দেশের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক হাব হবে মোংলা বন্দর: প্রধানমন্ত্রী

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের মোংলায় ‘বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও
বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের মোংলায় ‘বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও

মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, এই বন্দরকে ঘিরে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ আশপাশের জেলাগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পাশাপাশি পঞ্চগড় থেকে মোংলা পর্যন্ত পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে চায় সরকার।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাগেরহাটের মোংলায় ‘বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “মোংলা বন্দর দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক হাব বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এ বন্দরকে কেন্দ্র করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোরসহ এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করা সম্ভব।”

“শুধু তাই নয়, পঞ্চগড় থেকে মোংলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, বন্দরের সাপ্লাই চেইন এবং পণ্য পরিবহন সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ বর্তমান সরকার গ্রহণ করতে চায়,” বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, “খান জাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন এবং কার্যক্রম আমাদের অন্যতম প্রায়োরিটি। বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় জ্বালানি এবং খাদ্য নিরাপত্তা সর্বাগ্রে কার্যকর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দর জ্বালানি, সার, খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় পণ্য রপ্তানিতে দেশের একটি পরিপূরক বন্দর হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আরও সমৃদ্ধ করতে পারে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।”

তিনি বলেন, “আজকের এই উদ্যোগ দেশের শিল্প বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আস্থা এবং আঞ্চলিক সুষম উন্নয়নে টেকসই আর্থসামাজিক মূল্য সংযোজন করবে।” বাংলাদেশের অবকাঠামো ও বাণিজ্য উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখায় চীন সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

সরকারপ্রধানের উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১১টার দিকে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মোংলা বন্দরে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি মোংলা বন্দরে চলাচল করতে পারবে বলে জানান তিনি।

প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মোংলা বন্দরের মডার্নাইজেশন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড এবং কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এই বন্দরের আধুনিকায়নের কাজ সঠিক সময়ে সম্পন্ন হলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে ইনশাল্লাহ এবং শুধু এই অঞ্চলেই নয়, সারাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন, প্রকল্পের সাফল্য শুধুমাত্র নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বন্দর সেবার মান কতটা উন্নত হল, পণ্য পরিবহনের সময় এবং ব্যয় কতটা হ্রাস পেল, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান কতটা বৃদ্ধি পেল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল, তার ওপরই যে কোনো প্রকল্পের সত্যিকারের সাফল্য নির্ভর করে।”

বন্দর পরিচালনায় পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, “পরিবেশবান্ধব সেবা ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজের নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তার মানদণ্ড অনুসরণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে অবশ্যই আমাদের।”

তারেক রহমান বলেন, “বিপজ্জনক কার্যক্রম ব্যবস্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতাও গড়ে তোলা অবশ্যই আমাদের প্রয়োজন।”

দেশের অর্থনীতিকে ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি এবং খাদ্য নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “দেশের স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীজন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আমি উদাত্ত আহ্বান জানাই। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, সহজ সেবা প্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনার একটি ধাপ মাত্র। সুতরাং বন্দরের নাব্যতা, নৌ চ্যানেলের নির্ভরযোগ্যতা, জাহাজের নিরাপদ চলাচল, প্রতিযোগিতামূলক বন্দর সেবা নিশ্চিত করা অবশ্যই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।”

“আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে মোংলা বন্দরকে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরা, উপযুক্ত বাণিজ্যিক এবং পরিচালনাগত শর্তে ফার্স্ট কলিং পোর্ট হিসেবে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি,” বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে শিল্পায়ন বাড়াতে এ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, “আগামী কিছুদিনের মধ্যে যত দ্রুত সময়… সময়টা আমি বলতে চাচ্ছি না বা দ্রুততম সময়ের মধ্যে যারা বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত আছেন, আপনারা যারা আরও নতুন ইন্ডাস্ট্রি করতে পারি, সেজন্য আমরা গ্যাস কীভাবে এখানে আপনাদেরকে আমরা দিতে পারি, গ্যাস কীভাবে নিয়ে আসতে পারি— আমরা কাজ করছি, উদ্যোগ গ্রহণ করছি।”

তিনি বলেন, “শিল্পে আমরা গ্যাস সরবরাহ করতে চাই, সেটার জন্য আমরা অলরেডি কাজ শুরু করেছি। একটা সময় ছিল, যখন এই অঞ্চলে অনেক মিল ফ্যাক্টরি ছিল; খুলনা অঞ্চলে অনেক মিল ফ্যাক্টরি ছিল… আমরা চাই, সেই পুরনো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যটাকে আবার ফিরে নিয়ে আসতে।”

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এবং চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের চেয়ারম্যান দাই হেগেন।

অনুষ্ঠান শেষে বন্দরে একটি কাঠবাদাম গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad