
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে বড় ধরনের মূল্য দিতে হয়েছে হিজবুল্লাহকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দুই দিনের মাথায় (২ মার্চ) ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর থেকে দক্ষিণ লেবাননের একটি অংশ দখল করেছে ইসরায়েল, বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো শিয়া মুসলিম সমর্থক এবং নিহত হয়েছে সংগঠনটির কয়েক হাজার যোদ্ধা— এমনটাই জানিয়েছে হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে পাওয়া হতাহতের হিসাব।
রোববার (৩ মার্চ) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুদ্ধে জড়িয়ে রাজনৈতিকভাবেও বড় ধাক্কা খেয়েছে সংগঠনটি। বৈরুতে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে হিজবুল্লাহর অবস্থানের বিরুদ্ধে বিরোধিতা আরও জোরালো হয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মনে করছে, হিজবুল্লাহর কর্মকাণ্ড লেবাননকে বারবার ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলছে।
এপ্রিল মাসে লেবানন সরকার কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসে, যার তীব্র বিরোধিতা করে হিজবুল্লাহ।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিজবুল্লাহর কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা মনে করছেন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের দুর্বল হয়ে পড়া অবস্থান পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৯৮২ সালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এই সশস্ত্র সংগঠনটি।
হিজবুল্লাহর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে অংশ নিলে লেবাননের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসবে এবং তেহরানের চাপের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাতের পর যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তার চেয়ে কার্যকর সমঝোতা চায় সংগঠনটি।
গত যুদ্ধ হিজবুল্লাহকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দেয়। নিহত হন সংগঠনটির প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ প্রায় ৫ হাজার যোদ্ধা। একই সঙ্গে লেবাননের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর দীর্ঘদিনের প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়ে।

রয়টার্স বলছে, ইরানের সহায়তায় পুনরায় সশস্ত্র হয়ে নতুন কৌশল ও ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে হিজবুল্লাহ। ১৫ মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সময় তারা হামলা বন্ধ রাখলেও ইসরায়েল তাদের সদস্যদের হত্যা অব্যাহত রাখে। এরপর নতুন সক্ষমতা দেখিয়ে অনেককে বিস্মিত করেছে সংগঠনটি।
হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম আল-মুসাভি বিরোধীদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংগঠনটি ইরানের হয়ে যুদ্ধ করছে না। রয়টার্সকে তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ এমন একটি সুযোগ দেখেছে, যার মাধ্যমে ‘এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব— যেখানে ইসরায়েল হামলা, হত্যা ও বোমাবর্ষণ চালায়, অথচ কোনো প্রতিশোধ হয় না।’
দক্ষিণ লেবাননে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের কথা স্বীকার করলেও তিনি বলেন, ‘সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্ন এলে কতজন নিহত হবে, সেই হিসাব করে যুদ্ধে যাওয়া হয় না।’
১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা কমলেও দক্ষিণাঞ্চলে এখনো পালটাপালটি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। সেখানে ইসরায়েল নিজেদের ঘোষিত ‘বাফার জোনে’ সেনা মোতায়েন রেখেছে।
বৈরুতভিত্তিক কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়েজিদ সায়েগ বলেন, ‘অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে হিজবুল্লাহ, তবে এটিকে কৌশলগত সাফল্য বলা যাবে না।’
তার ভাষায়, ‘ইসরায়েলকে থামাতে পারে একমাত্র একটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তি। সমঝোতা না হলে সবার জন্যই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো ক্ষয়ক্ষতির এক অচলাবস্থা।’
দ্রুত খোঁড়া হচ্ছে কবর, দ্রুতই ভরছে লাশে
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চের পর থেকে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নারী, শিশু ও চিকিৎসাকর্মী। তবে মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বেসামরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
দুজন হিজবুল্লাহ কর্মকর্তাসহ আরও একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবেও সংগঠনটির বহু হতাহতের তথ্য নেই। তাদের দাবি, কয়েক হাজার হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছে, যদিও পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো সংগঠনটির কাছেও নেই।

হিজবুল্লাহর এক কমান্ডার জানান, বহু যোদ্ধা বিনত জবেইল ও খিয়াম শহরে 'মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই' করার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল। তাদের অনেকের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই দ্রুত খোঁড়া দুই ডজনের বেশি নতুন কবর যোদ্ধাদের মরদেহে ভরে যায়। কবরের পাশে সাধারণ মার্বেল পাথরে কোথাও ‘কমান্ডার’, কোথাও ‘যোদ্ধা’ লেখা।
শুধু দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রাম ইয়াতেরেই স্থানীয় কাউন্সিল ৩৪ জন হিজবুল্লাহ যোদ্ধার মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে।
ইসরায়েলি হামলার সবচেয়ে বড় ধাক্কা বহন করছে লেবাননের শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়। তারা বাধ্য হয়ে খ্রিস্টান, দ্রুজ ও অন্যান্য অঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে, যেখানে অনেকেই যুদ্ধ শুরুর জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করছেন।
ইসরায়েল বলছে, বেসামরিক এলাকায় অবস্থান নেওয়া হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের হামলা ঠেকাতে তারা উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। এ জন্য লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত নিরাপত্তা বলয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো ধ্বংস করছে।
একজন ইসরায়েলি সরকারি কর্মকর্তা দাবি করেন, ২ মার্চ ইসরায়েলি নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, উত্তর ইসরায়েলের প্রতি হুমকি পুরোপুরি নির্মূল করা হবে। তার দাবি, হাজারো হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সংগঠনটির অবকাঠামো ধ্বংস করছে ইসরায়েল।
ইসরায়োলি সেনাবাহিনীর দাবি, ২ মার্চের পর থেকে হিজবুল্লাহ শত শত রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ১৭ সেনা এবং উত্তর ইসরায়েলে দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্যও দিয়েছে তারা।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিকে 'অর্থহীন' অভিহিত করে হিজবুল্লাহ পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
‘ইরান তার বন্ধুদের বিক্রি করবে না’
হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে— এমন এক কূটনীতিক সংগঠনটির যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তকে বড় ধরনের জুয়া এবং টিকে থাকার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, হিজবুল্লাহ মনে করেছে, 'সমস্যার অংশ' হতে পারলে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সমাধানেরও অংশ হওয়া যাবে।
তবে এই কৌশল সফল হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তেহরান দাবি করেছে, বৃহত্তর যুদ্ধ নিয়ে যেকোনো চুক্তিতে হিজবুল্লাহবিরোধী ইসরায়েলি অভিযানও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যেকোনো চুক্তি ‘কোনোভাবেই লেবাননের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়’।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি রয়টার্সকে ১৬ এপ্রিলের এক বিবৃতির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, তাদের আশঙ্কা— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শেষ পর্যন্ত এমন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে লেবাননের যুদ্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তই থাকবে না।
তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানের মিশন এবং লেবানন সরকার তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
হিজবুল্লাহ নেতা মুসাভি বলেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি এখনো ইরানের শীর্ষ অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, তেহরান লেবাননের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত— যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ ও লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার। তার ভাষায়, ‘ইরানের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে— ইরান কখনোই তাদের বন্ধুদের বিক্রি করবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ২৭ এপ্রিল ফক্স নিউজে মার্কো রুবিওর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে। সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হিজবুল্লাহর হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন না, ইসরায়েল অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে তাদের বাফার জোন ধরে রাখতে চায়।
রুবিও আরও বলেন, ‘প্রতিক্রিয়া যেন লক্ষ্যভিত্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়’, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সে আহ্বান জানিয়েছে।
১৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, লেবাননের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ একটি মৌলিক শর্ত হবে।
তবে হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, অস্ত্রের বিষয়টি জাতীয় সংলাপের আলোচ্য বিষয়। জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা করলে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশটিতে নতুন সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গত বছর থেকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম শান্তিপূর্ণভাবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২ মার্চ সরকার সংগঠনটির সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
এর জবাবে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা বন্ধের দাবি জানিয়েছে হিজবুল্লাহ।
লেবাননের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ। কারণ, এসব লক্ষ্য অর্জনে ইসরায়েলের ওপর যথেষ্ট প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা কেবল ওয়াশিংটনেরই রয়েছে।
রাজনীতি/আইআর

ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে বড় ধরনের মূল্য দিতে হয়েছে হিজবুল্লাহকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দুই দিনের মাথায় (২ মার্চ) ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর থেকে দক্ষিণ লেবাননের একটি অংশ দখল করেছে ইসরায়েল, বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো শিয়া মুসলিম সমর্থক এবং নিহত হয়েছে সংগঠনটির কয়েক হাজার যোদ্ধা— এমনটাই জানিয়েছে হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে পাওয়া হতাহতের হিসাব।
রোববার (৩ মার্চ) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুদ্ধে জড়িয়ে রাজনৈতিকভাবেও বড় ধাক্কা খেয়েছে সংগঠনটি। বৈরুতে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে হিজবুল্লাহর অবস্থানের বিরুদ্ধে বিরোধিতা আরও জোরালো হয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মনে করছে, হিজবুল্লাহর কর্মকাণ্ড লেবাননকে বারবার ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলছে।
এপ্রিল মাসে লেবানন সরকার কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসে, যার তীব্র বিরোধিতা করে হিজবুল্লাহ।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিজবুল্লাহর কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা মনে করছেন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের দুর্বল হয়ে পড়া অবস্থান পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৯৮২ সালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এই সশস্ত্র সংগঠনটি।
হিজবুল্লাহর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে অংশ নিলে লেবাননের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসবে এবং তেহরানের চাপের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাতের পর যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তার চেয়ে কার্যকর সমঝোতা চায় সংগঠনটি।
গত যুদ্ধ হিজবুল্লাহকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দেয়। নিহত হন সংগঠনটির প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ প্রায় ৫ হাজার যোদ্ধা। একই সঙ্গে লেবাননের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর দীর্ঘদিনের প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়ে।

রয়টার্স বলছে, ইরানের সহায়তায় পুনরায় সশস্ত্র হয়ে নতুন কৌশল ও ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে হিজবুল্লাহ। ১৫ মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সময় তারা হামলা বন্ধ রাখলেও ইসরায়েল তাদের সদস্যদের হত্যা অব্যাহত রাখে। এরপর নতুন সক্ষমতা দেখিয়ে অনেককে বিস্মিত করেছে সংগঠনটি।
হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম আল-মুসাভি বিরোধীদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংগঠনটি ইরানের হয়ে যুদ্ধ করছে না। রয়টার্সকে তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ এমন একটি সুযোগ দেখেছে, যার মাধ্যমে ‘এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব— যেখানে ইসরায়েল হামলা, হত্যা ও বোমাবর্ষণ চালায়, অথচ কোনো প্রতিশোধ হয় না।’
দক্ষিণ লেবাননে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের কথা স্বীকার করলেও তিনি বলেন, ‘সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্ন এলে কতজন নিহত হবে, সেই হিসাব করে যুদ্ধে যাওয়া হয় না।’
১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা কমলেও দক্ষিণাঞ্চলে এখনো পালটাপালটি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। সেখানে ইসরায়েল নিজেদের ঘোষিত ‘বাফার জোনে’ সেনা মোতায়েন রেখেছে।
বৈরুতভিত্তিক কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়েজিদ সায়েগ বলেন, ‘অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে হিজবুল্লাহ, তবে এটিকে কৌশলগত সাফল্য বলা যাবে না।’
তার ভাষায়, ‘ইসরায়েলকে থামাতে পারে একমাত্র একটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তি। সমঝোতা না হলে সবার জন্যই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো ক্ষয়ক্ষতির এক অচলাবস্থা।’
দ্রুত খোঁড়া হচ্ছে কবর, দ্রুতই ভরছে লাশে
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চের পর থেকে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নারী, শিশু ও চিকিৎসাকর্মী। তবে মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বেসামরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
দুজন হিজবুল্লাহ কর্মকর্তাসহ আরও একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবেও সংগঠনটির বহু হতাহতের তথ্য নেই। তাদের দাবি, কয়েক হাজার হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছে, যদিও পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো সংগঠনটির কাছেও নেই।

হিজবুল্লাহর এক কমান্ডার জানান, বহু যোদ্ধা বিনত জবেইল ও খিয়াম শহরে 'মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই' করার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল। তাদের অনেকের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই দ্রুত খোঁড়া দুই ডজনের বেশি নতুন কবর যোদ্ধাদের মরদেহে ভরে যায়। কবরের পাশে সাধারণ মার্বেল পাথরে কোথাও ‘কমান্ডার’, কোথাও ‘যোদ্ধা’ লেখা।
শুধু দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রাম ইয়াতেরেই স্থানীয় কাউন্সিল ৩৪ জন হিজবুল্লাহ যোদ্ধার মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে।
ইসরায়েলি হামলার সবচেয়ে বড় ধাক্কা বহন করছে লেবাননের শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়। তারা বাধ্য হয়ে খ্রিস্টান, দ্রুজ ও অন্যান্য অঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে, যেখানে অনেকেই যুদ্ধ শুরুর জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করছেন।
ইসরায়েল বলছে, বেসামরিক এলাকায় অবস্থান নেওয়া হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের হামলা ঠেকাতে তারা উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। এ জন্য লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত নিরাপত্তা বলয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো ধ্বংস করছে।
একজন ইসরায়েলি সরকারি কর্মকর্তা দাবি করেন, ২ মার্চ ইসরায়েলি নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, উত্তর ইসরায়েলের প্রতি হুমকি পুরোপুরি নির্মূল করা হবে। তার দাবি, হাজারো হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সংগঠনটির অবকাঠামো ধ্বংস করছে ইসরায়েল।
ইসরায়োলি সেনাবাহিনীর দাবি, ২ মার্চের পর থেকে হিজবুল্লাহ শত শত রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ১৭ সেনা এবং উত্তর ইসরায়েলে দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্যও দিয়েছে তারা।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিকে 'অর্থহীন' অভিহিত করে হিজবুল্লাহ পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
‘ইরান তার বন্ধুদের বিক্রি করবে না’
হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে— এমন এক কূটনীতিক সংগঠনটির যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তকে বড় ধরনের জুয়া এবং টিকে থাকার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, হিজবুল্লাহ মনে করেছে, 'সমস্যার অংশ' হতে পারলে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সমাধানেরও অংশ হওয়া যাবে।
তবে এই কৌশল সফল হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তেহরান দাবি করেছে, বৃহত্তর যুদ্ধ নিয়ে যেকোনো চুক্তিতে হিজবুল্লাহবিরোধী ইসরায়েলি অভিযানও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যেকোনো চুক্তি ‘কোনোভাবেই লেবাননের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়’।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি রয়টার্সকে ১৬ এপ্রিলের এক বিবৃতির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, তাদের আশঙ্কা— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শেষ পর্যন্ত এমন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে লেবাননের যুদ্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তই থাকবে না।
তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানের মিশন এবং লেবানন সরকার তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
হিজবুল্লাহ নেতা মুসাভি বলেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি এখনো ইরানের শীর্ষ অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, তেহরান লেবাননের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত— যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ ও লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার। তার ভাষায়, ‘ইরানের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে— ইরান কখনোই তাদের বন্ধুদের বিক্রি করবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ২৭ এপ্রিল ফক্স নিউজে মার্কো রুবিওর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে। সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হিজবুল্লাহর হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন না, ইসরায়েল অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে তাদের বাফার জোন ধরে রাখতে চায়।
রুবিও আরও বলেন, ‘প্রতিক্রিয়া যেন লক্ষ্যভিত্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়’, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সে আহ্বান জানিয়েছে।
১৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, লেবাননের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ একটি মৌলিক শর্ত হবে।
তবে হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, অস্ত্রের বিষয়টি জাতীয় সংলাপের আলোচ্য বিষয়। জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা করলে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশটিতে নতুন সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গত বছর থেকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম শান্তিপূর্ণভাবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২ মার্চ সরকার সংগঠনটির সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
এর জবাবে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা বন্ধের দাবি জানিয়েছে হিজবুল্লাহ।
লেবাননের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ। কারণ, এসব লক্ষ্য অর্জনে ইসরায়েলের ওপর যথেষ্ট প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা কেবল ওয়াশিংটনেরই রয়েছে।
রাজনীতি/আইআর

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও দুই স্কোয়াড্রন এফ–৩৫ আই এবং এফ–১৫ আইএ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে ইসরায়েল। উভয় ধরনের বিমান আনুমানিক ২৫টি করে মোট ৫০টি কেনা হতে পারে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
২১ ঘণ্টা আগে
লেবানন থেকে ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী আভিভিম বসতি এলাকায় একাধিক রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। রোববার (৩ মে) সংঘটিত এ ঘটনায় একটি রকেট প্রতিহত করা হয়েছে এবং বাকি রকেটগুলো কোথায় আঘাত হেনেছে তা নির্ধারণের কাজ চলছে বলে জানায় সেনাবাহিনী।
২১ ঘণ্টা আগে
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবিস্ফোরিত আধুনিক সমরাস্ত্র উদ্ধারকে কেন্দ্র করে দেশটির সামরিক গবেষণা কার্যক্রম জোরদার হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো।
১ দিন আগে
ট্রাম্পের ধারণা, ইরানের পক্ষ থেকে পাঠানো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘গ্রহণযোগ্য’ হবে না। একই সঙ্গে এ-ও বলেছেন, তেহরান ‘খারাপ আচরণ’ করলে ইরানের ওপর আবারও হামলা চালানো হবে।
১ দিন আগে