৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ‘ম্যাগনা কার্টা’, চিরকাল প্রাসঙ্গিক থাকবে: প্রধানমন্ত্রী
-67bd15-480x270.webp)
৭ নভেম্বরকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পরিচয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ভিত্তি তৈরি করেছিল এই দিন। তাই বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব ও তাৎপর্যও প্রাসঙ্গিক থাকবে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), ক্যাডেট ও স্কাউটদের উদ্দেশে তিনি বক্তব্য দেন।
তারেক রহমান বলেন, “সাতই নভেম্বর হলো স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ম্যাগনা কার্টা। দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী— যারা এই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন, নাগরিক হিসেবে সবার একটাই পরিচয়— আমরা বাংলাদেশি। এই পরিচয়ে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করেছিল।”
তিনি বলেন, “ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর আমরা বাংলাদেশি পরিচয় নির্ধারণের জন্য ভিত্তিভূমিও রচনা করেছিল। সুতরাং যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বরের নায়ক দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করার মতোই ৭ নভেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, “আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষকের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।”
‘সবার আগে বাংলাদেশ’
তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; সত্য ইতিহাস জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রেরণা।
তিনি বলেন, “আজকের এই আয়োজনের বিশেষত্ব হল— আমাদের হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী যারা এই স্টেডিয়ামে ৭ নভেম্বরকে ঘিরে যেভাবে নির্মোহভাবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ডিসপ্লে করেছেন; আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ইতিহাস সচেতন এই প্রজন্ম ৭ নভেম্বরের প্রেরণায় উজ্জীবিত এবং ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ আর পথ হারাবে না।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে দেশের তরুণেরা জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত নয়, সেই দেশের জনগণের ঐক্য সুদৃঢ় হতে পারে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তরুণেরা বাংলাদেশের স্বার্থে আপসহীন থাকার প্রমাণ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে আর যাতে কেউ দেশ এবং জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে, দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে; এটি হোক এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে হলে আমাদেরকে ৭ নভেম্বরের মতো সিপাহী-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে।”
স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে রাখাকে প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তরুণদের দায়িত্ব হলো স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ধারণ করে নিরাপদ, সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে কাজ করা। আর অভিভাবকদের দায়িত্ব, তরুণদের সম্ভাবনা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বদ্ধপরিকর।
‘৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের বাতিঘর’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৭ নভেম্বর তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল।
তিনি বলেন, “১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত চরম আকার ধারণ করেছিল। এই চক্রান্তের পথ ধরেই দোসরা নভেম্বর দিবাগত মধ্যরাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গৃহবন্দি করা হয়েছিল।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “স্বাধীনতার ঘোষককে কারাবন্দি রেখে দেশের স্বার্থবিরোধী যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে সেই চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল। এ কারণেই দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের চেতনার বাতিঘর।”
তারেক রহমানের ভাষ্য, যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে তাদের পরাজয় ঘটে। সশস্ত্র বাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টাও সেদিন প্রতিহত হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন জিয়াউর রহমান। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান হলে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। ৭ নভেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সঙ্গে যুক্ত কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থানে তিনি মুক্ত হন। এরপর দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি।
বিএনপি দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় দিবসের তালিকা থেকে এটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। গত ১৬ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে দিবসটি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত হয়।
‘ষড়যন্ত্র কখনোই থেমে থাকেনি’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বরের পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র এরপরও অব্যাহত ছিল। তার ভাষ্য, মহাজোটের নামে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা দেশকে আবারও তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে। বিডিআর পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয় এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
তিনি বলেন, “হাজারো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে বীর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালে পুনরায় ৭ নভেম্বরের সেই পরাজিত অপশক্তির পরাজয় ঘটেছে। দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে যারা হতাহত হয়েছেন, ২০২৪ সালের বীর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, আজকের এই দিনে আমি তাদের অবদানকেও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।”
১৯৭১ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, “১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। ২০২৪ ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও প্রায় একইভাবে সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে এসে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “সময়ের সাথে সাথে প্রমাণিত হয়েছে, দেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ণয়ের দিন। যতবার বাংলাদেশ ৭ নভেম্বরের পথরেখা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, ততবার দেশ এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।”
বক্তব্যের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের ঐতিহাসিক এই দিনে দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’”
এর আগে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে আর্মি স্টেডিয়ামে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও স্কাউট সদস্যরা বিভিন্ন ডিসপ্লে প্রদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান গ্যালারিতে বসে এসব পরিবেশনা উপভোগ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ, সিপাহী-জনতার বিপ্লব, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামল এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন শিশু-কিশোর ও স্কাউট সদস্যরা। পরে গ্যালারি থেকে মঞ্চে এসে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল খোন্দকার মেজবাহউল আজীমসহ তিন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


-7a27e0.jpg)


-350d76.jpg)












