল্পনা
ভারতীয় কর্মকর্তাদের কাছে এবারের মিথানল পরিবহন একটি বড় পরীক্ষাও। তারা দেখতে চাইছেন, ব্রহ্মপুত্রকে নিয়মিত ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না।
এই পরিকল্পনা সফল হলে উত্তরপূর্ব ভারতের শিল্প ও কৃষিপণ্য বাংলাদেশ হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সড়কপথে পণ্য পরিবহনের ওপর চাপ কমানো এবং পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি ব্যবহার কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সোনোয়ালের ভাষায়, নদীপথে পণ্য পরিবহনের অর্থ কম জ্বালানি পোড়ানো এবং মহাসড়কে কম ট্রাক চলাচল করা।
ভারতের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় নৌপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের এক কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। উত্তরপূর্বাঞ্চলের নৌপথ উন্নয়নে ভারত ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে জাতাইয় নৌপথ-২ উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামতকেন্দ্র এবং পান্ডু বন্দরের সঙ্গে শেষ মাইলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন রয়েছে।
ভারত একই সঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক নৌপথের সংযোগ বাড়ানোর কাজ করছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন তাৎপর্য
দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে এই বাণিজ্যিক চালান পাঠানো হলো। ফলে ঘটনাটিকে কেবল একটি পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আবার এটি বাংলাদেশ-ভারত নদীপথ বাণিজ্যের নতুন কোনো চুক্তির সূচনাও নয়, বরং ১৯৭২ সাল থেকে বিদ্যমান দুই দেশের নদীপথ-সংক্রান্ত প্রটোকল ও জলপথ অবকাঠামো ব্যবহার করে উত্তরপূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মাধ্যমে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও গভীর করার উদ্যোগ। দুই দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, বাণিজ্যের এই উদ্যোগ তাতে কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



















-54d74f-256x144.webp)



